রাজনীতির জটিল হিসেবে প্রান্তজনের প্রত্যাশা

0

‘বাঙলাদেশ’র রাজনৈতিক বাস্তবতা গোয়েবলসীয় হিসেবকে ছাড়িয়ে যায়। প্রতি পাঁচ বছর পর পর একটি চিহ্নিত শ্রেণি ড্রয়িং রুম পলিটিক্সে মেতে ওঠে, আর কাঠবিড়ালীর বাগান ভাগের মতো বাকবাকুম করতে থাকে। জোটের রাজনীতি এদেশে খুব একটা পুরনো নয়। এরশাদ শাহীর পতনের প্রয়োজনে বাঘে গরুতে এক ঘাঁটে জল খেয়েছিলো সেই “গণতান্ত্রিক সংগ্রাম”র আগুনঝরা দিনে। তারপর নির্বাচন হয়েছিলো। নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ব্যবসায়ী দুটো দল প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়। পশ্চাৎপদ দলটি জিতে যায়। তুলনামূলক অগ্রসর আওয়ামী লীগ প্রধান বিরোধীদলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। বিরোধীদলীয় রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ বেশ সফলও হয়। ফলস্বরূপ পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনে দীর্ঘ একুশ বছর পর ক্ষমতায়ও আসে। কিন্তু একুশ বছরের রাজপথ কাঁপানো আওয়ামী লীগ ক্রমশঃ অচেনা হয়ে যায়।

একুশ বছরের নির্যাতিত জনগোষ্ঠী কতিপয় ক্ষমতাবাজের নীচে চাপা পড়ে যায়। ত্যাগী ও মেধাবী আওয়ামী গণ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ পরবর্তীতে নির্বাচনে পরাজয়। আওয়ামী লীগকে পরাজয়ের পেছনে “সালসা”র ভূমিকা থাকলেও মূলতঃ চারদলীয় জোটের ভণিতার কারণেই ক্ষমতায় গিয়েছিলো। সেই থেকে এক জোট মহাজোটের এক জটিল রাজনীতি চর্চা হতে থাকে সমানে। জোটগুলোতে কেবল আসন ভাগাভাগিই হয়ে ওঠে মুখ্য। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বৃহত্তর আকাঙ্খার প্রতি নজর দেয়ার গরজবোধ কেউই দেখায়নি। জোট রাজনীতির সবচেয়ে নির্লজ্জ প্রয়াসটি চোখে পড়ে ২০০৮ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনকে কেন্দ্র করে।

বহুলালোচিত ওয়ান ইলেভেনের প্রেক্ষিতে এক নগ্ন দখলবাজির জোট রাজনীতির আবির্ভাব হয় তখন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সেই কোণঠাসা সময়ে “কিংস পার্টি অ্যালায়েন্স”র তোড়জোর বাড়তে থাকে। জনগণের সাথে সম্পর্কহীন একদল পলিটিক্যাল এলিট রাতারাতি ক্ষমতার ছকও বানিয়ে ফেলেছিলো। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাথে আওয়ামী লীগের হঠাৎ সখ্যতার প্রেক্ষিতে কিংস পলিটিশিয়ানরা পিছিয়ে যেতে বাধ্য হয়। ২০০৮ সালের ঐতিহাসিক জাতীয় নির্বাচনে ক্ষমতার অপব্যবহারের চরম শাস্তি ভোগ করলো বিএনপি ও তার দোসররা। পাঁচ বছরেও নিজেদেরকে জনগণের কাছে নিতে পারলোনা। ফলে সরকার একটি নিয়ম রক্ষার নির্বাচন দিয়ে আরও একবার ক্ষমতায় আরোহণ করলো। মধ্যবর্তী নির্বাচনের একটি কুহকিনী আশা জাগিয়ে রাখতে রাখতেই পূর্ণ মেয়াদে উপনীত হলো। সরকারি দলের সৌভাগ্য যে বিএনপি ও তার দোসররা আওয়ামী রাজনীতিকে টেক্কা দেবার সামর্থ্য অর্জন করেনি, নতুবা সরকারের বিপরীতে তাদের উপরই জনগণের আস্থা বেড়ে যেতো।

যাইহোক, আওয়ামী লীগ আধিপত্যবাদের নতুন সংজ্ঞা আবিস্কার করেছে। কিন্তু সেই উল্লম্ফন ঠেকানোর কোনও শক্তি দাঁড়াতে পারলোনা। আর এই সুযোগে আবারও মাথাচাড়া দিলো ড্রয়িং রুম ভিত্তিক কিংস পার্টি। কিং পার্টি অ্যালায়েন্সগুলো রাতারাতি শাসনের ছকও এঁকে ফেলেছে। কিন্তু প্রান্তজন? সেখানেই ওরা ব্যর্থ যথারীতি। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির উপর বিতৃষ্ণ জনতাকে আশ্বস্ত করবার মতো কোনও কথা ওরা বলতে পারলোনা। নির্লজ্জের মতো নিজেরা নিজেরা রাজা উজির হয়ে আবার নিজেরাই নীরব হয়ে গেলো। প্রান্তিক মানুষ কমিটমেন্ট চায়। সুশাসনের নিশ্চয়তা চায়। কিন্তু পলিটিক্সের অকম্মা এলিটরা সেটা দিতে পারেনা এবং এবারও পারেনি। তাই অনিশ্চিত পদযাত্রায় এগিয়ে চলেছে জনতা। তাদের প্রত্যাশার ফানুসটা নিবু নিবু আলো নিয়ে ঝিমিয়েই রয়েছে। জোট মহাজোটের জটিল রাজনীতি। কেবলই জটিল। সারল্য দিয়ে গণমনতুষ্টির কিঞ্চিত লক্ষণও নেই।

 

লেখক: নাট্যকর্মী সংস্কৃতি সংগঠক

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...