কর্মজীবী দম্পতি বাড়লেও বাড়েনি ডে-কেয়ার সেন্টার

0

সন্তানের কাছে শ্রেষ্ঠ সুরক্ষা মায়ের কোল। কথায় আছে, ‘মুড়ি বলো, চিড়া বল ভাতের সমান নয়, পিসি বলো মাসি বলো মায়ের সমান নয়’!

সন্তানের বেড়ে উঠায় মায়ের ভূমিকাই বেশি। কিন্তু মা যখন কর্মজীবী !

সন্তান পালনে দিনের একটি অংশ মায়ের অভাব মেটায় ডে কেয়ার সেন্টার বা শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র।
ব্যস্ত নগর, স্বামী-স্ত্রী উভয়েই কর্মজীবী। কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে সাতসকালে ছাড়তে হবে ঘর। কিন্তু আদরের শিশুসন্তানের কী হবে? একা বাসায় কার কাছে থাকবে ছোট্ট শিশুটি? বাসার আয়া-বুয়ার উপরই বা ভরসা কতটুকু? রাজ্যের দুশ্চিন্তা, উত্তর নেই!
চট্টগ্রামের শহরে এই শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র অপ্রতুল। নেই কোনো সরকারি উদ্যোগ।

চট্টগ্রাম মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের পরিচালক অঞ্জনা ভট্টাচার্য জয়নিউজকে জানান, তাদের নিয়ন্ত্রণে হামজারবাগে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র চট্টগ্রাম নামে একটি ডে-কেয়ার সেন্টার আছে। সেখানে ৬০ জন শিশু রাখা যায়। ২ জন শিক্ষিকা ও ২ জন সহকারী নিয়ে বর্তমানে সেখানে ৫৫ জন শিশু রয়েছে। যাদের কাছ থেকে মাসিক ১০০ টাকা ফি নেওয়া হয়। তবে সেখানে সমাজের একেবারে নিম্নবিত্ত আয়ের মায়েদের সন্তানদের রাখা হয়।

ডে-কেয়ারের অপ্রতুলতার কথা স্বীকার করে অঞ্জনা বলেন, যেহেতু চট্টগ্রামে কর্মজীবী মা বাড়ছে, তাই প্রতি ওয়ার্ডে একটি করে ডে-কেয়ার সেন্টার থাকা উচিত।

চট্টগ্রাম জাতীয় মহিলা সংস্থার জেলা কর্মকর্তা শাহেনা আক্তার জয়নিউজকে বলেন, আমাদের গার্মেন্টস-কারখানার নারী শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার নামে মুরাদপুরের মোহাম্মদপুরে, অক্সিজেনের চন্দ্রনগরে এবং হালিশহরের সাউথগোলা ক্রসিংয়ে তিনটি ডে-কেয়ার সেন্টার আছে। যার প্রতিটিতে ৩০ জন করে শিশুদের জন্য সরকারি অর্থায়নে দু’বেলা খাবারসহ বিভিন্ন বিনোদনের ব্যবস্থা রয়েছে।

ডে-কেয়ার সেন্টারে ফল উৎসবসহ নানা আয়োজনে ব্যস্ত থাকে শিশুরা

তবে এর বাইরে শহরের মধ্যবিত্ত কিংবা উচ্চবিত্তের সন্তানদের রাখার জন্য চট্টগ্রামে ডে-কেয়ার সেন্টারের অভাব চোখে পড়ার মতো। চট্টগ্রামের গোলপাহাড় মোড়ে ‘ফ্লোরেট ডে-কেয়ার উইথ প্রিস্কুলিং’ নামে একটি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র রয়েছে। নাসিমা সিরাজী এর সমন্বয়ক। যিনি কিছুদিন আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আর্লি চাইল্ডহুড সেন্টারে প্রফেশনাল ট্রেনিং করেছেন।

নাসিমা জয়নিউজকে বলেন, চট্টগ্রামসহ সারাদেশে সরকারি বিনিয়োগে ডে-কেয়ার সেন্টার হওয়া উচিত। ২০১০ সাল থেকে সিটি করপোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে এই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম শুরু হয়। এখানে ৩০ জন শিশুর জন্য টিচার, সিস্টার, কেয়ার-অফিসারসহ মোট ১৩ জন নারী কাজ করেন। তের হাজার টাকা ভর্তি ফি এবং মাসিক বেতন অর্ধ দিবস (৮টা থেকে ২টা অথবা ১২টা থেকে ৬টা) ৬ হাজার টাকা এবং পূর্ণ দিবস (৮টা থেকে ৬টা) ৮ হাজার টাকা। এখানে বাচ্চাদের বিভিন্ন প্রিস্কুলিং বিষয় এবং শিশুবিকাশ উপযোগী নানা ধরনের বয়সভিত্তিক কাজ ও খেলাধুলার ব্যবস্থা রয়েছে।

প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক হুমাইরা নওশীন ঊর্মি বলেন, আমার বাচ্চা সাড়ে পাঁচ মাস থেকে ফ্লোরেটে আছে। বাসায় থাকলে সে হয়ত টিভি দেখত কিংবা আয়ার অজানা ব্যবহার নিয়ে আমি দুশ্চিন্তায় থাকতাম। এখন আমি পূর্ণ মনযোগ দিয়ে ক্লাস নিতে পারি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক জাহেদ আলি চৌধুরী বলেন, আমার সন্তানের বয়স যখন নয় মাস তখন থেকেই সে ফ্লোরেটে আছে। কাজের লোকের অভাবে এবং তাদের ব্যবহার কেমন হবে সেই ভয়ে ছিলাম। এখন আমি সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত থাকি।

তবে তিনি বলেন, সরকারিভাবে আরো অনেক ডে-কেয়ার দরকার। চট্টগ্রামে কর্মজীবী দম্পতি বাড়ছে, তাদের সক্ষমতাকে কাজে লাগানোর জন্য ডে কেয়ার বাড়ানো উচিত।

বিজিসি ট্রাস্ট মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার পি কে মজুমদার জয়নিউজকে বলেন, ডে-কেয়ার সেন্টারগুলোয় শিশুদের সব রকমের শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা উচিত। প্রশিক্ষিত কর্মীদের দিয়ে যেন বাচ্চাদের কেয়ার নেওয়া হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ শিশুর উপর কোনো চাপ থাকলে সারাজীবন তার মধ্যে সেটি আতঙ্ক হয়ে থাকবে।

আরো বেশ কয়েকজন অভিভাবক জানান, সরকারি ও বেসরকারি ডে-কেয়ার সেন্টারের কল্যাণে কর্মজীবিরা অনেক সুফল পাচ্ছেন। তাদের মতে, ডে-কেয়ার সেন্টারে থাকায় শিশুর সামাজিক দক্ষতা বাড়ে। অন্য শিশুর সঙ্গে মেলামেশার মাধ্যমে শিশু অনেক কিছু শিখতে পারে। যেসব শিশু বাড়িতে খাওয়া নিয়ে বিরক্ত করে তারাও অন্য শিশুদের দেখাদেখি ঠিকমতো খায়। একটা শিশুর সঙ্গে আরেকটি শিশুর সখ্য গড়ে ওঠে।

বাংলাদেশের শ্রম আইন অনুযায়ী, ৪০ জন বা তার বেশি নারী নিয়োজিত আছেন এমন প্রতিষ্ঠানে ছয় বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র থাকতে হবে। কিন্তু এ আইন মানছে খুব কম প্রতিষ্ঠান।

আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...