হিযবুত তাহরীরের তৎপরতার দায় কার?

0

বন্দরনগরী চট্টগ্রামে অনেক আগে থেকেই প্রকাশ্যে কার্যক্রম চালিয়ে আসছে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহরীর। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পোস্টার লাগানো ছাড়াও বিভিন্ন স্থানে লিফলেট বিতরণ ছিল তাদের নিয়মিত কাজ। এছাড়া বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মাঝে সংগঠনের প্রচার করছিল তারা। মূলত স্কুল-কলেজ এবং পাবলিক-প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীরাই ছিল তাদের টার্গেট।

শুক্রবার (২২ নভেম্বর) নগরের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে সংগঠনটির আঞ্চলিক প্রধান আবুল মোহাম্মদ এরশাদুল আলমসহ ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

এরপর শনিবার সংবাদ সম্মেলনের বিস্তারিত তুলে ধরেন সিএমপির (চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার আমেনা বেগম। তিনি বলেন, বাবা-মাকে কোচিংয়ে কথা বলে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহরীরের কাজে যাচ্ছে স্কুল-কলেজের ছাত্ররা। এজন্য অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

তবে দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে হিযবুত তাহরীর কার্যক্রম চালালেও পুলিশ বিষয়টি নিয়ে এতদিন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কেন প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখানে পুলিশের ব্যর্থতাও রয়েছে।

যেভাবে চলে কার্যক্রম
গত ৭ জানুয়ারি কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের হাতে গ্রেপ্তার সাবকাত চট্টগ্রামে হিযবুত তাহরীরের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার প্রধান। তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় সরকারবিরোধী লিফলেট। সাবকাত  ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজির (ইউসিটিসি) মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় সেমিস্টারের ছাত্র। চট্টগ্রামে কীভাবে সংগঠনটি কার্যক্রম পরিচালনা হয় তা সাবকাত বিস্তারিত বলেছেন পুলিশকে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ নগরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাদের সাংগঠনিক অবস্থা ভালো জানিয়ে সাবকাত পুলিশকে বলেছে, প্রায় সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাদের কর্মী-সংগঠক আছে। নগরের বিভিন্ন জনাকীর্ণ মোড়ে একত্র হয়ে তারা নিয়মিত পরামর্শ ও সিদ্ধান্ত নেয়। কখনো সকালে খেলার ছলেও তারা সেরে নেয় সাংগঠনিক কাজ। আর নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য ব্যবহার করে ইমোসহ বিভিন্ন অ্যাপস, যাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ এড়ানো যায়।

পরে তার দেওয়া তথ্যে গত ১৪ জানুয়ারি সংগঠনের সদস্য ও হাজী মুহাম্মদ মহসিন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী ফাহাদ বিন সোলায়মানকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হিযবুত তাহরীরের কৌশল অনেকাংশে ইসলামী ছাত্রশিবিরের মতোই। স্কুলের মেধাবী শিক্ষার্থীরাই তাদের টার্গেট। ‘ইসলামী খেলাফত’ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখিয়ে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পরে এসব কিশোর নেমে পড়ে দাওয়াত, লিফলেট বিতরণ ও পোস্টার লাগানোর কাজে।

৪ মাস নজরদারি
প্রায় চার মাস নজরদারিতে থাকা হিযবুত তাহরীর বিভিন্ন কর্মীদের মধ্যে শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে লিফলেট বিতরণকালে দুইজনকে আটক করা হয়। এরপর রাত পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয় হিযবুত তাহরীরের চট্টগ্রাম মহানগরীর প্রধান (আঞ্চলিক কমান্ডার) আবুল মোহাম্মদ এরশাদুল আলম, আব্দুল্লাহ আল মাহফুজ (৩০), ওয়ালিদ ইবনে নাজিম (১৮), ইমতিয়াজ ইসমাইল (২৫), নাসিরুদ্দিন চৌধুরী (২৯), নাজমুল হুদা (২৭), লোকমান গণি (২৯), মো. করিম (২৭), আব্দুল্লাহ আল মুনিম (২২), কামরুল হাসান রানা (২০), আরিফুল ইসলাম (২০), আজিমুদ্দিন (৩১), মো. আজিমুল হুদা (২৪), ফারহান বিন ফরিদ (২৩) ও মো. সম্রাটকে (২২)।

গ্রেপ্তার হওয়া হিযবুতের চট্টগ্রাম মহানগরীর প্রধান (আঞ্চলিক কমান্ডার) এরশাদুল নগরের একটি স্বনামধন্য ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের বাংলা বিভাগের শিক্ষক। মাহফুজ নোভারটিস ওষুধ কোম্পানির কর্মকর্তা। নাসিরুদ্দিন চৌধুরী ফাহিম ট্রাভেলস নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সাবেক কর্মকর্তা। নাজমুল হুদা ড্যাফোডিল ইনস্টিটিউট থেকে পাস করা সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। লোকমান মহসিন কলেজের স্নাতকোত্তরের ছাত্র। আরিফুল চট্টগ্রাম সরকারি মডেল কলেজের এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। ওয়ালিদ ইবনে নাজিম ইস্পাহানী পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ইতোমধ্যে বেরিয়ে এসেছে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য।

কেন টার্গেট তরুণরা?
তরুণরা কেন হিযবুত তাহরীরর টার্গেট সে বিষয়ে আমরা কথা বলেছি বুদ্ধিজীবিসহ কয়েকজন সাবেক ছাত্রনেতার সঙ্গে।  তারা সবাই বলছে, সুষ্ঠু ছাত্ররাজনীতির চর্চা না থাকা এবং আদর্শিক সংগঠন না পাওয়ায় তরুণরা সহজে হিযবুত তাহরীর ফাঁদে পা দিচ্ছে।

ইস্ট ডেল্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সিকান্দর খান জয়নিউজকে বলেন, শিক্ষার্থীরা ভালো কিছু করতে চায়। কিন্তু আমাদের দেশে সুষ্ঠু রাজনীতিচর্চা না থাকায় আদর্শিক ছাত্র সংগঠন গড়ে উঠেনি। শুধু মারো, খাও, সন্ত্রাসী করো, টেন্ডারবাজি করো এ রাজনীতি। ছাত্রসংগঠনগুলো শিক্ষার্থীদের সংগঠনমুখী করতে পারছে না। এর ফলে শিক্ষার্থীরা ভালো কিছু করতে না পেরে অন্ধকারে পা দিচ্ছে।

শুধু তরুণদের দোষ দিলে হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের রাজনীতি বদলাতে হবে। কি খাবো না কি খাবো, কি লুট করবো না কি লুট করবো এসব ধ্যান-ধারণা থেকে বের হয়ে এসে আদর্শিক সংগঠন করতে হবে। যে সংগঠন দিয়ে দেশ, সমাজ ও জাতির কল্যাণ হবে। তাহলে শিক্ষার্থীরা ভালো কিছুর দিকে ধাবিত হবে। এসব যদি আমরা করতে না পারি তবে নিষিদ্ধ সংগঠনরাই স্বপ্ন দেখিয়ে বিপথে নিয়ে যাবে তরুণদের। এটাই স্বাভাবিক।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও নগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি খোরশেদ আলম সুজন জয়নিউজকে বলেন, ছাত্রদের সঙ্গে ছাত্রসংগঠনগুলোর সংযোগ নেই। তাই স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি বা জঙ্গিগোষ্ঠী সুযোগ নিচ্ছে। তারা কলা-কৌশলে যেভাবে পারছে সেভাবে তরুণদের নিজেদের দলে ভিড়াচ্ছে।

প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈষম্যমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের কারো সঙ্গে মিশতে দেয় না।  গণতান্ত্রিক চর্চা নেই সেখানে। ফলে জঙ্গিরা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মগজ ধোলাই করছে।

গণতান্ত্রিক রাজনীতি ও সাংস্কৃতিকচর্চা বাড়ালে এ পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসা যাবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

শুরু যেভাবে
২০০০ সালে বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করে হিযবুত তাহরীর। সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক এই সংগঠনের নেতৃত্ব দেন। ২০০১ সালে সংগঠনটি দেশের বিভাগীয় শহরগুলোকে টার্গেট করে। ২০০৫ সালের ৩ অক্টোবর চট্টগ্রামে দুই বিচারকের এজলাসে বইবোমা হামলা চালায় হিযবুত। উচ্চশিক্ষিত, মেধাবী ও উচ্চবিত্ত তরুণদের টার্গেট করে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে আসা সংগঠনটিকে ২০০৯ সালের ২২ অক্টোবর নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সরকার। এরপর থেকে গোপনে কার্যক্রম চালিয়ে আসছে তারা।

একটি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যমতে, নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহরীরের মাঠপর্যায়ে সদস্য সংগ্রহ ও সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়ানোর কাজ করছে শীর্ষ সাত নেতা। সদস্যদের কাছে তারা কমান্ডো হিসেবে পরিচিত। তারা হলো, চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার সুন্দরপুর এলাকার আলী হোসেনের ছেলে আখতার হোসেন, নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার রেজাকপুর গ্রামের হানার রশিদের ছেলে মনিরুজ্জামান মাসুদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জের খোয়াবাড়িয়া গ্রামের সাদিকুল ইসলামের ছেলে ওমর ফারুক, কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামের আফতারউদ্দিনের ছেলে জাহেদুল ইসলাম, চাঁদপুরের বাবুরহাটের শফিকুল ইসলামের ছেলে মাসুদ কাওসার এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কলেজপাড়ার মোহাম্মদ হোসেনের ছেলে সাদ্দাম হোসেন ও একই জেলার ঝাউতলার শামসুল ইসলামের ছেলে মোজাম্মেল হক। এদের মধ্যে ওমর ফারুক বর্তমানে কারাগারে।

পুলিশ বলছে…
সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার আমেনা বেগম জয়নিউজকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আমরা হিযবুত তাহরীর কর্মকাণ্ডকে পর্যবেক্ষণ করে আঞ্চলিক প্রধানসহ ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছি। অল্প বয়সে এসব সংগঠনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া খুবই অ্যালার্মিং বিষয়। আমাদের অভিভাবকদের সচেতন হবে। স্কুল-কলেজে, কোচিং কিংবা প্রাইভেটে যাওয়ার নামে তাদের সন্তানেরা কোথায় যাচ্ছে, বাসায় তাদের আচরণ কেমন, এন্ড্রয়েড ফোন যাতে তারা ব্যবহার করতে না পারেন- এসব বিষয়ে অভিভাবকদেরকেই সচেতন হতে হবে।

জয়নিউজ

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...