তাসফিয়ার আত্মহননের নেপথ্যে…

0

তাসফিয়ার সঙ্গে প্রেম হয় আদনানের। এ প্রেমে বাঁধা হয়ে দাঁড়ান মেয়ের বাবা-মা। চলতে থাকে তাদের মানসিক চাপ। তবুও তাদের প্রেমে চিড় ধরেনি। প্রেমের এক মাস পূর্তির বিকেলে দেখা করে দু’জন। এ খবর চলে যায় তাসফিয়ার মা নায়মা খাতুনের কাছে।

মা-বাবার বকুনির ভয়ে পতেঙ্গা পালিয়ে যায় তাসফিয়া! নেভাল বিচে একা বসে থেকে স্কুলপড়ুয়া মেয়েটি এ চাপ সহ্য করতে পারেনি। সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত নামতেই নদীতে ঝাঁপ দেয় সে। পরদিন সকালে ভেসে ওঠে তার লাশ। জোয়ারের পানিতে নদীর ধারের পাথরের উপর আটকে থাকে তাসফিয়ার নিথর দেহ।

নগরের সানশাইন গ্রামার স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্রী তাসফিয়া আমিনকে কেউ হত্যা করেনি। কর্ণফুলী নদীতে নেমে সে আত্মহত্যা করেছে। রোববার (১৬ সেপ্টেম্বর) নগর গোয়েন্দা পুলিশ চুলচেরা তদন্ত শেষে আদালতে এমন প্রতিবেদনই জমা দিয়েছে।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (প্রসিকিউশন) নির্মলেন্দু বিকাশ চক্রবর্তী জানান, তাসফিয়ার হত্যা মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ। এতে তাসফিয়া মৃত্যু আত্মহত্যাজনিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

নগর গোয়েন্দা পুলিশের সিনিয়র সহকারী কমিশনার আসিফ মহিউদ্দিন জানান, পতেঙ্গার কর্ণফুলী নদীর পাড় থেকে উদ্ধার হওয়া স্কুলছাত্রী তাসফিয়া আমিনের লাশ উদ্ধারের পর থেকে বিষয়টি নিয়ে চুলচেরা তদন্ত করা হয়। তদন্তে হত্যার কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। কর্ণফুলীর পানিতে নেমে সে আত্মহত্যা করে।

তিনি আরও জানান, প্রত্যক্ষদর্শী ৬ জনসহ ১৬ জন সাক্ষীর কাছ থেকে তথ্য ও জবানবন্দী নেওয়া হয়েছে। এছাড়া তাসফিয়ার ময়নাতদন্তের ভিসেরা রিপোর্টে তাকে ধর্ষণ, শারীরিক বিষক্রিয়া ও হত্যার উপযোগী কোন আঘাতের তথ্য পাওয়া যায়নি।

ফেসবুকে পরিচয়ের সূত্র ধরে আদনানের সাথে পরিচয় হয় জানিয়ে পুলিশ কর্মকর্তা আসিফ মহিউদ্দিন বলেন, ঘটনার এক মাস আগে আদনানের সাথে প্রেমের সম্পর্ক হয় তাসফিয়ার। বিষয়টি তার পরিবার মেনে নেয়নি। একপর্যায়ে বাবা-মা তার কাছ থেকে মোবাইলের সিম নিয়ে ফেলে। আদনানের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখতে তারা চাপ তৈরী করেন তাসফিয়ার ওপর। কিন্তু গোপনে তাসফিয়া আদনানের সাথে সম্পর্ক রাখে। ১ মে আদনান ও তাসফিয়ার প্রেমের এক মাস পূর্তি হয়। তারা সেদিন বিকেলে নগরের গোলপাহাড় মোড়ের চায়না গ্রিল রেস্টুরেন্টে দেখা করতে যায়। বিকেলে ঘরে মেয়েকে না দেখে তাসফিয়ার বন্ধু শওকত মিরাজকে কল করেন তাসফিয়ার মা নায়মা খাতুন।

তিনি শওকতকে পূর্বানুমানের উপর ভিত্তি করে বলেন, ‘আমি জানি তাসফিয়া আদনানের সাথেই আছে। তুমি তাকে এক্ষুণি বাসায় ফিরতে বলো।’তাসফিয়ার মায়ের এ খবর বন্ধু মিরাজ পৌঁছে দেয় আদনানের ফোনে। আদনান বিষয়টি তাসফিয়াকে জানায়। এরপর তাসফিয়া আতংকিত হয়ে পড়লে অর্ডার করা খাবার না খেয়েই বেরিয়ে পড়ে তারা।

এই পুলিশ কর্মকর্তা আরও জানান, মায়ের ভয়ে তাসফিয়া আর বাসায় যায়নি। পতেঙ্গায় নদীর তীরের নেভাল এলাকায় একা চলে যায় সে। রাত আটটায় সেখানে তাকে ছয়জন স্থানীয় ব্যক্তি হতাশাগ্রস্ত অবস্থায় দেখতে পায়। সাড়ে আটটায় স্থানীয়রা তাকে নদীতে নামতে দেখে। এর কিছুক্ষণ পর তারা চিৎকারের শব্দ শুনতে পায়। অনেকে নদীতে তাকে খোঁজাখুজিও করে। কিন্তু রাতে তাকে পাওয়া যায়নি। সকালে নদীর পাড়ে থাকা পাথরের উপর তার লাশ পড়ে থাকতে দেখে তারা। মোট ১৬ স্বাক্ষীর জবানবন্দীতে এসব তথ্য উঠে আসে।

এর আগে ঘটনার দিন পতেঙ্গা থানা পুলিশ জানিয়েছিল, ১ মে বিকেলে চট্টগ্রাম নগরীর গোলপাহাড়ের চায়না গ্রিল রেসট্রুরেন্টে তাসফিয়া আমিন তার বন্ধু আদনানকে নিয়ে খেতে যায়। সেখান থেকে বের হয়ে তাসফিয়া একটি সিএনজি অটোরিকশায় উঠে চলে যায়। আর আদনান চলে যায় অন্যদিকে। রেস্টুরেন্টটির সিসিটিভি ফুটেজে এ বিষয়টি উঠে আসে।

পরদিন ২ মে সকাল ৯টায় নগরীর পতেঙ্গা নেভাল সড়কের ১৮ নম্বর ঘাট এলাকায় কর্ণফুলীর নদীর পাড়ে পাথরের উপর উপুড় হয়ে পড়েছিল তাসফিয়ার লাশ। স্থানীয়রা খবর দিলে পুলিশ গিয়ে তার লাশ উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে নিয়ে আসে। পরে জানা যায় এই মরদেহটি নগরের সানশাইন গ্রামার স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্রী তাসফিয়ার।

এদিকে তাসফিয়া আমিনের লাশ উদ্ধারের পর এটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা তা নিয়ে তৈরী হয় ধুম্রজাল। এ ঘটনায় তাসফিয়ার বাবা মোহাম্মদ আমিন মেয়ের প্রেমিক আদনানসহ ছয় জনকে আসামি করে পতেঙ্গা থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলার অন্য আসামিরা হলেন সৈকত মিরাজ, আশিক মিজান, ইমতিয়াজ সুলতান ইকরাম, মো. মোহাইমিন ও মো. ফিরোজ।

পুলিশ ৩ মে রাতে আদনানকে গ্রেফতার করে। এরপর আদালতের অনুমতি নিয়ে তাকে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় গাজীপুরের কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে। অন্য আসামি ফিরোজকে নেওয়া হয় দুই দফা রিমাণ্ডে। বাকি চার আসামিকেও গ্রেফতার করে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে কোন তথ্য পায়নি পুলিশ। মামলাটি প্রথম থেকে পতেঙ্গা থানা পুলিশ তদন্ত করে। কিন্তু তারা কোন কূলকিনারা করতে পারেনি। পরে এটি তদন্তের দায়িত্ব পায় নগর গোয়েন্দা পুলিশ।

এদিকে তাসফিয়ার বাবা মোহাম্মদ আমিন শুরু থেকেই দাবি করে আসছিলেন তার মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু কারা কেন হত্যা করেছে সে বিষয়ে কোন তথ্য তাসফিয়ার পরিবার জানাতে পারেনি পুলিশকে। ৫ মে তাসফিয়ার বাবা চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তাসফিয়া হত্যাকাণ্ডে তৃতীয় কোন পক্ষের ইন্ধন আছে বলে অভিযোগ তুলেছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে মোহাম্মদ আমিন বলেছিলেন, তাসফিয়াকে কিছু চিহ্নিত নরপশু মধ্যযুগীয় কায়দায় নৃশংসভাবে হত্যা করেছে। আদালতের প্রতি সীমাহীন শ্রদ্ধা রেখে একজন বাবা হিসেবে বলতে চাই, অপরাধীর বয়স বিবেচনা না করে অপরাধ বিবেচনা করে পুণরায় রিমান্ড মঞ্জুর করে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের সুযোগ দিন। তাসফিয়া হত্যায় তৃতীয় কোন পক্ষের ইন্ধন আছে কি না বা পরোক্ষভাবে সম্পর্কিত কিনা- সে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পুলিশ প্রশাসনের প্রতি আমি অনুরোধ জানাই। কিন্তু কেন, কে বা কারা, কিভাবে তাকে হত্যা করেছে সে বিষয়ে পুলিশকে কোনো তথ্য দিতে পারেননি তিনি।

সিআইডি চট্টগ্রাম জোনের বিশেষ পুলিশ সুপার ড. নাজমুল করিম জানান, তাসফিয়ার মৃত্যুর ঘটনাটি যেহেতু অত্যন্ত আলোচিত ও স্পর্শকাতর, তাই তার ভিসেরা পরীক্ষার জন্য সিআইডির ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বোর্ড গঠন করা হয়। বিশেষজ্ঞ কমিটি ভিসেরা রিপোর্টটি তৈরী করে। এতে ধর্ষণের কোন আলামত মেলেনি।

মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, পুলিশ শুরু থেকেই কর্ণফুলীর নদীর মোহনার যে স্থান থেকে লাশটি উদ্ধার হয়েছে সেই স্থানটিকে ‘প্লেস অব অকারেন্স’অর্থাৎ ঘটনাস্থল ধরে নিয়ে তদন্ত করেছে। এরপর থেকে খুঁজেছে সামনে আসা প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর। আদনানের হাতে কিংবা পরিকল্পনায় তাসফিয়া খুন হয়েছে কি-না এ প্রশ্নটি ছিল শুরু থেকেই।

আবার তাসফিয়ার হাতে থাকা স্বর্ণের আংটি ও আইফোন ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার না হওয়ায় সে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েছিল কি-না তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

কর্ণফুলী নদীর পাড়ের যেখান থেকে লাশটি উদ্ধার করা হয়েছে তার আশপাশে স্থানীয়রা তাসফিয়াকে একা দেখতে পেয়েছিলেন। তাসফিয়ার সাথে তার পরিবারের সম্পর্ক কেমন ছিল বা তার বাবা-মা’র আচরণে অভিমান করে বাসা থেকে বের হয়ে নেভাল এলাকায় গিয়ে আত্মহত্যা করেছে কি-না সে প্রশ্নের পিছনেও ছুটেছে পুলিশ।

আবার তাসফিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার আসামিদের দুই-তিন জনের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে তাসফিয়ার বাবা ও চাচার বিরুদ্ধেও চট্টগ্রামের কোতোয়ালী, ডবলমুরিং ও কক্সবাজারের টেকনাফ থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা রয়েছে। তাই মাদক ব্যবসাকেন্দ্রীক দ্বন্দ্বের জের ধরে তাসফিয়া খুন হয়েছে কিনা তাও খতিয়ে দেখেছে পুলিশ। সব প্রশ্নের ইতি টেনে এই মামলার তদন্তে উঠে আসে আত্মহত্যাই করেছে তাসফিয়া।

পুলিশ জানায়, তাসফিয়াকে বহনকারী সিএনজি অটোরিকশা চালককে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদের চেষ্টা ছিল পুলিশের। এ জন্য গোলপাহাড় মোড়, জিইসিসহ পতেঙ্গা পর্যন্ত প্রায় অর্ধশত সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে পুলিশ। ক্যামেরার মাধ্যমে সিএনজি অটোরিকশা সনাক্ত করা গেলেও ওই ক্যামেরাগুলো নিম্নমানের হওয়ায় অন্ধকারে গাড়ির নম্বর সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

জয়নিউজ/এফও/জেডএইচ
আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...