নগরে চক্রাকারে চলছে হুন্ডি বাণিজ্য, প্রতারণাও

0

হুন্ডিকে দ্রুত টাকা লেনদেনের মাধ্যম মনে হলেও মূলত এটি দ্রুত প্রতারিত হওয়ার মাধ্যম। প্রতারিত হওয়ার মূল কারণ হচ্ছে হুন্ডিতে যেসব লেনদেন সংগঠিত হয় তার কোনটিই বৈধ নয়। এই লেনদেনের নেই কোন আইনগত নিরাপত্তা। তারপরও দেশে বেপরোয়া ও একচেটিয়াভাবে চলছে এই টাকা লেনদেনের অবৈধ ব্যবসা। এ ব্যবসা দেশের অর্থনীতির ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করে চলেছে দীর্ঘদিন থেকে।

হুন্ডির ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মূলত মোঘল অর্থনীতির অধীনে বিকশিত হওয়া একটি অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থ লেনদেনের মাধ্যম হলো হুন্ডি। যা ব্যক্তিপর্যায়ে অর্থ প্রেরণের একটি কৌশল। মুঘল সাম্রাজ্যের রাজস্ব কর্মকর্তারা এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে অর্থ প্রেরণের জন্য প্রায়ই হুন্ডি পদ্ধতি ব্যবহার করতেন। সে সময় মোঘল সাম্রাজ্যের প্রায় সর্বত্রই হুন্ডি ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। হুন্ডি বলতে সাধারণত বাণিজ্য ও ঋণ লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত আর্থিক দলিলগুলোকে বোঝানো হতো। অর্থ প্রেরণের উপায়, ঋণ প্রদান এবং বাণিজ্যিক লেনদেনের ক্ষেত্রে বিনিময় বিল হিসেবেও হুন্ডি ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল।

দ্রুত জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও অর্থের বিনিময় সহজ করার জন্যে হুন্ডি এখন দেশের আইনে একটি অবৈধ ব্যবসা। বর্তমানে অনেকে এ হুন্ডি ব্যবহার করা হচ্ছে প্রতারণা ও নানা অপরাধের মাধ্যম হিসেবে। চট্টগ্রামকে বাংলাদেশের প্রবেশ দ্বার অর্থাৎ বন্দরনগরী বলা হয়ে থাকে। এই নগরী দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয় দেশের ব্যবসায়িক খাতগুলো। আর এই সুযোগকে কাজে লাগাতেই এখানে সক্রিয় রয়েছে হুন্ডি চক্র। বন্দরে পন্য আমদানি-রপ্তানি বানিজ্য অসাধু হুন্ডি চক্র আর্থিক লেনদেন করে আসছে। বিশেষ করে বন্দর টার্মিনালের কন্টেইনার হ্যান্ডেলিং এবং সিএন্ডএফ এজেন্ট যারা রয়েছে তাদের অনেকে মূলত হুন্ডি মাধ্যমে অর্থের লেনদেন করে থাকেন।

পুলিশের দেওয়া তথ্য মতে, হুন্ডি ব্যবসায় চট্টগ্রামের সবচেয়ে বেশি সক্রিয় এলাকা গুলো হচ্ছে খাতুনগঞ্জ, রিয়াজউদ্দীন বাজার, তামাকুমন্ডি লেইন, আসাদগঞ্জ, জহুর হকার মার্কেট, টেরিবাজার। এই জায়গাগুলোতে হুন্ডি ব্যবসায়ীদের বেশ সক্রিয় সিন্ডিকেট রয়েছে। উল্লেখিত স্থানগুলো নগরের বৃহত্তর পাইকারি বাজার হওয়াতে হুন্ডিব্যবসা বেশ লাভজনকও বটে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম জেলা এলাকার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় হচ্ছে সন্দ্বীপ, হাটহাজারী, রাউজান, ফটিকছড়ি, সাতকানিয়া, পটিয়া, লোহাগাড়া। এসব এলাকার অধিকাংশ লোকই প্রবাসী। যারা বিদেশ থেকে টাকা পাঠান হুন্ডির মাধ্যমে। আগে ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠানো একটু সময় সাপেক্ষ হওয়াতে যখন জরুরী প্রয়োজন পড়ে তখনই প্রবাসীরা হুন্ডিতে টাকা পাঠাতেন। যা এখনো প্রচলিত রয়েছে বলে অনুসন্ধানে ওঠে এসেছে। এই সুযোগে প্রতারণা জালও বিস্তর।

দীর্ঘদিন ধরে দুবাই থাকা আইয়ুব আলী জয়নিউজকে জানান, মাঝে মাঝে অনেকটা নিরুপায় হয়ে হুন্ডি টাকা পাঠাই। এখানে দেশীয় মানি এক্সচেঞ্জে গেলে নানা হয়রানি হত। অনেক সময় বলে কারিগরি ত্রুটি দেখা দিয়েছে। আপনার টাকা দেশে পৌঁছাতে সময় লাগবে। কিন্তু আমার জরুরি প্রয়োজনটা তারা (বিদেশের মানি এক্সচেঞ্জ) বুঝে না। কিছুদিন আগে বাবার অপারেশন হয়েছে চট্টগ্রামে৷ নিকটস্থ মানি এক্সচেঞ্জে এক লাখ টাকা পাঠাতে গেলে তারা বলে ট্রানজেকশন লিমিট আজকের জন্যে ওভার (দিনের নির্ধারিত লেনদেন শেষ)। কিন্তু আমার তখন জরুরিভাবে টাকা পাঠাতে হয়েছে। পরে হুন্ডিতে এক লাখ দশ হাজার টাকা পাঠিয়েছি। যেখানে আমাকে অতিরিক্ত দশ হাজার টাকা গুনতে হয়েছে। কিন্তু মানি এক্সচেঞ্জে আমি এই সেবাটা পেলে আমাকে অতিরিক্ত দশ হাজার টাকাও দিতে হতো না। সরকারও কিছু রাজস্ব পেত।

আরেক ওমান প্রবাসী ইয়াকুব আলী জয়নিউজকে জানান, প্রবাসীরা অনেকটা ইচ্ছার বিরুদ্ধে হুন্ডিতে টাকা পাঠায়। একবার হুন্ডিতে টাকা পাঠিয়ে পঞ্চাশ হাজার টাকা হারিয়েছি। প্রতারণা করে আমার টাকা মেরে দিয়েছে হুন্ডি চক্র।

টাকা পাঠাতে হুন্ডি কেন বেঁছে নিলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি ওমানে যেখানে থাকি সেখান থেকে মানি এক্সচেঞ্জ বা ব্যাংক প্রতিষ্ঠান প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে। দীর্ঘ এই পথটা পাড়ি দেওয়া আমার জন্যে একটু কঠিন হয়ে পড়তো। অন্যদিকে মানি এক্সচেঞ্জের হয়রানি রয়েছেই। টাকার অঙ্ক একটু বেশি হলে মানি এক্সচেঞ্জগুলো মাঝে মাঝে এমন আচরণ করে। তখন নিজেদের মনে হয় চোর। প্রবাসী বাঙালিরা যেন এখানে চুরি করতে আসে। অথচ আমরা কতটা কষ্ট করে এখানে টাকা উপার্জন করি তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করার মত নয়।

এছাড়া আরো কয়েকজন প্রবাসীর সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তারা জানান, মধ্যপ্রাচ্যে যারা প্রবাসী থাকেন বিশেষ করে যারা অবৈধভাবে থাকেন তাদের টাকা পাঠানোর একমাত্র মাধ্যম হুন্ডি। কারণ তারা সবসময় ভয়ে থাকেন কখন তাদের পুলিশ ধরে ফেলে। তাই তারা হুণ্ডিকেই বেছে নেন।

মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তথ্যমতে চট্টগ্রাম ও তার আশপাশের জেলাগুলোতে অন্তত ১০টি হুন্ডি সিন্ডিকেট রয়েছে। যার ৩ টি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা ও তার আশপাশের এলাকায়। আবার এদের সঙ্গে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যসহ আন্তর্জাতিক স্বর্ণ চোরাচালান চক্রেরও সম্পর্ক। আন্তর্জাতিক স্বর্ণ ও মুদ্রা চোরাচালান চক্রের এজেন্ট হিসেবে এখানে বেশ কয়েকটি সিন্ডিকেট এ হুন্ডি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে সবচেয়ে নগরের রিয়াজউদ্দীন বাজার, খাতুনগঞ্জ ও তামাকুমণ্ডি লেইনে অন্য ব্যবসার আড়ালে অকেটা নিরবে হুন্ডি ব্যবসা চলছে। আবার স্বর্ণ ও মুদ্রা চোরাচালানের পাশাপাশি এর মাধ্যমেও দেশের টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা যায় রিয়াজউদ্দীন বাজার, খাতুনগঞ্জ ও তামাকুমণ্ডি লেইনে অন্য ব্যবসার আড়ালে সবুজ, সাইফুল, ইমরান, বাবলু, সরোয়ার, আকতার, বেলাল  ও  আজিজ হুন্ডি ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। গত বছরের ৩ মার্চ নগরের সিআরবি এলাকায় একটি প্রাইভেট কার থেকে ৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা মূল্যের ১শ পিস স্বর্ণের বার উদ্ধার করে গোয়েন্দা পুলিশ। এরমাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের জোরারগঞ্জে আরেকটি প্রাইভেট কারে তল্লাশি চালিয়ে ২৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা মূল্যের ৬শ’ পিস স্বর্ণের বার উদ্ধার করে পুলিশ। দুই ঘটনায় জড়িতরা রিমান্ডে এসব স্বর্ণ রিয়াজউদ্দীন বাজার থেকে পাচারের জন্য নিয়ে যাচ্ছিল বলে স্বীকারও করে। যার অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে হাতবদল হয়।

সহকারী পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম) উত্তম চক্রবর্তী জয়নিউজকে জানান, হুণ্ডি প্রচলিত একটি প্রাচীন ব্যবসা। এটির আইনগত কোনো বৈধতা না থাকলেও এর ব্যবহার যে একদম নেই তা বলা যাবে না। গ্রাম অঞ্চলে এখনও এ ব্যবসা প্রকট। তবে এটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পুলিশের গোয়েন্দা টিম কাজ করছে। পুলিশ এখন পর্যন্ত মানি লন্ডারিং আইনে প্রায় পঁচিশটা মামলা করেছে হুন্ডি ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে।

রিয়াজউদ্দীন বাজার ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি শামসুল আলম জয়নিউজকে জানান, এখানে ব্যবসার আড়ালে হুন্ডির ব্যবসা চললেও সবাই থাকে ধারাছোঁয়ার বাইরে। কিছু অসাধু ব্যববসায়ী গোপনে এই কাজ চালায়।

অবৈধ কোনো কর্মকান্ডকে সর্মথন করেন না জানিয়ে তিনি আরও বলেন, সংগঠনের সভাতে আমরা কঠোর নির্দেশনা প্রদান করি। এরপরও যদি হুন্ডি ব্যবসার মতো অবৈধ কোনো কিছুর সঙ্গে ব্যবসায়ীরা জড়িত হয় আমরা সংগঠন থেকে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবো। পাশাপাশি আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার হাতে তুলে দিবো।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের (চট্টগ্রাম শাখা) এক সহকারী পরিচালক জয়নিউজকে জানান, হুন্ডি ব্যবসায় অর্থ লেনদেন অত্যান্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এতে গ্রাহকরা সেবার চেয়ে প্রতারিত হয় বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০১৯ সালের অর্থনৈতিক সমীক্ষা রিপোর্ট অনুযায়ী একবছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার রাজস্ব হারিয়েছে সরকার। যার সব অর্থ গিয়েছে হুন্ডি ব্যবসায়ীদের পকেটে। এটা ব্যাংকিং খাতের জন্যে অশনি সংকেত। গ্রাহকদের আরও সচেতন হতে হবে। একমাত্র গ্রাহক সচেতনতায় পারে হুন্ডি ব্যবস্যায়ীদের রুখে দিতে।

জয়নিউজ/পিডি

 

সরাসরি আপনার ডিভাইসে নিউজ আপডেট পান, এখনই সাবস্ক্রাইব করুন।

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...