ডিজিটাল বাঙলার ডিফিকাল্ট হাটহাজারী

বঞ্চিত জনপদ যুগে যুগে

0

পুরো পশ্চিমটায় সবুজ বনানী আর পূবে স্রোতস্বিনী হালদা – মাঝখানে মায়াবী হাটহাজারী। শহর নয়, পল্লীও নয়। শহরতলী। পনেরটি ইউনিয়ন আর একটি পৌরসভা। সিটি কর্পোরেশনের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বেশিরভাগ এলাকাও হাটহাজারীর মানচিত্রে। চট্টগ্রাম সিটির অক্সিজেন পয়েন্ট হতে একটি মহাসড়ক দুটো পার্বত্য জেলা ও দুটো বৃহত্তর উপজেলার মূল যোগাযোগ মাধ্যম।

ইতিহাস ও ঐতিহ্যে অন্য দশটি জনপদের চাইতে খানিক ভিন্নতা আছে। দেশের তৃতীয় বৃহত্তম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সগৌরব অবস্থিতিও এখানে। বরেন্য শিল্পী সাহিত্যিক আইনজীবী রাজনীতিক ধর্মজ্ঞ – সব শ্রেণিরই উত্থান আছে এই জনপদে। তারপরও যুগ যুগ ধরে নিদারুণ বঞ্চনার শিকার এই হাটহাজারী।

বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর এমএ ওহাব ছিলেন স্বাধীন বাঙলাদেশের প্রথম নির্বাচিত সাংসদ এখান থেকে। দেশগড়ার কর্মযজ্ঞে তিনিও করেছিলেন আত্মনিবেশ। সংক্ষিপ্ত সময়ের সাংসদ প্রয়াত ওহাব মিয়া হালদা প্যারালালের মতো একটি কৃষিবান্ধব প্রকল্পের অনুমোদনের জন্য পেশ করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রীসভায়। এরইমধ্যে ঘটে যায় ইতিহাসের নৃশংসতম রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। রাষ্ট্রের স্থপতি সপরিবারে প্রাণপাত করলেন, তাঁর নেতৃত্বাধীন দলটিও অলিখিত এক নিষিদ্ধ সংগঠনে পরিণত হলো। স্বনামা বেনামা স্বৈরশাসকদের কেউ আর হাটহাজারী নিয়ে মাথা ঘামায়নি।

এরশাদ শাহী আমলের পতনোম্মুখ সময়ে হালদা প্যারালাল প্রজেক্টটি প্রাণ পেলো ঠিকই, কিন্তু মূল কাঠামো থাকলোনা। কৃষকশ্রেণির চিরন্তন অহিতকামী অভিজাত বংশীয় একজন প্রকল্পটি জাগিয়ে তুললেও সেখানে কৃষির কল্যাণ নিয়ে বাস্তবমুখিতা থাকলোনা। শ্রেফ লুটপাট আর অপচয়ের প্রজেক্ট হলো সেটি। শত শত একর ফসলি জমি হারালো প্রান্তিক কৃষক আর বিশাল সমতল ভূমির মাঝখান দিয়ে দীর্ঘ দুটি খালপাড় স্বাভাবিক চাষাবাদকেও বিঘ্নিত করলো। প্রকল্পটি পড়েই থাকলো। এরশাদ শাহীর পতন হলো। সারাদেশের মতো হাটহাজারীবাসীও আশায় বুক বেঁধেছিলো। বিএনপির প্রার্থী সাংসদ হলো। বাকপটু ওয়াহিদ উন্নয়নের স্বপ্ন দেখিয়ে বিমুগ্ধ করে রাখলো মানুষকে। কিন্তু হাটহাজারী সেই তিমিরেই পড়ে থাকলো, একটি সরকারি হাই স্কুলও পেলোনা এই জনপদ।

গণতান্ত্রিক চর্চার আনুষ্ঠানিক আড়ম্বরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলো। কিন্তু সাংসদ সেই ওয়াহিদ। সুতরাং উন্নয়ন এখানে অধরাই থাকলো। তারপর সেই ঐতিহাসিক অক্টোবর বিপর্যয়, ২০০১ সালে। চারদলীয় জোট ক্ষমতায় এলো। আগের সেই সাংসদ হুইপ হলো, সাথে একজন প্রতিমন্ত্রী, একজন পূর্ণ মন্ত্রী মর্যাদার উপদেষ্টাও। সেই উপদেষ্টা রাউজানের হলেও যাতায়াত হাটহাজারীর উপর দিয়েই। সুতরাং তিনজন দাপুটে মন্ত্রী পেয়ে জনপদের চেহারা বদলের স্বপ্ন দেখলো বোকা হাটহাজারী। হলোনা কিছুই। ওদের আগে পিছে কেবল পুলিশের সাইরেনওয়ালা গাড়ি দেখেই চোখের খিদে মিটিয়ে চললো জনগণ। ওরা যেখানে যায়, সেখানকার ব্রিজ কালভার্ট কিংবা রাস্তায় চাটুকাররা রঙ লাগিয়ে জীর্ণতা ঢেকে দিতো। অসম ক্ষমতার নির্লজ্জ প্রদর্শনী চলতে চলতেই মহাজোট এলো দিন বদলের গান শুনিয়ে।

মানুষ সেইবার তাদের চিরদিনের বিশ্বাসে পরিবর্তন আনলো। বিএনপির তালুক হয়ে যাওয়া হাটহাজারীতে আওয়ামী নেতৃত্বাধীন মহাজোটের বিজয় হলো। মানুষ এবার প্রাণপণে বিশ্বাস করলো – দিন বদল হবে। কিন্তু দিন নয়, গুটিকয়ের ভাগ্য বদল হলো। সাংসদ মন্ত্রী হলো, আওয়ামী কাণ্ডারী জেলা চেয়ারম্যান হলো, তাদের চামচা পরিজনরা নতুন নতুন লাইসেন্স পেলো। কিন্তু হাটহাজারী? একটা নর্দমায় পরিণত হলো। স্বপ্নের হালদা প্যারালালের ধোঁকায় কৃষিতে অনাগ্রহ জন্ম হওয়ার ফলে বিস্তীর্ণ বনভূমির কোলঘেঁষা ফসলি জমি পরিবেশ বিধ্বংসী মাটি পোড়া শিল্পের কাছে বন্ধকি হয়ে গেলো। পাহাড় কাটা আর ইটভাটার অবিরাম চুল্লির খোরাক হয়ে উজাড় হলো বনভূমি। ইটভাটা কেন্দ্রিক শ্রমিক সমাহারের ভীড়ে অসামাজিক অপরাধ বেড়ে চললো দিনরাত। হাটহাজারীর পুলিশ স্টেশন মডেল থানা হয়েছে – এটুকুই উন্নয়ন স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে। কিন্তু অস্বাভাবিক গতিতে অপরাধ বেড়ে গেলো।

যে হাটহাজারী একসময় শান্ত শিষ্ট এলাকা হিসেবে প্রশাসনিক পরীক্ষার প্রশ্নে ঠাঁই পেতো, সেই হাটহাজারী হয়ে পড়লো অপরাধের অভয়ারণ্য। মাদক ও নারী বাণিজ্য, অস্ত্র ও গোলা বারুদের বিকিকিনি, ক্ষমতার জোরে ভূমিদস্যুতা ইত্যাদি ইত্যাদিতে এখন নরকের নর্দমা এই হাটহাজারী। শহরতলী, চাটগাঁ শহরের প্রাণকেন্দ্র – এরকম নানা কথায় তিলোত্তমা এই জনপদ। কিন্তু পাওয়ার বেলায় অষ্টরম্ভা। সিটি থেকে আসার সময় গলদঘর্ম হয় যাত্রীরা, কারণ হাটহাজারীর কোনও নির্দিষ্ট বাস স্টেশন নেই। সড়কের কোথাও বাতি নেই (তবে খাম্বা আছে যথারীতি)। বঞ্চিত হাটহাজারীর ফিরিস্তি দিয়ে বিরাট বই লেখা যাবে। ধোঁকা, প্রতারণা, বঞ্চনার ডিজিটাল সংস্করণটাই দেখেছে হাটহাজারীর কপালপোড়া জনগণ। এত্থেকে নির্মুক্তির কী কোনও পথ নেই?

লেখক: নাট্যকর্মী ও সংস্কৃতি সংগঠক

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...