জীবন নিজেই সম্পদ

0

নিজেকে অপচয় করোনা- সঞ্চিত রাখো! সঞ্চয়কে আবার অতিরিক্ত ভারী করোনা- বিলিয়ে দাও! মহাজাগতিক ছন্দে সাড়া দাও- তোমাকে ঘিরে জীবনকে বইতে দাও..

আদিম সমাজ থেকে বিবর্তিত হয়ে বর্তমানে সামাজিক যে স্তরে আমরা অবস্থান করছি তাকে বলছি- ‘সভ্য’! আমার কিন্তু এই তথাকথিত ‘সভ্য’ বিষয়টি প্রশ্নবোধক মনে হয় প্রায়ই! এই ‘সভ্য’ হতে গিয়ে জীবনটাকে আসলে আমরা কি বানিয়ে ফেলেছি তা একটু ভাবতে চেষ্টা করি! প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রতিটি বস্তুর জন্যে এখন আমরা সুপার স্টোরের উপর নির্ভরশীল! সংগ্রহ-আরোহণমূলক উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে এখন আমরা সম্পূর্ণভাবে ক্রয়মূলক! সাম্যের পরিচয় থেকে এখন আমাদের পরিচয়- ক্রেতা বিক্রেতা! পুঁজিবাদী কাঠামো-প্রতিযোগিতা আমাদের সবকিছুকে নিছক পণ্যে পরিণত করিয়েছে! আমাদের চরম ভোগবাদী বানিয়ে ফেলেছে এই ব্যবস্থা! আমাদের প্রয়োজনের সকল পর্যায় এখন কেবলি ক্রয়যোগ্য! মানুষের বৈষয়িক-বস্তুগত প্রয়োজন তো আছেই, মানবিক বিষয়গুলোও এখন কেনাবেচার বস্তু! আমি বলবো- সভ্যতার নাম নিয়ে আমরা বরং চরম এক অসভ্য স্তরেই বসবাস করছি!

এই পুঁজিবাদী-প্রতিযোগিতাময় ব্যবস্থা মানুষকে রীতিমত রক্ত-মাংসের রোবটে পরিণত করেছে! মানুষ এখন যাবতীয় নিয়মের দাস! মানুষ এখন জীবন-যাপন করতে গিয়ে নিজের জীবনটাই বিসর্জন দিয়ে বসে আছে! সময়ের দাস সবাই গর্বভরে বলছে- আমার কোন সময় নেই! কিন্তু জানছে না কিসের পেছনে সে ছুটছে! জীবন সংগ্রাম করতে করতে মানুষ এখন জীবনদর্শনবিচ্যুত হয়ে পড়েছে! ব্যবস্থা সবাইকে এক অসহায় নিয়মের দাসে পরিণত করেছে! সারাবছর এই নিয়মের দাস থাকার পর তার অবসর সময়টুকু কিভাবে-কতক্ষন কাটাবে সেই বিষয়টাও নির্ধারণ করে দিচ্ছে এই ‘সিস্টেম’! এই সিস্টেমের কাছেই এখন এমনকি মানুষের কাজ-অবসর-প্রতিটি স্পন্দন বন্দি হয়ে গেছে! সবচেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে যে এই বন্দিত্বকেই সবাই বরণ করে নিচ্ছে এবং উদযাপন করতে শিখে গেছে! আমাদের দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে আমরা আসলে এতটুকুন সচেতন নই! নিজেকে একটু বন্ধন-নিরপেক্ষ করে ভাবলেই জানতে পারতাম- জীবন নিজেই আসলে সবচেয়ে বড় একটি সম্পদ! তাহলে জীবন-সম্পদ ফেলে বস্তু-সম্পদের পেছনে ছুটে জীবনকে সম্পদের মুখোমুখি এভাবে দাঁড় করতাম না! এই অসচেতনতার জন্যে আমরা জানতেও পারলাম না যে কখন জীবন বিপন্ন করে সবাই সম্পদলিপ্সু-বস্তুকেন্দ্রিক হয়ে গেলাম! ভাবলাম না যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত প্রতিটি সম্পদই আমাদের বোঝা এবং পাপসম! ধর্ম গ্রন্থেও বলা আছে যে তোমার বেশি সম্পদ স্বর্গে যাবার বাঁধা! তাছাড়া একটুও চিন্তা করলাম না যে একটা জীবন অতিবাহিত করবার জন্যে আসলেই এতকিছুর দরকার আছে কি? ব্যবস্থা আমাদের অন্ধ করে দিয়েছে, প্রতিযোগিতা মনোবিকবোধকে নষ্ট করেছে আর সব মিলিয়ে এক কৃত্তিম-অপ্রয়োজনীয় চাহিদা আমাদের জীবনকে আচ্ছাদিত রেখেছে! আমরা আমাদেরই তৈরী এক মায়াজালে বন্দি! আমাদের জীবনের অদূরেই আছে আরো একটি অদৃশ্য দেয়াল যা মানুষের স্বাধীনতা বিষয়টিকেও পরিহাসময় রেখেছে! মানুষই আজ মানুষের বিকাশের সবচেয়ে বড় বাঁধা!

এই দাসত্ব-বলয় থেকে মুক্তির উপায় আছে কি? আছে! এটাও জানতে হবে- মানুষের শক্তি অপরিসীম! একমাত্র মানুষই নিজেকে ছাপিয়ে উঠতে পারে! অতিক্রম-অস্বীকার করতে পারে নিজের অযোগ্যতাকে! এর জন্যে প্রয়োজন নিজের সূক্ষ্ম-বোধটাকে মরতে না দেয়া আর কোন এক সুন্দর সকালে সবকিছু উদ্ধার করতে পারার সাহসটাকে চর্চা করতে পারা! বুদ্ধের মত সব পেছনে ফেলে হেঁটে যাবার শক্তি সব মানুষের মধ্যেই লুকায়িত থাকে|

মনজুরুল আজিম পলাশ
কুমিল্লা কেন্দ্রিক বহুমুখী সাংস্কৃতিক ও সাংগঠনিক যোগাযোগ চর্চা কেন্দ্র লিঙ্কবাংলার প্রতিষ্ঠাতা প্রধান

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...