ধুলোর শহরের দায় কার?

0

নগরজুড়ে এখন চলছে খোঁড়াখুঁড়ি। কোথাও ওয়াসা খুঁড়ছে, তো কোথাও পিডিবি কিংবা অন্য কোনো সেবা সংস্থা। সবমিলিয়ে নগর যেন এখন ধুলোর শহর।

একেতো শীতকাল তারওপর মাত্রাতিরিক্ত খোঁড়াখুঁড়িতে কঠিন অবস্থায় পড়েছে নগরবাসী। ঘর থেকে বের হলেই নাকে-মুখে ঢুকছে ধুলোবালি। এতে দেখা দিচ্ছে শ্বাসকষ্টসহ নানা শারীরিক সমস্যা। অনেক রাস্তায় ধুলোবালির পরিমাণ এতটাই বেশি নাকে-মুখে রুমাল চেপে কিংবা মাস্ক পরেও রক্ষা মিলছে না।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নগরে সবচেয়ে বেশি খোঁড়াখুঁড়ি করছে ওয়াসা। এছাড়া সিডিএ, পিডিবি, টিএন্ডটি, কেজিডিসিএলসহ অন্যান্য সেবা প্রতিষ্ঠানও নানা কারণে রাস্তা খুঁড়ছে। সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় না থাকায় একই রাস্তা অল্প সময়ের ব্যবধানে কাটছে একাধিক প্রতিষ্ঠান।

ধুলোর শহরের ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার জয়নিউজকে বলেন, নগরের বিভিন্ন এলাকায় ওয়াসা কিংবা অন্য সেবাপ্রতিষ্ঠান রাস্তা কাটাছে। তারা পানি না দিয়েই রাস্তায় খোঁড়াখুঁড়ি করায় মাত্রাতিরিক্ত ধুলোয় চলফেরা করা দায় হয়ে পড়েছে। রাতে চসিক ধুলোবালি পরিষ্কার করলেও রাস্তা কাটা থাকার কারণে সকালে ধুলোর কুয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে পুরো শহর।

দেখা যায় চসিকের পক্ষ থেকে ওই রাস্তাটি সংস্কার করার কিছুদিনের মধ্যেই পুনরায় কোনো প্রতিষ্ঠান সেই রাস্তাটি খোঁড়াখুঁড়ি করছে।এমনকি ওয়াসাও আবার ওই রাস্তাটি কাটছে। এ কারণে নগরের রাস্তাঘাট ঠিক রাখাটাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে চসিকের। ওয়াসাসহ সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানগুলোর খোঁড়াখুঁড়ি, সমন্বয়হীনতার অভাব, নগরের রাস্তাঘাট ব্যবহার উপযোগী রাখতে হিমশিম খাচ্ছে চসিক- যোগ করেন তিনি।

এদিকে ধুলাবালির দায় স্বীকার করে চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম ফজলুল্লাহ  জয়নিউজকে বলেন, ওয়াসার চলমান প্রকল্পের কারণে আশপাশের এলাকায় ধুলোবালির মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই প্রকল্প এলাকার আশপাশে রাস্তায় পানি ছিটিয়ে ধুলোবালি কমানোর চেষ্টা চলছে।

সরেজমিন দেখা যায়, ধুলোয় আচ্ছন্ন নগরের জামালখান, চকবাজার, বহদ্দারহাট, রাহাত্তারপুল, কালামিয়া বাজার থেকে শাহ আমানত সেতু, বহদ্দারহাট থেকে বাস টার্মিনাল, সিঅ্যান্ডবি মোড়, কাপ্তাই রাস্তার মাথা এবং মাঝিরঘাট থেকে বারিকবিল্ডিং এলাকা।

ধুলোবালির ভয়াবহ অবস্থা দেখা গেছে আগ্রাবাদ এক্সেস রোড ও  পোর্ট কানেক্টিং রোডেও। এসব সড়কে ওয়াসার খোঁড়াখুঁড়ির কারণে রাস্তাঘাটের অবস্থা শোচনীয়। একদিকে ভাঙা রাস্তা, অন্যদিকে ধুলো। এ দুইয়ের মাঝে পড়ে পথচারীসহ স্থানীয়দের ত্রাহি অবস্থা।

জামালখাল এলাকায় বসবাসকারী নেওয়াজ আহম্মেদ বলেন, আমার বাচ্চা সেন্ট মেরিস স্কুলে পড়ে। প্রতিদিন আমাকে চেরাগী মোড়ের সামনে দিয়ে যেতে হয়। অনেকদিন ধরে এ রাস্তার বেহাল অবস্থা। রাস্তায় ধুলো আর ধুলো। এটি বাচ্চাদের জন্য ক্ষতিকর। অথচ এখানে শিশুদের দুই-তিনটি স্কুল আছে। ওয়াসার অপরিকল্পিত উন্নয়নেই আমাদের এই ভোগান্তি।

মাঝিরঘাট এলাকার বাসিন্দা শামীম নবী বলেন, বেশ কয়েকদিন থেকে সিডিএ এবং ওয়াসা মাঝিরঘাট এলাকায় রাস্তা খোঁড়াখুড়ি করছে। এতে চলাচলে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এর চেয়েও বড় ব্যাপার ধুলোবালির কারণে মানুষ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এ রোগব্যাধির দায় কে নেবে?

খোঁড়াখুঁড়ি নিয়ে উদ্বিগ্ন নগরপিতা আ জ ম নাছির উদ্দীন। তিনি জয়নিউজকে বলেন, ওয়াসার একাধিক প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ চলছে। এ কারণে সবচেয়ে বেশি রাস্তা কাটাকাটি করছে ওয়াসা। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে নগরবাসী উপকৃত হবেন। সেই কারণে ওই প্রকল্পগুলোর প্রয়োজনে নগরের রাস্তা কাটাকাটির জন্য আমার কাছে অনুমতি চাইতে এলে অনুমতি দিয়ে দিই। পিডিবিসহ অন্যান্য সেবাপ্রতিষ্ঠানও তাদের প্রয়োজনে চসিকের অনুমতি নিয়ে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি করে বিভিন্ন সময়।

নগরপিতা বলেন, শুধু সেবাপ্রতিষ্ঠানের প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্যই নগরের রাস্তা ঠিক রাখা চসিকের জন্য কঠিন হচ্ছে তা নয়। নগরে একাধিক ফ্লাইওভার নির্মাণ করতে গিয়েও রাস্তার ওপর খড়্গ নেমে এসেছে। এরমধ্যে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। এই অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্যও রাস্তা ব্যবহার উপযোগী রাখা কঠিন। আমরা চেষ্টা করছি নগরবাসীকে ধুলোবালি থেকে রক্ষা করতে।

এ সমস্যার সমাধান কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে নগরে গাড়ি দিয়ে পানি স্প্রে করা হচ্ছে। ধুলোবালি নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি নগরবাসীকেও এগিয়ে আসতে হবে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ইট-বালি ঢেকে রাখতে হবে। যে এলাকায় উন্নয়নকাজ চলছে সেখানে পানি ছিটিয়ে দিতে হবে। যাদের দোকান রাস্তার সামনে তাদেরকেও পানি ছিটাতে হবে। প্রত্যেকে নিজ নিজ স্থান থেকে প্রতিদিন না পারলেও দু’-তিন দিন পরপর হলেও পানি ছিটাতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। একইসঙ্গে বিভিন্ন ভবন নির্মাণের সময় চটের ঘেরাও থাকতে হবে।

নগরবাসীকে স্বাস্থ্যসম্মত শহর উপহার দিতে ইতোমধ্যে ৮২৫টি খোলা ডাস্টবিন অপসারণ করা হয়েছে উল্লেখ করে

নগরপিতা আরো বলেন, এখন শুষ্ক মৌসুম। তাই ধুলোবালি থেকে বাঁচতে জনগণকে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে।

এদিকে নগরের বাতাসে ধুলোর পরিমাণ  শুধু বাড়ছেই। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নগরের কোথাও ধুলোর পরিমাণ দ্বিগুণ, আবার কোথাও পৌঁছেছে নয় গুণ পর্যন্ত!

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. শেখ ফজলে রাব্বি জয়নিউজকে বলেন, শীতের সময় বাতাসে ধুলোর পরিমাণ অন্য যেকোনো মৌসুমের চেয়েও বেশি থাকে। এর ফলে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ে জনগণ। বিশেষ করে নির্মাণ এলাকার বাসিন্দা ও পথচারীদের দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের ক্যান্সার, শ্বাসকষ্টসহ জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।

জয়নিউজ

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...