ম্যাক্স হাসপাতাল যেন শিশুর মরণফাঁদ

0

নগরের মেহেদিবাগ এলাকায় অবস্থিত ম্যাক্স নামের প্রাইভেট হাসপাতালটি যেন শিশুর মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, কোনো নিয়মনীতির তোয়ক্কা না করেই পরিচালিত হচ্ছে ম্যাক্স হাসপাতাল। ভুল চিকিৎসা এবং অবহেলায় একের এক পর এক শিশুর অকাল মৃত্যু ঘটছে হাসপাতালটিতে। আবার এটি পরিচালনায় থাকাদের হাত এতটাই লম্বা হাসপাতালটির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না খোদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও!

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে থেকে গত দুই বছরে ভুল চিকিৎসায় দুই জন শিশু হাসপাতালটিতে মারা যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগের তদন্ত হলেও এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক বা হাসপাতালের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

গতবছরের ২৮ জুন গলার ব্যথা নিয়ে ম্যাক্স হাসপাতালে ভর্তির পর ২৯ জুন রাতে মারা যান সাংবাদিককন্যা শিশু রাফিদা খান রাইফা। রাইফার পরিবারের অভিযোগ, ভুল চিকিৎসা এবং অবহেলায় তার মৃত্যু হয়েছে।

এ ঘটনার এক বছর যেতে না যেতেই চলতি বছরের ২১ নভেম্বর ফের শিশুর প্রাণ ঝরেছে ম্যাক্স হাসপাতালে। এবারের বলি ১৩ মাস বয়সের জিহান সারোয়ার প্রিয়। এবারও অভিযোগ অভিন্ন।

২১ নভেম্বর ম্যাক্স হাসপাতালে প্রিয়’র মৃত্যুর পর তার মা ঝর্ণা অভিযোগ করেন, একটি ইনজেকশন পুশ করার আধঘণ্টা পর সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

এ নিয়ে রোববার (১ডিসেম্বর) চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ করেন জিহান সারোয়ার প্রিয়র মা মোহছেনা আক্তার ঝর্ণা।

অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, গত ১৭ নভেম্বর তার সন্তান জিহান সারোয়ার প্রিয় অসুস্থ বোধ করলে তাকে ম্যাক্স হাসপাতালের এনআইসিইউতে ভর্তি করানো হয়। ভর্তির পর অনকলে চিকিৎসক সনৎ কুমার বড়ুয়াকে দেখালে তিনি ব্যবস্থাপত্র লিখে দেন।

এরপরই ম্যাক্স হাসপাতালের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার মুখে অসহায় হয়ে পড়ার কথা জানিয়ে ঝর্ণা বলেন, এনআইসিইউর মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তাদের কোনো অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও নার্স নেই। গত ২১ নভেম্বর দুপুরে আমার সন্তানকে মেশিনের মাধ্যমে ধীরে ওষুধ দেওয়ার কথা থাকলেও অনভিজ্ঞ নার্স ওই ওষুধের শেষের অংশ হাত দিয়ে পুশ করেন। আর তখনই আমার সন্তান পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেয়।

যোগাযোগ করা হলে ঝর্ণা জয়নিউজকে বলেন, আমি চাই, আমার সন্তানের মৃত্যু কেন হলো ম্যাক্স হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমাকে সেটা জানাক। ডাক্তারের কোনো ভুল ছিল কি-না, নার্সদের কোনো ভুল ছিল কি-না, তারা সেটা আমাকে জানাক। আমি চাই, তারা সত্যটা স্বীকার করুক। ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সংশোধন হোক। ভবিষ্যতে শিশুদের চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা সচেতন থাকুক- আমার চাওয়া এতটুকুই। আমার যে ক্ষতি হয়ে গেছে সেটা পূরণ হওয়ার নয়। আমি চাই, আমার মতো আর কারো যেন ক্ষতি না হয়। কোনো পিতামাতা যেন আমার মতো সন্তানহারা না হয়।

এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. শেখ মু. ফজলে রাব্বি বলেন, আমি অভিযোগ পেয়েছি। এ অভিযোগের ভিত্তিতে আমার নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে। ৫ তারিখের পরই তদন্ত কার্যক্রম শুরু করব।

তিনি বলেন, ‘তদন্তে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনো গাফিলতি কিংবা ডাক্তারের চিকিৎসায় কোনো ত্রুটি বা অবহেলা পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এর আগে গতবছরের ২৮ জুলাই শিশু রাইফার বাবা সাংবাদিক রুবেল খান চকবাজার থানায় একটি মামলা করেন। মামলায় তিনি আসামি করেন শিশু বিশেষজ্ঞ বিধান রায় চৌধুরী, ম্যাক্স হাসপাতালের দায়িত্বরত চিকিৎসক দেবাশীষ সেনগুপ্ত ও শুভ্র দেব এবং হাসপাতালটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. লিয়াকত আলীকে।

মামলার এজাহারে রুবেল খান অভিযোগ করেন, চার চিকিৎসকের অবহেলা ও গাফিলতিতে রোগ সঠিকভাবে নির্ণয় না হওয়া এবং ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিক ও অতিরিক্ত মাত্রায় ‘সেডিল’ প্রয়োগের কারণে তার মেয়ের মৃত্যু হয়েছে। রাইফার মৃত্যুর পর বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) একটি তদন্ত কমিটি গঠন করলেও তারা সুষ্ঠু তদন্ত করেনি বলেও অভিযোগ করেন সাংবাদিক রুবেল খান।

অবশ্য এর আগে রাইফার অপ্রত্যাশিত মৃত্যু হয়েছে বলে প্রমাণ পেয়েছিল সিভিল সার্জন গঠিত তদন্ত কমিটি। বিধি অনুযায়ী হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও করা হয়। তদন্তে ম্যাক্স হাসপাতালের বিভিন্ন অনিয়ম ও ত্রুটি নিয়ে ১১টি সুপারিশ তুলে ধরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে প্রতিবেদন দেওয়া হয়।

১৫০ শয্যার এ হাসপাতালে লাইসেন্স নবায়নে ত্রুটি, হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিয়োগপত্র না থাকা, প্যাথলজি বিভাগ ও চিকিৎসকের কোনো তথ্য নেই বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

পরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান ডা. কাজী জাহাঙ্গীর হোসেন হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। কিন্তু এতো অভিযোগ থাকার পরও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত হাসপাতালটির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, চট্টগ্রাম সির্ভিল সার্জন অফিসে অভিযোগ করেও বিচার পাচ্ছি না। সিভিল সার্জনে অভিযোগ করলে কমিটি হয়, তদন্ত হয়, কিন্তু কোনো শাস্তি হয় না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও ম্যাক্সের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। তাই হাসপাতালটিতে থামছে না মৃত্যুর মিছিল।

যোগাযোগ করা হলে রাইফার হতভাগা বাবা সাংবাদিক রুবেল খান জয়নিউজকে বলেন, অবহেলা আর ভুল চিকিৎসায় আমার মেয়েকে খুন করেছে ম্যাক্স হাসপাতাল। পুনরায় তদন্তের জন্য বিএমডিসি বরাবর আবেদন করেছি। হাসপাতালটিতে আর কত শিশু মারা গেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ব্যবস্থা নিবে- প্রশ্ন করেন রুবেল খান।

এদিকে ভুল চিকিৎসা কিংবা অবহেলায় মৃত্যুর বিষয়টি মানতে নারাজ ম্যাক্স হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. লিয়াকত আলী। তিনি জয়নিউজকে বলেন, আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি কোনো ভুল চিকিৎসা বা অবহেলা হয়নি। প্রিয়র মা একেক সময় একেক রকম বলছে। তার অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হাসপাতালের বিরুদ্ধে তদন্ত করে কোনো ক্রটি পাইনি। সব অভিযোগের তদন্ত হলে ত্রুটিমুক্ত হবে ম্যাক্স।

এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন (সিইউজে) সভাপতি নাজিম উদ্দিন শ্যামল জয়নিউজকে বলেন, ম্যাক্স হাসপাতাল স্বাস্থ্য বিভাগের জন্য একটি হুমকি। এই হাসপাতালে সাংবাদিক রুবেল খানের শিশু রাইফাকে হত্যা করা হয়েছে। কিছুদিন আগে এই হাসপাতালেই ১৩ মাসের আরেক শিশুর অবহেলায় মৃত্যুর অভিযোগ পেয়েছি। স্বাস্হ্য অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলকে (বিএমডিসি) আহ্বান জানাচ্ছি পুনরায় তদন্ত করে হাসপাতালটির বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার।

জয়নিউজ

সরাসরি আপনার ডিভাইসে নিউজ আপডেট পান, এখনই সাবস্ক্রাইব করুন।

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...