আক্ষেপ হয়ে থাকলো শেষ বিকেল

0

চট্টগ্রাম টেস্ট নিশ্চিত স্মরণীয় হয়ে থাকবে মেহেদী হাসান মিরাজের। ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরির পর বল হাতে ৪ উইকেট— আর কী চাই তার! মেহেদীর সঙ্গে অন্য দুই স্পিনার নাঈম হাসান ও তাইজুল ইসলামের ঘূর্ণিতে তৃতীয় দিনেও ছড়ি ঘুরালো বাংলাদেশ। কিন্তু আক্ষেপ হয়ে থাকলো শেষ বিকেল! দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিংয়ে নেমে আত্মসমর্পণ করে এলেন টপ অর্ডারের তিন ব্যাটসম্যান— তামিম ইকবাল, নাজমুল হোসেন শান্ত ও সাদমান ইসলাম।

তাই ১৭১ রানের বিশাল লিড পেয়ে দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করেও স্বস্তিতে থাকতে পারলো না বাংলাদেশ। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ঘুরে দাঁড়ানোর মন্ত্র জপে রাখলো তৃতীয় দিনের শেষভাগে। তবে মুমিনুল হক (৩১*) ও মুশফিকুর রহিমের (১০*) ব্যাট ধরা দিয়েছে আশার আলো হয়ে। দিনের শেষটা উইকেট ধরে রেখে লিড বাড়িয়ে নিয়েছে ২১৮ রানে। তৃতীয় দিন শেষে বাংলাদেশের স্কোর ২০ ওভারে ৩ উইকেটে ৪৭।

তামিমের ওপেনিং সঙ্গী কে হবেন— চট্টগ্রাম টেস্ট শুরুর আগে বাংলাদেশের একাদশ নিয়ে এই প্রশ্নটা ঘুরপাক খেয়েছে ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে। টিম ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্তে সুযোগ হয় সাদমান ইসলামের। লম্বা সময় পর ক্রিকেটে ফিরে এই ওপেনার প্রথম ইনিংসে নিজের সামর্থ্যের পরিচয় দিয়েছেন ফিফটি করে। কিন্তু তামিম? যার সঙ্গী ‘খোঁজা’ হচ্ছিল সেই তিনিই ব্যর্থতার চোরাবালিতে আটকে গেলেন!

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে ৯ রান করা তামিমের দ্বিতীয় ইনিংসে অবস্থা আরও খারাপ। এবার তো রানের খাতাই খোলা হয়নি বাঁহাতি ওপেনারের।

বাংলাদেশের নতুন ‘নাম্বার থ্রি’ স্থায়ী করার পরিকল্পনা। সে কারণেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের ওয়ানডে সিরিজে সাকিব আল হাসানকে সরিয়ে তিন নম্বরে জায়গা করে দেওয়া হয় শান্তকে। টেস্টেও এই ব্যাটসম্যানের ওপর আস্থা টিম ম্যানেজমেন্টের। তাই মুমিনুল হককে চারে নামিয়ে ব্যাটিং অর্ডারের তিন নম্বর জায়গা দেওয়া হয়েছে বাঁহাতি ব্যাটসম্যানকে। কিন্তু ফল? প্রথম ইনিংসে ২৫ রান করে উইকেট বিলিয়ে আসার পর দ্বিতীয় ইনিংসে রানের খাতাই খুলতে পারলেন না শান্ত!

তামিম ও শান্ত দুজনই ‘ডাক’ মেরেছেন চট্টগ্রাম টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে। আর দুজনকেই প্যাভিলিয়নের পথ দেখিয়েছেন রাকিম কর্নওয়াল। দীর্ঘদেহী এই স্পিনারের বলে এলবিডব্লিউয়ের ফাঁদে পড়ে ফেরেন তামিম। ওই ওভারেই কর্নওয়াল স্লিপে জার্মেইন ব্ল্যাকউডের হাতে ক্যাচ বানান শান্তকে। মাত্র তিন বলের ব্যবধানে দুই ব্যাটসম্যানকে হারিয়ে চরম বিপদে পড়ে বাংলাদেশ। স্বাগতিকদের স্কোর তখন ২ ওভারে ২ উইকেটে ১ রান।

ওই জায়গা থেকে দলকে টেনে তোলার চেষ্টা শুরু অধিনায়ক মুমিনুল ও ওপেনার সাদমানের। তবে সাদমানের প্রতিরোধ বেশিক্ষণ টিকেনি। ৪২ বলে ৫ রান করে আউট হয়েছেন তিনি শ্যানন গ্যাব্রিয়েলের বলে। সাদমানের বিদায়ের পর প্রতিরোধ গড়ে দিনের বাকি সময়টা পার করেছেন দুই অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান মুমিনুল ও মুশফিক।

এর আগে বোলিংয়ে বাংলাদেশের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল শুধু জার্মেইন ব্ল্যাকউড-জোশুয়া দা সিলভা জুটি। তাদের বিদায়ের পর ওয়েস্ট ইন্ডিজকে গুটিয়ে দিতে মাত্র কিছু সময় লেগেছে বাংলাদেশের। চট্টগ্রাম টেস্টের প্রথম ইনিংসে ক্যারিবিয়ানদের ২৫৯ রানে অলআউট করে ১৭১ রানের বড় লিড পায় স্বাগতিকরা।

দ্বিতীয় সেশনটা হতে যাচ্ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের। কিন্তু চা বিরতিতে যাওয়ার আগে জ্বলে উঠলেন বাংলাদেশের স্পিনাররা। প্রথমে নাঈম হাসান প্রতিরোধ ভাঙলেন, এরপর যোগ দিলেন মেহেদী হাসান মিরাজ। এই দুই স্পিনারের সাফল্যে দ্বিতীয় সেশনে স্বাগতিকদের প্রাপ্তি ২ উইকেট। চা বিরতি থেকে ঘুরে এসে দ্রুত ৩ উইকেট তুলে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিংয়ে নামে বাংলাদেশ।

সবচেয়ে সফল বোলার মিরাজ। সেঞ্চুরির পর এই স্পিনার বোলিংয়ে নিয়েছেন ৪ উইকেট। আর ২টি করে শিকার মোস্তাফিজুর রহমান, তাইজুল ইসলাম ও নাঈমের।

৫ বলের ব্যবধানে দুই সেট ব্যাটসম্যান হারায় ক্যারিবিয়ানরা। লাঞ্চ বিরতির পর প্রতিরোধ গড়া ব্ল্যাকউড ও জোশুয়া চাপে রেখেছিলেন বাংলাদেশের বোলারদের। সেই তারাই চা বিরতির আগে ফিরে গেছেন প্যাভিলিয়নে। প্রথমে ৪২ রান করা জোশুয়াকে ফিরিয়ে ৯৯ রানের জুটি ভাঙেন নাঈম হাসান। এরপর মিরাজ ফেরান ব্ল্যাকউডকে। লিটন দাসের গ্লাভাসবন্দি হওয়ার আগে ব্ল্যাকউড খেলে গেছেন ৬৮ রানের ইনিংস। ১৪৬ বলের ইনিংসটি তিনি সাজান ৯ বাউন্ডারিতে।

মূল কাজটা বোলিংয়েই করে থাকেন মিরাজ। তবে চট্টগ্রাম টেস্টে ব্যাট হাতেও নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন ঝলমলে সেঞ্চুরিতে। এবার ‘আসল’ কাজ বোলিংয়েও সাফল্য পেলেন ডানহাতি স্পিনার। তার প্রথম উইকেট উদযাপন ৪০ রান করা কাইল মায়ার্সকে। চমৎকার ব্যাটিংয়ে একটু একটু করে উইকেটে মানিয়ে নিয়ে এই ক্যারিবিয়ান ব্যাটসম্যান অস্বস্তি বাড়াচ্ছিলেন স্বাগতিকদের। যদিও মিরাজের ঘূর্ণিতে বেশিদূর আর যেতে পারেননি। এলবিডব্লিউ হওয়ার আগে ৬৫ বলের ইনিংসটি মায়ার্স সাজান ৭ বাউন্ডারিতে।

দিনের প্রথম বলে উইকেট হারালেও ওয়েস্ট ইন্ডিজকে পথে রেখেছিলেন অধিনায়ক ক্রেগ ব্র্যাথওয়েট। হাফসেঞ্চুরি পূরণ করে সেঞ্চুরির পথে হেঁটে অস্বস্তি বাড়াচ্ছিলেন তিনি। ভয় ছড়ানো এই ওপেনারকে থামান নাঈম।

বোল্ড করে ব্র্যাথওয়েটকে প্যাভিলিয়নে পাঠিয়েছেন এই তরুণ ডানহাতি স্পিনার। আউট হওয়ার আগে ক্যারিবিয়ান অধিনায়ক খেলে যান ৭৬ রানের ইনিংস। ১১১ বলের ইনিংসটি তিনি সাজিয়েছেন ১২ বাউন্ডারিতে।

শুরুটা যেমন প্রত্যাশা ছিল, তার চেয়ে বেশিই পায় বাংলাদেশ! চট্টগ্রাম টেস্টের তৃতীয় দিনের শুরুতেই উইকেট উদযাপনের মুহূর্ত এনে দেন তাইজুল ইসলাম। দিনের প্রথম বলেই তিনি ফেরান এনক্রুমা বনারকে। বাঁহাতি স্পিনারের বাঁক খাওয়া বল বনারের ব্যাটে লেগে জমা পড়ে স্লিপে দাঁড়ানো শান্তর হাতে। দুর্দান্ত শুরুতে উইকেট উদযাপনে মাতে বাংলাদেশ। প্যাভিলিয়নে ফেরার আগে বনার ৫৯ বলে ২ বাউন্ডারিতে করেন ১৭ রান।

চমৎকার শুরুর পর দিনের শেষটাও দারুণ হতো পারতো বাংলাদেশের। কিন্তু তামিম-শান্তদের ব্যর্থতায় সেই আক্ষেপ থেকেই গেল স্বাগতিকদের!

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

(তৃতীয় দিন শেষে)

বাংলাদেশ: ৪৩০ ও দ্বিতীয় ইনিংসে ২০ ওভারে ৪৭/৩ (মুমিনুল ৩১*, মুশফিক ১০*, সাদমান ৫, তামিম ০, শান্ত ০; কর্নওয়াল ২/২৮, গ্যাব্রিয়েল ১/১৩)।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ: প্রথম ইনিংসে ৯৬.১ ওভারে ২৫৯ (ব্র্যাথওয়েট ৭৬, ব্ল্যাকউড ৬৮, জোশুয়া ৪২, মায়ার্স ৪০, বনার ১৭; মিরাজ ৪/৫৮, মোস্তাফিজ ২/৪৬, নাঈম ২/৫৪, তাইজুল ২/৮৪)।

জয়নিউজ/এসআই
আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...