একটি গণধর্ষণের বীভৎস গল্প

0

মোবাইল হারিয়েছিল পোশাক কারখানার এক নারী শ্রমিকের। সন্দেহের তীর একই কারখানার দুই নারীর দিকে। কারখানার পুরুষ শ্রমিকরা এগিয়ে এলো মোবাইল উদ্ধারে। ডাক পড়লো অভিযুক্ত দুই নারীর। শুরু হল কথিত বিচারের শুনানি। এতে এক নারী স্বীকার করলেন মোবাইল তিনি নেননি, অপরজন নিয়েছেন। এরপর দুই নারীকে দোষী সাব্যস্ত করা হল। মোবাইলটির দাম নির্ধারণ করা হল দেড় হাজার টাকা। ক্ষতিপূরণ হিসেবে মোবাইল খোয়া যাওয়া সেই নারীকে এ টাকা পরিশোধ করতে হবে ‘দোষী সাব্যস্ত’ এ দুই নারীকে।

গল্পের এটুকু মেনে নেওয়া যায়। বাকি অংশগুলো যতটা না ভয়ঙ্কর তার চেয়ে বেশী করুণ। এ গল্প শুনে যে কেউ হবেন বিস্মিত! ক্ষতিপূরণের টাকা তাৎক্ষণিক পরিশোধ করার ক্ষমতা ছিলো না অভিযুক্ত দুই নারীর। সিদ্ধান্ত হলো এনাম ও রুবেল এ টাকা ওই দুই নারীর হয়ে পরিশোধ করবে।

পাঠক, বিনিময়ে কী দিতে হবে তাদের একটু পরেই তা জানাচ্ছি।

দেড় হাজার টাকা জোগাড় করলো এনাম, রুবেলরা। তাদের সঙ্গে এ ‘সহযোগিতায়’ অংশীদার হলেন ডালিম, কবির, বাবলু ও সেলিম। তারা প্রত্যেকেই অভিযুক্ত দুই নারীর হয়ে দুইশ টাকা করে পরিশোধ করলেন।

গল্পের এ পর্যায়ে মনে হবে এই ছয়জনের সহযোগিতায় আপাতত ‘উদ্ধার’ পেলেন অভিযুক্ত দুই নারী শ্রমিক। সহকর্মীর বিপদে পাশে থেকে সহযোগিতা করায় প্রশংসা পাওয়ার কথা তাদের। কারখানায় তারা পরিচিত হওয়ার কথা মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী হিসেবে। কিন্তু এনাম ও রুবেল ওই দুই নারীকে টাকা দেওয়ার আগেই এঁকে ফেলে ‘সর্বস্ব’ লুটে নেওয়ার ছক।

টাকা দেওয়ার আগেই তারা বলে, ‘যদি আমাদের মনোরঞ্জনে রাজি না হও তাহলে মোবাইল চুরির দায়ে তোমাদের তুলে দেব র‌্যাবের হাতে। তার আগে গণপিটুনি দিয়ে গুড়িয়ে দেব হাত-পা।’

একদিকে জিম্মিদশা, অন্যদিকে চোর সাব্যস্ত হয়ে হাত-পা ভাঙার হুমকি, তার ওপর র‌্যাবের হাতে যাওয়ার ভয়- সব মিলিয়ে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে দুই নারী। এরই মধ্যে নেমে আসে রাত। তাদের নিয়ে যাওয়া হয় জলসা মার্কেটের ছাদে। রাতের আঁধারের সঙ্গে তাদের জীবনেও নেমে আসে অন্ধকার! একে একে আট যুবকের লালসার শিকার হতে হয় তাদের!

প্রথম দফায় এনাম একজনকে ছাদের পানির ট্যাংকের পিছনে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে। অপরপাশে ওই সময় রুবেল ধর্ষণ করছিল অন্যজনকে। তাদের ‘কাজ’ শেষ হলে সেখানে পাঠানো হয় বাবলু ও সেলিমকে। তারাও পালাক্রমে দুইজনকে ধর্ষণ করে। এরপর পাঠানো হয় ডালিম ও কবিরকে। এনামের হাতে দুইশ টাকা করে গুজে দিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে পাঁচ জন।

ছাদের নিচে সিঁড়ির পাশে থাকতো ফারুক ও জাহাঙ্গীর নামের দুইজন। জাহাঙ্গীর মার্কেটের ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রীর কাজ করতো। ফারুক পেশায় হকার। তাদের কানে ছাদের উপর এনামের নেতৃত্বে ধর্ষণের খবর পৌঁছে যায়। এনাম ছাদ থেকে নেমে আসার সময় জাহাঙ্গীর জিজ্ঞেস করে, ছাদে কী হচ্ছিলো? প্রতিউত্তরে এনাম জানায়, ‘তোরাও চাইলে যেতে পারিস। তবে কাজ শেষে আমাকে দিতে হবে পাঁচশ টাকা।’ এনামের এ প্রস্তাবে জাহাঙ্গীর-ফারুকের লালসাও জেগে ওঠে। তারাও যোগ দেয় ধর্ষণযজ্ঞে। সর্বশেষ তারা দু’জন ছাদে গিয়ে ফাঁদে ফেলে আটকে রাখা দুই তরুণীকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে।

চট্টগ্রাম নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) আবদুর রউফ জয়নিউজকে জানান, রোববার সন্ধ্যার পর গণধর্ষণের খবরটি কোতোয়ালী থানা পুলিশ জানতে পারে। এরপর থেকেই ওসি ও পরিদর্শকের (তদন্ত) নেতৃত্বে কোতোয়ালী থানা পুলিশের একটি দল ধর্ষকদের গ্রেফতারে সাঁড়াশি অভিযানে নামে। প্রথমেই ঘটনাস্থলের পার্শ¦বর্তী এলাকা থেকে টহল পুলিশের হাতে আটক হয় একজন। সোমবার ভোর পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে কোতোয়ালী থানার কয়েকটি টিম ছয় ধর্ষককে আটক করতে সক্ষম হয়।

জিজ্ঞাসাবাদে ধর্ষকরা জানায়, মোবাইল খোয়া যাওয়ার পরপরই দুই নারীর দিকে অভিযোগের তীর আসে। তখন এনাম ওই দুই নারীকে ক্ষতিপূরণ না দিলে হাত-পা ভেঙ্গে দিয়ে র‌্যাবের হাতে তুলে দেওয়ার হুমকি দেয়। এতেই ভয় পেয়ে যায় দুই নারী। তাদের হাতে নেই ক্ষতিপূরণের দেড় হাজার টাকা। একপর্যায়ে তাদের হয়ে ওই টাকা পরিশোধের কথা বলে এনাম। বিনিময়ে তাদের কথা মতো ‘সঙ্গ’ দিতে হবে বলে জানায়। ওই মুহূর্তে টাকা পরিশোধের ক্ষমতা না থাকায় এক প্রকার জিম্মি অবস্থায় থাকা ওই দুই নারী এনামের প্রস্তাবে রাজি হতে বাধ্য হয়। এনামের এই ধর্ষণ লালসার সঙ্গে একে একে যুক্ত হয় রুবেল, ফারুক, ডালিম, সেলিম, বাবলু, কবির ও জাহাঙ্গীর। এক প্রকার জিম্মি করেই এনাম বাকিদের সঙ্গে নিয়ে এ গণর্ধষণের আয়োজন করে। এনামের ছলচাতুরীতেই দুই মেয়েকে জিম্মি করা হয় প্রথমে।

কোতোয়ালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোঃ কামরুজ্জামান জানান, ডালিম পেশায় হকার। নিউমার্কেটের সামনে কাপড় বিক্রি করে সে। ফারুক কাজ করে গেঞ্জীর কারখানায়। জলসা মার্কেটের পঞ্চম তলায় চায়ের দোকান আছে সেলিমের। এই মার্কেটেই ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রির কাজ করে জাহাঙ্গীর। শাহ আমানত মার্কেটের সামনে প্যান্টের দোকান আছে কবিরের। বাবলুও পেশায় কাপড় বিক্রেতা। রুবেলও আছে একই পেশায়। এই ধর্ষণের যে আয়োজক সেই এনাম কাপড়ের পাইকারী আমদানিকারক। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

 

জয়নিউজ/হোসেন

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...