কাদামাটিতে তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে ঢাকা

0

ইন্দোনেশিয়ার পালু শহর নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে ভূমিকম্প ও এর পরবর্তী সুনামিতে। কিন্তু কি এমন ঘটেছিল যার কারণে ঘন কর্দমাক্ত মাটিতে দেবে গেছে শহরের বাড়িঘর আর বিল্ডিংগুলো?

বিজ্ঞানীরা এ ধরনের ঘটনাকে বলেন ‘লিকুইফেকশন’। শক্ত মাটি যখন তরলে পরিণত হয়, তখন একে ‘লিকুইফেকশন’ বলে।

ভূ-কম্পন তরঙ্গ যখন ভূপৃষ্ঠের দুইশত মিটারের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়, সেখানকার একুইফার জোন অর্থাৎ পানির স্তর যদি পরিপূর্ণ থাকে, তখন উপরের মাটি ধসে তরলে পরিণত হয়। বালি এবং পানি মিলে একটি জেলির মত পদার্থ উপরে উঠে আসে। এতে ঢেউ খেলতে দেখা যায়। আর নিচে একুইফার জোনে শূন্যতা তৈরি হয়ে উপরের মাটি ধসে পড়ে। যত ধরণের স্ট্রাকচার থাকে সবকিছু মাটিতে তলিয়ে যায়।

ভূমিকম্পের পর ইন্দোনেশিয়ার পালুতে দেখা গেছে তরল মাটিতে সবকিছু দেবে যাওয়ার এই দৃশ্য। তার আগে অতি সম্প্রতি নিউজিল্যান্ডে, চিলিতে এবং আরও আগে জাপান এবং বিশ্বের আরও অনেক দেশে এ দৃশ্য দেখা গেছে।

স্যাটেলাইট থেকে নেওয়া ছবিতে দেখা গেছে, পালুর বিমানবন্দরের দক্ষিণে একটি বিরাট এলাকায় বাড়িঘরের চিহ্নও নেই। সেখানে কাদায় দেবে আছে ৭৪৪টি বাড়িঘর।

দেশটির গণপূর্ত মন্ত্রী বাসুকি হাদিমুলজোনো জানান, সেখানে ধ্বংস এবং মৃত্যুর প্রধান কারণ লিকুইফেকশন।

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় এমনটি ঘটার আশংকা অনেক বেশি। এমনটাই জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ঢাকার বেশিরভাগ অংশ গড়ে উঠেছে এমন জমিতে, যেখানে লিকুইফেকশনের ঝুঁকি অনেক বেশি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের অধ্যাপক ড. আফতাব আলম খান বলেন, ঢাকার অবস্থা খুবই নাজুক। পুরো ঢাকা শহরের ৬০ শতাংশ ভূমির গঠনপ্রকৃতি এমন যে, বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে এরকম ঘটনা ঢাকাতেও ঘটতে পারে।

বাংলাদেশে লিকুইফেকশন বা ভূমি তরলীকরণের ঝুঁকি কতটা- সে প্রসঙ্গে আফতাব আলম খান জানান, ভূমিকম্প হলেই যে লিকুইফেকশন হবে, ব্যাপারটা তা নয়। এটি নির্ভর করবে ভূমিকম্পটি কতটা শক্তিশালী, মাটির কতটা গভীরে এবং সেখানের একুইফার বা পানির স্তরে কতটুকু পানি আছে তার ওপর।

পুরো বাংলাদেশের বেশিরভাগটাই যেহেতু গড়ে উঠেছে নদীবিধৌত পলিমাটিতে, তাই এরকম লিকুইফেকশনের ঝুঁকি কম বেশি অনেক জায়গাতেই আছে। কেবলমাত্র উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া, রাজশাহীর মতো কিছু জেলায় অগভীর মাটিতে শক্ত শিলা বা ‘সলিড ক্রাস্ট’ আছে। যেখানে এর ঝুঁকি নেই।

তিনি আরো জানান, ভূমিকম্প ছয় মাত্রার কাছাকাছি বা তার চেয়ে শক্তিশালী হলে এবং এর উৎপত্তিস্থল যদি দশ হতে পনের কিলোমিটার গভীরতার মধ্যে হয়, তাহলে লিকুইফেকশনের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

তিনি এই ঝুঁকির ভিত্তিতে ঢাকাকে তিনটি অঞ্চলে ভাগ করেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা-পুরানো ঢাকা-মতিঝিল থেকে শ্যামলী পর্যন্ত এলাকা। বাংলাদেশে ১৮৮৫, ১৮৯৭, ১৯১৮ এবং ১৯৩০ সালে বড় ভূমিকম্পে যে ক্ষতি হয়েছে, তার সবই লিকুইফেকশন সম্পর্কিত।

২০০৩ সালে রাঙামাটিতে ৬ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। কিন্তু সেটির উৎপত্তিস্থল ছিল দশ কিলোমিটার বা এগারো কিলোমিটার গভীরে। সে কারণে প্রচ- লিকুইফেকশনে কর্ণফুলী নদীর পাড়ের দুই তিন কিলোমিটার এলাকা ধসে পড়ে।

ঢাকা শহরে এখন যে নতুন বড় বড় ভবন তৈরি করা হচ্ছে, সেগুলোতে ভূমিকম্প প্রতিরোধী ব্যবস্থা থাকছে বলা হলেও, লিকুইফেকশন কতটা প্রতিরোধ করবে তা প্রশ্নবিদ্ধ।

ভূমিকম্পের ঝুঁকি মাপার ক্ষেত্রে লিকুইফেকশনের ব্যাপারটি দশ বছর আগেও বিবেচনা করা হয়নি এদেশে। ফলে তখন বাংলাদেশের যে সাইসমিক জোনিং করা হয়েছে, সেখানে ঢাকাকে একটা মধ্যম ঝুঁকির সাইসমিক জোনের মধ্যে ফেলা হয়েছে। কিন্তু পরে যখন মাইক্রোজোনিং করে এই লিকুইফেকশনের ব্যাপারটি আসলো, তখন এসব জোনে যেসব ভবন আগে থেকে গড়ে উঠেছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে এই ঝুঁকিটা আর বিবেচনা করা হয়নি। বাংলাদেশের বিল্ডিং কোডে এই লিকুইফেকশনের বিষয়টি কতটা বিবেচনা করা হয়, সেটিও প্রশ্নবিদ্ধ।-বিবিসি

জয়নিউজ

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...