শ্যামা

0

রথের চাকার আবর্তনে
আবার হাত পড়ল কাঠামোয়।
বৃষ্টির এলোমেলো ছাট,
গম্ভীর মেঘেদের আনাগোনা আর
তার মধ্যেই খড় বাঁধা শেষ।
এবার মাটির প্রলেপ পাবে খড়ের প্রতিমা,
একটা একটা করে দশটা হাত-
সবে স্পট বোঝা যাচ্ছে,
তবে শির তখনও বাকি।

বার-বাড়িতে শ্যামা বাসন মাজছে,
ফাঁক তালে ছুট্টে এসে দেখে যাচ্ছে
কুমোর দাদুর মা দুগ্গা গড়া।
ফাটা ফাটা মাটির ওপরে
আজ চড়েছে দ্বিতীয় প্রলেপ,
মায়ের মুখ খানাও আজ বেশ স্পষ্ট।


শ্যামা আমার কালো মেয়ে ,
এক ঢাল কোঁকড়ানো চুল খুলে
মুখ ঢেকে যায় লজ্জায়।
তবে চোখ দুটোতে
একটা আগুন দেখি রোজ,
যেন সাক্ষাৎ মা নারায়ণী দাঁড়িয়ে সমুখে!


এবার বিশ্বকর্মার ঘুড়ি-লাটাই
ছেয়ে যাওয়ার দিন,
ভোঁ কাট্টা শব্দে হুল্লোড়ের দিন এল।
ধূসর শাড়িতে
শ্যামার সদ্য যৌবন নদীর মত,
যার বহমানতাকে বাঁধতে পারে
শুধু ধুর্যটির গভীর জটা ।
রোজ এই রাস্তা দিয়েই যায় মেয়ে,
আজ হঠাৎ যেন কী একটা সরে গেল
আবছা ছায়ার মত!
‘কে , কে ওখানে?’
সারা নেই।
শ্যামা বুঝেছিল-
কোন এক অশনি সংকেত অপেক্ষারত।


আজ কুমোড় দাদুর বড় পছন্দের কাজ
আজ যে মহালয়া, মায়ের চক্ষু দান।
শ্যামা পড়েছে লাল টুকটুকে শাড়ি,
তবে আবার যেন সেই ছায়ার আভাস !

 


শ্যামার বুকের ভেতর
একটা অজানা ভয় বসত করে প্রায়ই,
এ যে এক অসুরের চোখ!

বাবুদের বাড়ির দালানে ওঠা বারণ শ্যামার,
ও যে ‘ছোটলোক’,
‘ঠাকুর ছুঁয়ে দিলে সর্বনাশ হবে যে’!
আজ দূর থেকে মায়ের চোখে
তুলির টান দেখবে শ্যামা,
কত্তামার কড়া আদেশ-
‘কাজে যেন ফাঁকি না থাকে’
তাই বাসনটা মেজে এসেই দেখবে তুলির টান।

ওঁৎ পেতে অসুর লুকোয় ঘাটের পাশে
ভাঙাচোরা ইটের স্তুপের আড়াল,
শিকারীর দৃষ্টি হানে শ্যামার ওপর।

হঠাৎ ঘাটের পাড়ে বিকট শব্দ
ঝনঝন করে বাসন গড়িয়ে পুকুর জলে!
কোমরে বাঁধা আচঁলটা খসে পড়ে
লুটিয়ে আছে ঘাটের কাদায়

শ্যামা দাঁড়িয়ে ঘাটের সিঁড়িতে
লাল শাড়িটা ছেঁড়া,
হাতে আঁশ-বঁটি,মুখে রক্তের ছিটে-
ওই মানুষরূপী অসুরটার কাটা হাত
আর
দেহটা ছটফট করছে পাশে।


দূরে শোনাজাচ্ছে শঙ্খ ধ্বনী,
কাঁসর-ঘন্টার আওয়াজ।
ওদিকে দেবীর তৃতীয় নয়নে তুলির শেষ টান-
আরও দৃঢ় তার চিন্ময়ী রূপ!
শ্যামাও আজ ‘দুর্গা’ হল,
নব রূপে ভাঙলো ভয়ের শেকল
মানব অসুর নিধনে সে আজ
“শক্তিরূপেন সংস্থিতা”।

 

চিত্র গ্রাহক: ঋত্বিক দাস
শিল্পী: সম্প্রীতি দাস, সৌরভ দাস

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...