দুবাই বসেই চাঁদাবাজি চালাচ্ছেন বাবর, বনানীতে বাড়ি-বসুন্ধরায় ফ্ল্যাট

0

রাজধানী ঢাকার ক্যাসিনো সম্রাট গ্রেপ্তার হলেও বন্দরনগরী চট্টগ্রামের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণকারী যুবলীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। শুদ্ধি অভিযান শুরুর আগে কৌশলে মালেশিয়া হয়ে দুবাই পাড়ি জমান তিনি।

বাবর দুবাইতে অবস্থান করলেও তার অনুসারীদের মাধ্যমে এখনো ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করছেন বলে অভিযোগ পেয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। দুবাই থেকে এখনো চট্টগ্রামে রেলের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, রেলের কর্মকর্তাদের হুমকি, চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে বাবর

কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের চাপ দিয়ে নেওয়া চাঁদার ভাগ বাবরের সেকেন্ড ইন কমান্ড, রানা, অজিত, লিটুসহ কয়েকজনের মাধ্যমে চলে যাচ্ছে দুবাইতে। কিন্তু ভুক্তভোগীরা প্রাণভয়ে অভিযোগ না করায় কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। তবে বাবরের অনুসারীদের নজরদারিতে রেখেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, বাবর ও তার অনুসারীদের চাঁদাবাজির বিষয়ে অনেক তথ্য তাদের কাছে রয়েছে। বিদেশে অবস্থানকারী সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজদের ইন্টারপোলের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।

২০১৮ সালের ১৩ অক্টোবর র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে সন্ত্রাসী অসীম রায় বাবু মারা যাওয়ার পরপরই বাবর বিদেশ চলে যান। বাবু একসময় বাবরের অনুসারী থাকলেও পরবর্তীতে তাদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়।

বিগত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে বাবর আবার দেশে ফিরে আসেন। তবে ২০১৯ সালের ২৯ মে রাতে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে আরেক সন্ত্রাসী অমিত মুহুরী খুন হলে বাবর আবার কৌশলে বিদেশ চলে যান। তবে বিদেশ গেলেও বন্ধ হয়নি তার চাঁদাবাজি।

দুবাইয়ে অবস্থান করলেও চট্টগ্রামে রয়েছে বাবরের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সহকর্মী। তারাই মূলত বাবরের হয়ে চাঁদাবাজি চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ঠিকাদার-ব্যবসায়ীদের হয়রানি করছে। প্রয়োজন পড়লে তারা দুবাই অবস্থান করা বাবরের সঙ্গে ফোনেও কথা বলিয়ে দিচ্ছে। সুদূর  দুবাই থেকেই ফোনে রেলের কর্মকর্তা এবং ঠিকাদারদের হুমকি দিচ্ছেন বাবর। এমন ফোন রেকর্ড জয়নিউজের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।

দুবাই থেকে চাঁদাবাজির বিষয়ে রেলের এক কর্মকর্তা জয়নিউজকে বলেন, দুবাই থেকে বাবর তার অনুসারীদের মাধ্যমে আমাদের সঙ্গে ফোনে কথা বলছে। সে (বাবর) চাঁদা দাবি করছে এবং বিভিন্ন ঠিকাদারকে টাকার জন্য চাপ দিতে বলছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যুবলীগের সাবেক চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীর সঙ্গে সখ্যতা থাকার কারণে বেপরোয়া হয়ে উঠে বাবর। রেলওয়ের সব টেন্ডারে ১০ শতাংশ হারে কমিশন নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া যুবলীগের প্রভাব খাটিয়ে রেলওয়ের জায়গাও লিজ নিয়েছেন তিনি।

যেভাবে উত্থান
এমইএস কলেজভিত্তিক ছাত্রলীগের রাজনীতি করতেন হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর। তিনি এমইএস কলেজ ছাত্র সংসদের জিএস ছিলেন। প্রয়াত এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী বাবর ছাত্রলীগের গ্রুপ-রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে রাউজানের আকবর-মুরাদ হত্যা মামলা, বিএনপিকর্মী আজাদ হত্যা মামলা, মির্জা লেনে ডাবল মার্ডার, সিটি কলেজ ছাত্রলীগ নেতা আশিককে গোলপাহাড় মোড়ে হত্যা, তামাকুমুণ্ডি লেনে রাসেল হত্যা, এমইএস কলেজ থেকে ফরিদ নামের একজনকে ডেকে নিয়ে ২নং গেইটে হত্যা এবং সর্বশেষ রেলওয়ের টেন্ডার নিয়ে সংঘটিত ডাবল মার্ডার মামলা ছাড়াও এক ডজনেরও বেশি মামলা ছিল।

২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলে হেলাল আকবর বাবর ছিলেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী। ওই সরকার ক্ষমতায় আসার এক বছরের মাথায় র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার ও ক্রসফায়ার এড়াতে বাবর পাড়ি জমান থাইল্যান্ড। সেখানে গড়ে তোলেন হোটেল ব্যবসা। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার এক বছর পর আবারও দেশে ফেরেন তিনি। একপর্যায়ে থাইল্যান্ডের ব্যবসা-বাণিজ্য ছেড়ে দেশে ব্যবসা শুরু করেন। শুরু করেন বেনামে ঠিকাদারি।

সূত্র জানায়, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের শত কোটি টাকার টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করেন বাবর। টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সিআরবিতে ঘটে সংঘর্ষ। এতে আরমান নামে এক শিশু ও সাজু পালিত নামে এক ছাত্রলীগ কর্মী নিহত হন। ওই ঘটনায় নিহত সাজুর মায়ের দায়ের করা মামলায় আসামি করা হয় বাবরকে। কোতোয়ালি থানা পুলিশ এ মামলায় ঢাকা থেকে বাবরকে গ্রেপ্তার করে। ডাবল মার্ডারের ঘটনায় দায়ের করা মামলার আসামি হওয়ার পর যুবলীগের সদস্য পদ থেকেও তাকে বহিষ্কার করা হয়। এর কয়েক মাস পরেই তিনি উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে বের হন।

স্ত্রীর অ্যাকাউন্টে লেনদেন
যুবলীগ নেতা বাবর নিজের নামে কোনো ব্যাংক হিসাব পরিচালনা না করলেও স্ত্রী জেসমিন আক্তারের নামে রয়েছে বেশ কয়েকটি ব্যাংক হিসাব। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- এবি ব্যাংক লিমিটেডের অ্যাকাউন্ট। যার নম্বর- ৪১০১৫৭৯৮২৬৩০০। এছাড়া ডাচ-বাংলা, মিউচুয়্যাল ট্রাস্ট ব্যাংকেও রয়েছে একাধিক অ্যাকাউন্ট।

বাবরের স্ত্রীর এক বোন চট্টগ্রামে একটি ব্যাংকে কর্মরত আছেন। মূলত তার সহায়তায় লেনদেন হয় বলে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।

বিশাল সম্পদের মালিক বাবর
প্রাতিষ্ঠানিক কোনো ব্যবসা-বাণিজ্য না থাকলেও শত শত কোটি টাকার মালিক বাবর। নামে-বেনামে রয়েছে তার বাড়ি ও ফ্ল্যাট।

চট্টগ্রামের নন্দনকানন এলাকায় ৪৭, বৌদ্ধ মন্দির রোডে রয়েছে পাঁচতলা বাড়ি। ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ডি ব্লকের ২নং রোডের (বড় মসজিদের পাশে) ২৩/১ নম্বরের বাড়ির চারতলায় রয়েছে ফ্ল্যাট। এছাড়া ঢাকার বনানীতে দুটি সাততলা বাড়িও রয়েছে তার। নন্দনকানন ২নং গলিতে তার স্ত্রীর নামে প্রায় তিন হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাট এবং স্টেশন রোডে একটি মদের বারসহ নামে-বেনামে রয়েছে বেশ কয়েকটি গাড়িও।

দুবাইয়েও সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন বাবর। দেশ থেকে পাঠানো চাঁদা দিয়ে কিনছেন গাড়ি, দোকানসহ আরও অনেককিছু।

চাঁদাবাজি করে কেউ রক্ষা পাবে না
বাবরের ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে সিএমপি কমিশনার মো. মাহবুবর রহমান জয়নিউজকে বলেন, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে কেউ রক্ষা পাবে না। বাবর ও তার অনুসারীদের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে আমরা খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নিবো। ভুক্তভোগীদেরও এ ব্যাপারে আমাদের সহযোগিতা করতে হবে।

একই প্রসঙ্গে র‌্যাব-৭ এর সিও লে. কর্নেল মশিউর রহমান জুয়েল জয়নিউজকে বলেন, অপরাধ-চাঁদাবাজির দিন শেষ। এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

জয়নিউজ

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...