বদলে যাচ্ছে শিশুর খেলনা

0

শিশুরা খেলনা বলতে পাগল। একসময় তারা মাটি, প্লাস্টিকের তৈরি খেলনা পেলেই খুশিতে আত্মহারা হয়ে পড়তো। সূর্য ওঠার সাথে সাথে কুমার মাটি দিয়ে তৈরি শিশুতোষ রকমারি নকশার পুতুল, খেলনা গাড়ি, মাটির তৈরি পশুপাখি নিয়ে আসতো বিক্রির জন্য। আর এসব খেলনার জন্য হামলে পড়তো শিশুরা। শিশুর জগৎকে রঙিন করে তুলতো এই খেলনা। শিশুর মানসিক বিকাশে খেলনার বিকল্প নেই। কিন্তু ডিজিটাল যুগে বদলে যাচ্ছে শিশুর স্বভাব। এখন তারা খেলনা হিসেবে স্মার্ট ফোন ও ট্যাবের মত যন্ত্র হাতে তুলে নিচ্ছে। পারিবারিক বন্ধনটা আগের চেয়ে অনেকখানি শিথিল হয়ে গেছে। যার কারণে ছোট থেকেই বাচ্চারা ডিভাইস হাতে পাচ্ছে।

স্যামসং শো-রুমের ব্র্যাঞ্চ ম্যানেজার এ বি এম ইকরাম জয়নিউজকে বলেন, বাচ্চারা আজকাল কার্টুন ও গেমস নিয়েই ব্যস্ত থাকতে চায়। সাধারণত খেলার জন্য বড় ডিভাইসগুলো কিনে নেন অভিভাবকরা। মাসে ৭০% এর মত ডিভাইস আমরা বিক্রি করি। ডিভাইসগুলো ১৪ হাজার নয়শ’ টাকা থেকে ১৬ হাজার নয়শ’ টাকায় বিক্রি করে থাকি।

আমেরিকার একাডেমি ও পেডিয়াট্রিকসের বিশেষজ্ঞদের মতে, কমবয়সী শিশু, বিশেষ করে যাদের বয়স দুই বছরের কম, তাদের কোনোভাবে প্রযুক্তির সাথে সম্পর্ক করতে দেওয়া উচিত নয়। এমনকি প্রযুক্তিপণ্য তাদের সামনে উন্মোচন করাও উচিত নয়। বাস্তবতা হলো, শিশুরা সহজলভ্য বলে আজ প্রযুক্তিপণ্য ব্যবহারে মনোযোগী হচ্ছে।

শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে, খেলার জায়গা বা সঙ্গীর অভাবে আজকের দিনে একটি শিশু ঘরের বিছানা ও সোফাকে খেলার মাঠ বানিয়ে ফেলে। তখন সমাধান হিসাবে শিশুটির হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় স্মার্ট ফোন বা ট্যাব। ফলে শিশুটি একপর্যায়ে বেশি চঞ্চল হয়ে ওঠে। মেজাজ খিটখিটে, চঞ্চলতা ও বিভিন্ন অনিয়ম দেখা যায় তার মধ্যে। এই নেশা থেকে শিশুদের বের করে আনা জরুরি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যায়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক লাইলুন নাহার জয়নিউজকে বলেন, জিপিএ- ফাইভের অসুস্থ প্রতিযোগিতা, পড়াশুনার চাপ বাচ্চাদের খেলাধুলার দিক থেকে সরিয়ে নিচ্ছে। খেলার মাঠের স্বল্পতার কারণে আউটডোর গেমস থেকে দূরে থাকছে বাচ্চারা। সে জায়গাটাই পূরণ করে নিচ্ছে মোবাইল গেমস। এটা বাচ্চাদের নিউরন বা মস্তিষ্কে ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করছে। যার ফলে বাচ্চারা কারো সাথে মিশতে চাচ্ছে না। বাসায় কোনো অতিথি আসলে সৌজন্যবোধের জায়গাটা কমে যাচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, পারিবারিক বন্ধন কমে যাচ্ছে এবং বাচ্চারা আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে তাদের সৃজনশীলতা, যৌক্তিক ভাবনা-চিন্তাগুলোও কমে যাচ্ছে।

হুয়াই কোম্পানির বিক্রয়কর্মী মো. শফিকুল ইসলাম জয়নিউজকে বলেন, আজকের ডিজিটাল যুগে ছেলেমেয়েরা খেলনা নেয় না। টিভির মাধ্যমে অত্যাধুনিক গেমসগুলো দেখে তারা উৎসাহিত হয়ে পড়ে। গেমস এর জন্য বাচ্চাদের চাহিদা হচ্ছে ট্যাব।অভিভাবকরা বাচ্চাদের খেলার জন্য আমাদের কাছ থেকে ট্যাব নিয়ে যাচ্ছে। এখন তিন হাজার টাকা দিয়ে ট্যাব পাওয়া যায়। আমাদের প্রতি মাসে চল্লিশ পিস ট্যাব বিক্রি হয়।

পাইকারি খেলনা বিক্রেতা মো. আব্দুল গফুর জয়নিউজকে বলেন, যুগের পরিবর্তনে আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে গেছে শিশুদের খেলনাও। আমরা পাইকারিভাবে খেলনা বিক্রি করে থাকি। প্রযুক্তির সাথে আমরা পরিবর্তন আনছি খেলনায়। তবে আগের চেয়ে বিক্রি কিছুটা কমেছে।

খুচরা খেলনা বিক্রেতা ইসমাঈল হোসেন শুভ জয়নিউজকে বলেন, আগের মত খেলনা বিক্রি হয় না বললে চলে। আগে মাসে ত্রিশ হাজার টাকার খেলনা বিক্রি করতাম, এখন খেলনাগুলো বিক্রি না হওয়াতে পড়ে আছে।

তবে সচেতন অভিভাবকরা শিশুদের প্রযুক্তিপণ্য থেকে দূরে রাখার পক্ষে। অভিভাবক আমজাদ হোসেন জয়নিউজকে বলেন, বাচ্চাদের ডিভাইস জাতীয় যন্ত্র থেকে দূরে রাখা উচিত। এই সমস্ত যন্ত্র ব্যবহারের ফলে শিশুর চোখের ওপর চাপ পড়ে। আমরা ওদেরকে দিচ্ছি বিধায় ওরা অভ্যস্ত হচ্ছে। বয়স অনুযায়ী চাহিদা পূরণ করা উচিত বলে আমি মনে করি।

অধ্যাপক লাইলুন নাহারের মতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাচ্চাদের খেলাধুলার জন্য যদি নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গা রাখার সরকারিভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়, তাহলে তারা ডিভাইস থেকে সরে এসে আউটডোর অথবা ইনডোর গেমসের প্রতি ঝুঁকবে। তাছাড়া পাঠ্যবইয়ে মোবাইল বা ডিভাইসের উপকারিতার পাশাপাশি ক্ষতিকর দিকটাও প্রচার করতে হবে। এক্ষেত্রে শিক্ষকদেরও  ভূমিকা রাখতে হবে।

জয়নিউজ/আরসি

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...