অদম্য মেয়ের উদ্যমী মা

0

১৭ বছরের তরুণী পিউ। উচ্চতা মাত্র আড়াই ফুট। শরীরের ওজনটাও একেবারে কম, মাত্র ২০ কেজি! তবে এসব কিছুই বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি পিউর পথচলায়। এ যেন অদম্য এক তরুণী।

পিউ যদি অদম্য হন তাহলে তাঁর মায়ের নামের আগেও কোনো বিশেষণ যোগ না করলে অন্যায় হবে।

পিউর শরীরের হাড় একেবারেই নরম। সামান্য রিকশার ঝাঁকুনিতেও সেই হাড় ভেঙে যায়। কিন্তু পিউ যে স্কুলে যেতে চায়! স্কুলতো সেই দেড় কিলোমিটার দূরে, এখন উপায়?

এখানেই এক মায়ের বিশেষত্ব। মেয়েকে কোলে করে দেড় কিলোমিটার দূরের স্কুলে নিয়ে গেলেন মা। না, একদিন-দু’দিন নয়। পিউর প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে এসএসসি পরীক্ষা পর্যন্ত নিয়মিত এভাবেই কোলে করে নিয়ে যেতেন মা।

দেড় কিলোমিটার দূরের সুখছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পিউর হাতেখড়ি। প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে সুখছড়ি উচ্চ বিদ্যালয় থেকেই এসএসসি পাস করেন তিনি।

এখন পিউ পড়ছেন সাতকানিয়া এমএ মোতালেব কলেজে। মানবিক বিভাগের এই ছাত্রীর এখন ইন্টারের নির্বাচনি পরীক্ষা চলছে। এখনও অদম্য পিউর ভরসা উদ্যমী মা। তবে শিক্ষকরাও বরাবরই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় তাঁকে।

অদম্য পিউ জয়নিউজকে বলেন, ছোটবেলায় খুব খারাপ লাগত, যখন দেখতাম স্কুলের বন্ধুরা মাঠে খেলা করছে। তবে ক্লাসের সহপাঠীরা সমসময় আমাকে সাহায্য করেছে। শুধু বন্ধুরা নয়, শিক্ষক থেকে শুরু করে আত্মীয়-স্বজন সবাই আমাকে সহায়তা করেছে। তবে একজনের সহায়তা না পেলে সবকিছুই বৃথা হয়ে যেত। সে আমার মা। মাকে পাশে না পেলে আমার জীবনটাই হয়ত থেমে যেত।

স্বপ্নের কথা জিজ্ঞেস করলে পিউ বলেন, লেখাপড়া শেষে আমি শিক্ষকতা করতে চাই। কম্পিউটার শেখারও ভীষণ ইচ্ছা আছে।

লোহাগাড়ার উত্তর কলাউজানের রামদয়াল তহলশীলদার বাড়ির রণজিত দাশের মেয়ে পিউ। জন্মের পাঁচ বছর পর ধরা পড়ে শারীরিক ত্রুটি। অন্য সব শিশুর মতো বাড়ছে না পিউর উচ্চতা। বাড়ছে না তার ওজনও।

শারীরিক সীমাবদ্ধতা নিয়েও পিছিয়ে থাকতে চায়নি পিউ। বন্ধুদের সঙ্গে স্কুলে যাওয়ার ইচ্ছে করে সে। সেই ইচ্ছে পূরণে এগিয়ে আসে মা কৃষ্ণা। সেই ২০০৮ সাল থেকেই পিউকে তিনি কোলে করে নিয়ে যাচ্ছেন দেড় কিলোমিটার দূরের স্কুলে। তাঁর একদশকের এই চেষ্টা সফল হয় যখন ২০১৮ সালে এসএসসি পাস করে পিউ।

কথা হয় পিউর উদ্যোমী মা কৃষ্ণা দাশের সঙ্গে। তিনি জয়নিউজকে বলেন, পড়ালেখা করার ভীষণ ইচ্ছা আমার মেয়ের। কিন্তু মেয়ের শরীরের হাড় এতটাই নরম একটু ঝাঁকুনি খেলেই ভেঙে যায়। তাই মেয়েকে প্রতিদিন কোলে করে স্কুলে নিয়ে গেছি।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, কয়েকদিন আগে মেয়েকে কলেজে নির্বাচনি পরীক্ষা দিতে নিয়ে যাওয়ার সময় দুর্ঘটনায় পড়ি। আমরা মা-মেয়ে দু’জনেই মারাত্মক আহত হই। এ অবস্থায় আমার মেয়ের লেখাপড়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তায় রয়েছি।

লোহাগাড়া উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় থেকে প্রতি মাসে পিউ পাঁচশ’ টাকা প্রতিবন্ধী ভাতা পায় উল্লেখ করে তাঁর বাবা রণজিত দাশ বলেন, আমি দরিদ্র মানুষ, বাজারে ছোট্ট একটি দোকান করি। মেয়ের চিকিৎসায় ধার-দেনা করে ৪-৫ লাখ টাকা ব্যয় করেছি। কিন্তু এখনো একটু ঝাঁকুনি খেলেই মেয়ের দুই পায়ের হাড় ভেঙে যায়। ১৭ বছর বয়সেও তার উচ্চতা আড়াই ফুট এবং ওজন মাত্র ২০ কেজি।

এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. হানিফ জয়নিউজকে বলেন, পিউর সমস্যাটি হয়ত হাড়ের জন্মগত ক্ষয়রোগ। শরীরের হাড় শক্ত হওয়ার জন্য যে উপাদানগুলো প্রয়োজন সেগুলো না থাকায় তার শরীরের হাড় নরম। তার সুস্থতার জন্য উন্নত চিকিৎসার পাশাপাশি সুষম খাদ্য প্রয়োজন।

যোগাযোগ করা হলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তৌছিফ আহমেদ জয়নিউজকে বলেন, পিউর চিকিৎসার পাশাপাশি লেখাপড়া যাতে ব্যাহত না হয় সে উদ্যোগ নেওয়া হবে। যাতে ভবিষ্যতে সে কিছু করতে পারে।

এদিকে পিউর সহপাঠী থেকে শুরু করে শিক্ষক সবাই পড়ালেখার প্রতি মা-মেয়ের আগ্রহে অবাক। সাতকানিয়া এমএ মোতালেব কলেজের অধ্যক্ষ দিদারুল আলম চৌধুরী জয়নিউজকে বলেন, স্কুলের শিক্ষকরা পিউকে সবসময় সহানুভূতির দৃষ্টিতে দেখে। আমরাও অবাক হয়ে যায়, লেখাপড়ার প্রতি মা-মেয়ের আগ্রহ দেখে। তাই কলেজ থেকে পিউকে শিক্ষা উপকরণসহ আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।

জয়নিউজ/বিআর

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...