বাংলাদেশকে ‘ঈদ উপহার’ হিসেবে ১০টি রেল ইঞ্জিন দিল ভারত

0

ঈদ উপহার হিসেবে বাংলাদেশকে ১০টি ব্রডগেজ রেল ইঞ্জিন দিয়েছে ভারত সরকার। সোমবার (২৭ জুলাই) বিকেলে ভারতের গেদে রেলস্টেশন থেকে বাংলাদেশের চুয়াডাঙ্গার দর্শনা জয়নগর চেকপোস্ট এলাকা দিয়ে দর্শনা আন্তর্জাতিক রেলস্টেশনে এসে পৌঁছায় ১০টি ব্রডগেজ রেল ইঞ্জিন।

ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. জয়শংকর এবং রেল, শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল ১০টি ব্রডগেজ রেল ইঞ্জিন বাংলাদেশকে হস্তান্তর করেন।

রেল ইঞ্জিন হস্তান্তর অনুষ্ঠানে দু’দেশের মন্ত্রীরা

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ভারতের রেলপথ প্রতিমন্ত্রী অঙ্গদি সুরেশ। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে এসব রেল ইঞ্জিন গ্রহণ করেন রেলমন্ত্রী মো. নুরুল ইসলাম সুজন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড.আবুল কালাম আব্দুল মোমেন। ভারত সরকারের অনুদান সহায়তায় এ রেল ইঞ্জিনগুলো হস্তান্তর করা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. জয়শংকর পারস্পরিক বিশ্বাস ও শ্রদ্ধার ভিত্তিতে রচিত ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার কালোত্তীর্ণ সম্পর্কের গভীরতার কথা তুলে ধরেন। কোভিড-১৯ মহামারিতেও দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার গতি হ্রাস না পাওয়ায় তিনি সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, চলমান ঐতিহাসিক সম্পর্ক আরো মাইলফলক অতিক্রম করবে।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. জয়শংকর বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে আমাদের দুই দেশের সম্পর্কের ‘সোনালী অধ্যায়’ রচনা চলমান রয়েছে।বিশ্বের খুব কম দেশের মধ্যেই আমাদের মতো ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের অংশীদারিত্ব আজ এই অঞ্চলে সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের ক্ষেত্রে আদর্শ হিসেবে বিবেচিত। ক্রমবর্ধমান বহুমুখী সহযোগিতার মধ্যে রয়েছে পর্যটন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সুরক্ষা, শক্তি, সংস্কৃতি এবং পরমাণু বিজ্ঞানের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি, মহাকাশ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং মানুষে মানুষে শক্তিশালী সম্পর্ক।

তিনি বলেন, কোভিড-১৯ মহামারির প্রাদুর্ভাব বিশ্বকে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে, বিশেষ করে আমাদের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথেও নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। ভারত এই জটিল সময় মোকাবেলায় বাংলাদেশের জনগণকে সহযোগিতা করার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। করোনার কারণে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতাগুলি দূর করার লক্ষ্যে আমাদের উদ্ভাবনী সমাধান বের করতে হয়েছে। আমাদের সময়োপযোগী প্রচেষ্টার ফলে দুই দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায় উৎপাদন শিল্পের জন্য পণ্য ও কাঁচামাল পরিবহনের জন্য মালবাহী ট্রেন ব্যবহার শুরু করেছে। রেলপথে পণ্য পরিবহনের ফলে প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ অব্যাহত থাকা আরও বেশি নিশ্চিত হয়, বিশেষত পবিত্র রমজান মাসে, কারণ স্থল সীমান্ত দিয়ে বাণিজ্য এসময় নানাবিধ বাধার সম্মুখীন হয়।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন , চলমান কোভিড মহামারী আমাদের সামগ্রিক সহযোগিতার গতি স্তিমিত করতে পারেনি। ২০২০ সালের মে মাসে অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন ও বাণিজ্য সম্পর্কিত প্রোটোকলটিতে দ্বিতীয় সংযোজন স্বাক্ষরের ফলে প্রোটোকল রুটের সংখ্যা ৮ থেকে ১০ এ উন্নীত হয়েছে এবং দুটি সম্প্রসারিত বন্দরসহ ব্যবহারযোগ্য বন্দরের সংখ্যা ৬ থেকে ১১-এ উন্নীত হয়েছে। চট্টগ্রাম হয়ে কলকাতা থেকে আগরতলা পর্যন্ত কনটেইনার কার্গো পরীক্ষামূলক পরিচালনার সফল সমাপ্তি প্রকৃতপক্ষে একটি যুগান্তকারী উন্নয়ন, কারণ এটি কেবল আমাদের ঐতিহ্যবাহী নৌপথ সংযোগকেই পুনরায় প্রাণবন্ত করে তোলেনি বরং পারস্পরিক অর্থনৈতিক সুবিধাও বয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে।

সম্প্রতি পণ্য ও কন্টেইনার ট্রেন পরিষেবা চালু হয়েছে জানতে পেরেও আমি আনন্দিত। রেল, অভ্যন্তরীণ বা উপকূলীয় নৌপথ ইত্যাদি সাশ্রয়ী, সময় এবং পরিবেশবান্ধব সংযোগ ব্যবস্থাগুলি আমাদের সরবরাহ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে এবং ব্যবসায়ের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও রেলমন্ত্রী

তিনি বলেন,২০১৯ সালে বাংলাদেশ থেকে ভারতে রপ্তানি এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে – যা আগের বছরের তুলনায় ৪৩% বেশি এবং একটি উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি; আমি বাংলাদেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে ভারতের সাথে তাদের সম্পর্ক আরও বাড়ানোর জন্য আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।ভারত বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ উন্নয়নের অংশীদার। ভারত বিশ্বের যেকোনো দেশের প্রতি যে ঋণ সহায়তা দিয়ে থাকে, তার মধ্যে সর্বোচ্চ হচ্ছে বাংলাদেশকে প্রদত্ত ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি অনন্য হ্রাসকৃত ঋণ সুবিধা। এই প্রকল্পগুলি বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে সহায়তা করবে, যা পরবর্তীস্তরের অর্থনৈতিক উল্লম্ফনের জন্য অত্যাবশ্যক। চলমান এই প্রকল্পগুলিকে ত্বরান্বিত করতে আমাদের একসাথে কাজ করা দরকার।

জয়শংকর বলেন, বিশেষত এই ঐতিহাসিক বছরে এই ধরণের আরও মাইলফলক অতিক্রম করতে চাই, যেমন আগামী বছর আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং আমাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ৫০ বছর উদযাপন করতে চলেছি। এই অংশীদারিত্ব প্রকৃতপক্ষেই অনুকরণীয় হয়ে উঠুক এবং আমাদের বন্ধুত্বের বন্ধনকে আরও জোরদার করুক।

রেলপথ, শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও যোগাযোগ বৃদ্ধিতে এবং দু’দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বকে আরো জোরদার করতে রেল সহযোগিতার তাৎপর্যকে গুরুত্ব দেন।

সাম্প্রতিক সময়ে স্থল সীমান্ত দিয়ে বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ভারত ও বাংলাদেশ কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাব হ্রাস করতে রেল সহযোগিতা আরও বৃদ্ধি করেছে। ব্যয় সাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব বাহন হিসাবে রেল আন্তঃসীমান্ত পণ্য পরিবহণে সহায়তা করেছে। জুন মাসে দু’দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মালবাহী ট্রেন চলাচল হয়েছিল। প্রয়োজনীয় পণ্য এবং কাঁচামাল বহনের জন্য মোট ১০৩টি মালবাহী ট্রেন ব্যবহৃত হয়।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও রেলমন্ত্রী

সম্প্রতি ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে পার্সেল এবং কনটেইনার ট্রেন পরিষেবাও শুরু হয়েছে। এতে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সোমবার ভারতীয় সময় সকাল ১০টার দিকে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের জন্য ঈদ উপহার হিসেবে দেওয়া ১০টি ব্রডগেজ রেল ইঞ্জিন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার গেদে রেলস্টেশনে এসে পৌঁছায়। এরপর গেদে কাস্টম ও ইমিগ্রেশনের আনুষ্ঠানিকতা শেষে বাংলাদেশ সময় বিকাল ৩টা ৫০ মিনিটে বাংলাদেশের উদ্দেশে ছেড়ে আসে রেল ইঞ্জিনগুলো। জয়নগর সীমান্ত পার হয়ে ইঞ্জিনগুলো বিকেল সোয়া ৪টার দিকে বাংলাদেশের দর্শনা আন্তর্জাতিক রেলস্টেশনে এসে পৌঁছায়। ব্রডগেজ রেল ইঞ্জিনগুলো ফুল দিয়ে সাজানো ছিল। ইঞ্জিনগুলো দর্শনা পৌঁছলে চালকদের ফুল দিয়ে অভ্যর্থনা জানানো হয়।

ব্রডগেজ রেল ইঞ্জিন গ্রহণের সময় দর্শনা আন্তর্জাতিক রেলস্টেশনে উপস্থিত ছিলেন চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. আলী আজগার টগর, রেল ভবন ঢাকার অতিরিক্ত মহাপরিচালক (আরএস) মঞ্জুর-উল-আলম চৌধুরী, রাজশাহী পশ্চিম রেলওয়ে জোনের মহাব্যবস্থাপক মিহির কান্তি গ্রহ, চুয়াডাঙ্গার জেলা প্রশাসক নজরুল ইসলাম সরকার, পুলিশ সুপার জাহিদুল ইসলাম ও রাজশাহী পশ্চিম জোনের প্রধান প্রকৌশলী আল ফাত্তা মাসউদুর রহমান।

জয়নিউজ/বিআর
আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...