নেতা আর পুলিশের প্রশ্রয়ে অলংকার মোড়ে যুবরাজের রাজত্ব

0

রাজার ছেলে যুবরাজ হয়- এ কথা সবার জানা। তবে এখানে যে যুবরাজের কথা বলছি সে নামে যুবরাজ হলেও পেশায় ছিলেন টোকাই! একসময়ের এ টোকাই ‍এখন নগরের অলংকার মোড়ের ফুটপাতের রাজা।

অলংকার মোড়ে মূল সড়ক ও ফুটপাত দখল করে অবৈধ দোকান বসিয়েছেন যুবরাজ। এসব দোকান থেকে নিয়মিত চাঁদা তোলেন তিনি। যা থেকে প্রতি মাসে তাঁর আয় লাখ টাকা! আর এসবই তিনি করছেন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও পুলিশের প্রশয়ে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মূলত পাহাড়তলী থানা আওয়ামী লীগ সভাপতি নূরুল আফছার মিয়ার প্রভাব খাটিয়ে অলংকার মোড়ে সড়ক ও ফুটপাত দখল করে দোকান বসিয়েছেন যুবরাজ। সেলামির নামে সিটি করপোরেশনের নালা এবং সরকারি জায়গা দখল করে মোটা অঙ্কের লেনদেনও করেছেন তিনি।

দোকান বসানোর পর কোনোটি থেকে দিনে ২০০ টাকা, আবার কোনোটি থেকে নেন ২ হাজার টাকা পর্যন্ত! যুবরাজের এসব অপকর্মে সহায়তা করে খোদ কয়েকজন দুর্নীতিবাজ পুলিশ!

শুধু তাই নয়, যুবরাজ প্রভাব খাটিয়ে মার্কেট মালিক থেকে দোকান হাতিয়ে নেওয়ার পাঁয়তারা করেছিলেন কয়েকবার। পরে দোকান না পেয়ে সেই মার্কেটের সামনের পথচারীর চলাচলের জায়গায় বসিয়েছেন বেশ কয়েকটি দোকান। এ কারণে প্রতিনিয়ত সমস্যায় পড়ছেন মার্কেটের দোকানদারসহ পথচারীরা।

এরপরও কেন অভিযোগ করছেন না জানতে চাইলে সব ব্যবসায়ীর উত্তর ছিল অভিন্ন। তারা বলেন, অভিযোগ করলে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। থানা পুলিশের কাছে গিয়েও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায় না।

মার্কেটের কয়েকজন দোকানদার জানান, যুবরাজের এসব কর্মকাণ্ডের জন্য দীর্ঘদিন ধরে তারা অতিষ্ঠ। সে মার্কেটের সামনে হাঁটার জায়গা দখল করে ফলের দোকান বসিয়ে দিয়েছে। এসব নিয়ে অভিযোগ করলে তাদের মেরে ফেলার হুমকি দেয় যুবরাজ। থানা, সিটি কপোরেশন এবং স্থানীয় নেতাদের কাছে বেশ কয়েকবার অভিযোগ করার পরও কোনো সুফল পাওয়া যায়নি। উল্টো অভিযোগ দেওয়ার পর কিছুদিন আগে থানা আওয়ামী লীগ সভাপতি আফছার তাঁর বাসায় মিটিং ডেকে নিদের্শনা দিয়েছেন, যুবরাজ দোকান চালাবে কেউ যেন কিছু না বলে।

মার্কেটের সামনে ফুটপাত দখল করে একের পর এক দোকান গড়ে তুলেছেন যুবরাজ

অভিন্ন বক্তব্য স্থানীয় কাউন্সিলর জসীমেরও। তিনি জয়নিউজকে বলেন, দোকানদাররা সিটি কপোরেশন অভিযোগ দেওয়ার পর মেয়রের নিদের্শনায় আমি উচ্ছেদ করতে যায়। কিন্তু তারা দলবল নিয়ে আক্রমণ করে আমার মাথা ফাটিয়ে দেয়। এরপরও আমি উচ্ছেদ করেছিলাম। কিন্তু থানা পুলিশের সহায়তায় তারা আবার ফুটপাত দখল করে দোকান বসায়। এখানে পুলিশ প্রশাসন সরাসরি জড়িত। আর যুবরাজসহ তার সাঙ্গপাঙ্গদের সার্পোট দিচ্ছেন থানা আওয়ামী লীগ সভাপতি নিজেই। আমি নিজে বেশ কয়েকবার থানায় এটা নিয়ে কথা বলেছি তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

সরেজমিন দেখা যায়, অলংকার মোড়ের ফুটপাত ও মূল সড়ক দখল করে ১৫-২০টি দোকান বসিয়েছেন ওই সিন্ডিকেট। মোড়ের মার্কেটের হাঁটার রাস্তা দখল করে বসিয়েছেন ফল ও খাবারের দোকান। এসব অবৈধ দোকানের কারণে পথচারীদের যেমন চলাচলে ব্যাঘাত ঘটেছে, তেমনি মার্কেটের দোকানদাররাও পড়েছেন বিপাকে। বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই মার্কেটের নিচতলায় দোকান আছে।

মার্কেট মালিক ও দোকানদারদের অভিযোগ, আগে অলংকারে সবেচেয়ে বেশি বিক্রি ছিল আমাদের এ মার্কেটের দোকানগুলোর। দোতলায় ছিল ইসলামী ব্যাংক। কিন্তু ফুটপাত ও রাস্তা দখল আর হয়রানির কারণে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বিল্ডিং পরিবর্তন করে ফেলেছে। ওদের বিরুদ্ধে কেউ ভয়ে কথাও বলতে পারে না। রাজনৈতিক নেতার প্রভাব খাটিয়ে তারা যা ইচ্ছে তা করছে। পুলিশ প্রশাসনও নিয়মিত টাকা নিচ্ছে।

ছদ্মবেশে অনুসন্ধানে গেলে ধরা পড়ে অভিযোগের সত্যতা। রাস্তা ও ফুটপাত দখল করে দোকানদারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অলংকার মোড়ে ফুটপাতের দুই থেকে তিন হাত দোকান করতে হলে সিন্ডিকেটকে সেলামি বাবদ দিতে হয় ২০  থেকে ৪০ হাজার টাকা। এর সঙ্গে পুলিশ ও সিন্ডিকেটের দৈনিক চাঁদাতো রয়েছেই।

ক্রেতা সেজে কথা বললে অলংকার মোড়ের ফুটপাতের দোকানদার শাহজান বলেন, এখানে আমি যে দোকান নিয়েছি সেটা নিতে হলে আমাকে প্রথমে ৩০ হাজার টাকা দিতে হবে। কারন আমি সেলামি দিয়ে জায়গাটা নিয়েছি। আর প্রতিদিন দিতে হবে ৫০ টাকা করে। বাজারের হাছিল হিসেবে দিতে হবে ৩০ টাকা। রোজ পুলিশ বক্সের টাকা পুলিশ বক্সে বুঝিয়ে দিতে হবে। পাহাড়তলী থানা পুলিশের টহল গাড়িকে প্রতিদিন দিতে হবে ২০০ টাকা। পুলিশের টাকা নিয়ে যাবে পুলিশের সোর্স মোস্তাফা। আর ১০০ টাকা সিটি করপোরেশনের হারুনকে দিতে হবে।

নাম প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক ফুটপাতের এক দোকানদার জয়নিউজকে বলেন, এখানে আমরা দোকান করছি রাস্তায়। আমরা টাকা দেওয়ার পরও আমাদের গাড়ি পুলিশ এসে ভেঙ্গে দিচ্ছে। কিন্তু মার্কেটের সামনে হাঁটার জায়গা দখল করে যারা দোকান করেছে পুলিশ তাদের কিছু করে না।

মার্কেটের সামনে পথচারীদের হাঁটার জায়গা দখল করে কে দোকান করেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মার্কেটের সামনে ফুটপাতের উপর যে দোকানগুলো দেখছেন এগুলো যুবরাজের। তার বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলতে পারে না। আওয়ামী লীগের সভাপতির সঙ্গে তার সখ্যতা আছে। যুবরাজ মার্কেটের দোকানদারদের থ্রেড (হুমকি) দিয়ে মার্কেটের দোকানও দখল করছে। আপনি খবর নিয়ে দেখেন দোকানদার কেউ কিছু বললে তাদের কি অবস্থা করে।

তিনি আরো বলেন, মার্কেটের সামনে ফুটপাত দখল করে ফলের যে দোকান দিয়েছে সেগুলোর প্রতিটির প্রতিদিনের ভাড়া দেড় হাজার টাকা। একটি দোকান থেকে মাসে আয় ৪৫ হাজার টাকা। এবার হিসাব করে দেখেন দোকানগুলো থেকে কত টাকা পায়।

অলংকার মোড়ে ফুটপাতের এক ফল দোকানদার জয়নিউজকে বলেন, আমাকে এখানে দোকান করতে প্রতিদিন ৫০০ টাকা করে দিতে হয়। সমিতিকে দিতে হয় টাকা, বড় বড় নেতাদেরও দিতে হয়। আর পুলিশের টাকা তো আছেই।

পরিচয় গোপন রেখে দোকান নেওয়ার আগ্রহের কথা জানালে নূরুল আলম নামে ফুটপাতের এক দোকানদার বলেন, আমি এখানে অনেক বছর ধরে দোকান করছি। এখানে দোকান নিতে হলে অনেক সিস্টেম আছে। মোড়ে ফুটপাতের দুই হাত জায়গা নিতে হলে সেলামি দিতে হবে ৩০ হাজার টাকা। আর প্রতি মাসে দোকানপ্রতি লাইনকে দিতে হবে ১০০ টাকা। লাইটের জন্য দিতে হবে ১০০ টাকা। পুলিশ বক্সে পাঠাতে হবে ২০০ টাকা। ভাড়া বাবদ ভাইদের দিতে হবে ৩০০ টাকা। তবে এসব টাকার কোনো মা-বাপ থাকবে না। কারণ কোনো রশিদপত্র ছাড়াই আপনাকে সব টাকা দিতে হবে।

তিনি আরো বলেন, আমার এ দোকান মার্কেটের সামনে ফুটপাতের উপর। এটা সাগরের সঙ্গে স্ট্যাম্প করে পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে নিয়েছি।

ফুটপাতে রমরমা এ বাণিজ্যের ভাগ পান স্থানীয় নেতা ও পুলিশ

ক্রেতা সেজে প্রতিবেদক মুঠোফোনে কথা বলেন যুবরাজের সঙ্গেও। যুবরাজ বলেন, “আপনি কে, কোথায় থাকেন? আমার নাম্বার কে দিয়েছে? দোকান নিতে পারবেন কোনো সমস্যা নাই। এসব কথা ফোনে না বলে সরাসরি বললে ভালো হবে। আপনি অলংকার এসে সরাসরি কথা বললে আমি ঠিক করে দিতে পারবো। আমি সন্ধ্যায় অলংকার থাকব। আপনি আসলে আমাকে ফোন দিয়েন, কথা হবে।”

পরে প্রতিবেদক নিজের পরিচয় দিলে যুবরাজ সংযোগ কেটে দেন। একইসঙ্গে ফোন বন্ধ করে দেন।

এদিকে অভিযোগের বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে পাহাড়তলী থানা আওয়ামী লীগ সভাপতি নূরুল আফছার মিয়া জয়নিউজকে বলেন, এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ বানোয়াট। আমার সম্পর্কে খবর নিয়ে দেখেন আমার রাজনৈতিক জীবনে কারো থেকে দুই পয়সা নিইনি। যুবরাজ গরিবের ছেলে, ফুটপাতে ফলের দোকান করে চলে। সে আমার অনুসারী বা রাজনৈতিক কেউ না। কিছুদিন আগে দোকানের ঝামেলা নিয়ে দোকানদাররা এসেছিল। আমি সমাধান করে দিয়েছি।

তিনি যোগ করেন, এখান থেকে টাকা শুধু যুবরাজ নেয় না। এখানে চার-পাঁটা গ্রুপ আছে তারা ফুটপাত থেকে টাকা তুলে খায়। তারপরও আমি এখন ডাকাচ্ছি যুবরাজকে। আমার সঙ্গে ওর কি সম্পর্ক আমি জিজ্ঞেস করবো।

যোগাযোগ করা হলে পাহাড়তলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মঈনুর রহমান জয়নিউজকে বলেন, আমরা বেশ কয়েকবার এখানে থেকে ফুটপাতের দোকান উচ্ছেদ করেছি। ফুটপাত থেকে এসব অবৈধ দোকান উচ্ছেদের জন্য পুলিশ কমিশনার স্যার নিজেই কঠোর সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। আপনি জানিয়েছেন, আমি আমাদের কর্মকর্তাদের দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বলে দিচ্ছি।

পুলিশের সম্পৃক্ততার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এ ধরনের কোনো কাজের সঙ্গে পুলিশের কেউ জড়িত নয়। পুলিশের নাম ব্যবহার করে টাকা নেওয়ার প্রমাণ দিতে পারলে   তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবো। তবে আমাদের পুলিশ থেকে এ ধরনের কোনো লোককে এখানে বসানো হয়নি।

জয়নিউজ

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...