চট্টগ্রামের মর্যাদা বৃদ্ধিতে মেয়রের গুরুত্ব

বিশেষ সম্পাদকীয়

0

বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের কোন নেতা ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ? কোন নেতা নেত্রীকে দেওয়া কথা অক্ষরে অক্ষরে রেখেছেন? কোন নেতা বিবাদ ভুলে, কোন্দল নিরসন করে জাতির ক্রান্তিলগ্নে দলকে করেছেন সুসংহত?

নিশ্চিত নাম- আ জ ম নাছির উদ্দীন!

হ্যাঁ, চট্টগ্রামের প্রিয় মুখ তথা অভিভাবক, মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সিটি মেয়র, আ জ ম নাছির উদ্দীন। এর আগে ধৈর্যের পুরস্কার হিসেবেই আ জ ম নাছিরকে চসিকের মেয়র পদে প্রার্থী মনোনীত করেছেন দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা। মেয়র হয়ে ’পদ’ থাকলেও ’পতাকা’ না থাকায় চট্টল রাজনীতিতে নাছির উদ্দীনকে রাজধানীর সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতার মোকাবেলা করতে হচ্ছে।

একদিকে ছিল বহুধাবিভক্ত বন্দরনগরী চট্টগ্রামের রাজনীতি। তার ওপর সমন্বয়হীন উন্নয়ন। তার পাশে অগ্রাধিকার নিশ্চিতে ব্যর্থতা। যদিও সিটি করপোরেশনের মূল কাজই হলো নগরকে আলোকিত করা, নগরের নালা-নর্দমার গতি-প্রবাহ স্বাভাবিক রাখা এবং নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা। এ কর্মযজ্ঞ পালনে গুরুত্ব বহন করে হোল্ডিং ট্যাক্স। ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয় নির্দেশিত হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়ে আসে চরম বিরোধিতা। জলাবদ্ধতায় সকলে মিলে মেয়রের ‘গুষ্টি ধরে গালি দেওয়া’— সবমিলিয়ে সরকারের অর্জনে যেন পড়েছিল কর্ণফুলীর ভাটার টান। এমন অবস্থায় সামনে চলে আসে জাতীয় নির্বাচন। যাকে টার্গেটে রেখে সিংহভাগ আসনে জয় নিশ্চিত করতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রয়োজন ছিল দক্ষ ও বিচক্ষণ একজন অভিভাবক। নেত্রী ভরসা করলেন নাছির ভাইয়ের ওপর। নাছির নেত্রীকে উপহার দিলেন সবকটি আসন!

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের মান-অভিমান ভুলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে চট্টগ্রামের সবাই ঐক্যবদ্ধ হলেন। দীর্ঘদিনের বিবদমান আওয়ামী লীগের মধ্যমণি হয়ে মেয়র নাছির দিলেন ঐক্যের বাঁশিতে ফুঁ! বিশেষ করে, মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের পাশে থেকে যেভাবে আ জ ম নাছির প্রচারণা চালিয়েছেন, তাতে রাজনৈতিক মহল বলতে বাধ্য হয়েছে, পিতা হারানো নওফেল নির্বাচনের মাঠে পাশে পেয়েছেন নগরপিতাকে, রাজনৈতিক অভিভাবক হিসেবে। এই ছিল নাছির ভাইয়ের ক্যারিশমা। যা নির্বাচনি রাজনীতিতেই নয় শুধু, সারা দেশের রাজনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। আওয়ামী লীগসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব শক্তিকে নিয়ে নির্বাচনে বৃহত্তর চট্টগ্রামের সবক’টি আসনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে মহাজোট ও আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা। বিশেষ করে আ জ ম নাছির উদ্দীন সবাইকে নিয়ে নৌকার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ প্রচারণা চালিয়ে প্রার্থীদের নিরঙ্কুশ বিজয় নিশ্চিত করতে সক্ষম হন। এর পুরস্কার হিসেবে চট্টগ্রামবাসীর সময়ের দাবি- শুধু ব্যক্তি নাছির নয়, বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর চট্টগ্রামের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনকে মন্ত্রী পদমর্যাদা দেওয়া হোক।

কারণ, আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ করতে নেতৃত্ব দেন এই সিটি মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন। সবাইকে নিয়ে নৌকার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ প্রচারণা চালান নগরের ৬টি সংসদীয় আসনসহ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও ফেনীতেও। নির্বাচনে চট্টগ্রাম নগরের ৬টি আসনসহ বৃহত্তর চট্টগ্রামের সব আসনে আওয়ামী লীগ ও মহাজোটের প্রার্থীদের জয়ী করতে নিরলস পরিশ্রমের ‘পুরস্কার’ হিসেবে তাই চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনকে মন্ত্রী পদমর্যাদা দেওয়া হতে পারে বলেই আভাস মিলছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়রের মতো মেয়র নাছিরের মন্ত্রীর পদমর্যাদার দাবি ওঠে মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণের বছরপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত সুধী সমাবেশেও। হালে এ দাবিতে নতুন হাওয়া লেগেছে। আঞ্চলিক ও জাতীয় পত্রিকাগুলো সরব মেয়র নাছিরের মন্ত্রিত্ব নিয়ে। তবে যাঁর পদমর্যাদা নিয়ে এত হৈচৈ, সেই মানুষটিই নির্বিকার।

মেয়র নাছিরের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতায় তাঁর বক্তব্য ছিল এমন- ‘দলনেত্রী যখন শেখ হাসিনা, তখন দলের কোনো ব্যক্তিকেই অন্তত পদ পাওয়া নিয়ে ভাবতে হবে না। কারণ দলনেত্রী জানেন কখন, কাকে কোন পদ দিতে হবে। দলের সব নেতার খোঁজ-খবর তিনি নিয়মিত রাখেন। দলের কোনো নেতাই বলতে পারবেন না, তাঁর প্রাপ্য সম্মান বঙ্গবন্ধুকন্যা দেননি। কারো কথা বাদ দিলাম, আমার নিজের কথাই বলি। আমি সবসময় দলনেত্রীর নিদের্শমতো কাজ করার চেষ্টা করেছি। আমার মতো একজন মানুষকে তিনি বাছাই করলেন মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পরে মেয়র পদে। আমার চাওয়া যতটা ছিল, এর চেয়েও তিনি বেশি দিয়েছেন’।

মিডিয়ায় মেয়রের মন্ত্রিত্বের প্রসঙ্গে দলনেত্রীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস রেখে নগরপিতা নাছিরের মন্তব্য ছিল এমন- ‘আমার কী প্রাপ্য তা মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচারের প্রয়োজন নেই। উনি বঙ্গবন্ধুকন্যা, উনি ভালো করেই জানেন কাকে কখন কোথায় নিতে হবে। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি অদ্বিতীয়’।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকা ও চট্টগ্রামের মেয়র অভিন্নভাবে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা পেতেন একসময়। আর এখন ঢাকার দুই মেয়র পূর্ণ মন্ত্রীর মর্যাদা পেলেও চট্টগ্রামের মেয়রকে মন্ত্রীর পদমর্যাদা না দেওয়ায় চাপা ক্ষোভের বিস্তার ঘটছে ৬০ লাখ মানুষের নগরী চট্টগ্রামে। ফলে শিক্ষাবিদ, জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে সমাজকর্মী, সংগঠকসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অভিন্ন দাবি, ‘চট্টল মেয়রকে পূর্ণ মন্ত্রীর মর্যাদা দেওয়া হোক।’

কারণ, ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল ঢাকা ও চট্টগ্রামের তিন সিটিতেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বছর না পেরোতেই ঢাকার দুই মেয়র পান মন্ত্রীর মর্যাদা। নারায়ণগঞ্জ সিটি মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভিকেও উপমন্ত্রীর মর্যাদা দেওয়া হয়। কিন্তু তা অধরা রয়ে যায় চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে। অথচ ১৯৮৯ সালে চট্টগ্রামের প্রথম মনোনীত মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরীকে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা দেওয়া হয়েছিল। বিএনপি মনোনীত সাবেক মেয়র মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিনও মেয়র থাকাকালে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় ছিলেন।

আ জ ম নাছিরের রয়েছে বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার। নগরের ঐতিহ্যবাহী মুসলিম হাই স্কুলে পড়ার সময় ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৭৭ সালে চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পান। আশির দশকের শুরুতে (৮১-৮২ ও ৮২-৮৩) দুই মেয়াদে ছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। সে দশকের মাঝামাঝিতে দু’দফায় ছিলেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহসভাপতি। এরপর নাছির ধীরে ধীরে ছাত্র ও তরুণদের আদর্শে পরিণত হতে থাকেন। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে এমনকি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিজের নিয়ন্ত্রণ ও সংগঠনের শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকেন। তার এমন উত্থান সহজ ছিল না। নিজ ঘরে জ্বলেছে কোন্দলের আগুন। কখনো দাবানল, কখনো ছাই চাপা ছিল সেই আগুন। কিন্তু বড় অন্তরের নাছির ভাইকে কেউ দাবিয়ে রাখতে পারেননি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে তিনি আওয়ামী লীগের কোনো পদ-পদবিতে না থেকেও আজ তিনি চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের কাণ্ডারি। সময় জবাব দিয়েছে, নাছির ভাই কেবল আওয়ামী লীগ নয়, চট্টগ্রামেরই পরিণত অভিভাবক।

জার্মানির হ্যামিলন শহর। আজ থেকে প্রায় সাড়ে সাতশ’ বছর আগের কথা। ক্যালেন্ডারে তখন ১২৮৪ সাল। ছোট্ট, সাজানো, সুন্দর শহর হ্যামিলন৷ শহরের মানুষের খুব দুঃখ৷ সেখানে ভয়ঙ্কর উপদ্রব ইঁদুরের। যেন ইঁদুর বন্যা। হাজারে হাজারে ইঁদুর৷ এখানে সেখানে৷ একদিন ইঁদুরের উপদ্রব থেকে ত্রাণকর্তা হিসেবে শহরে আসেন এক বাঁশিওয়ালা। যার বাঁশির ফুঁতে ছিল অচেনা সুর। কেউ শোনেনি সেই সুর আগে। যার আকর্ষণে বেরিয়ে আসে শহরের সব ইঁদুর। সুরের সম্মোহনে পাগল করে ইঁদুরগুলোকে নদীতে নিয়ে অদৃশ্য করে রক্ষা করেছিলেন পুরো শহরকে। ঠিক একইরকম একজন বাঁশিওয়ালা আছেন বন্দরনগরী চট্টগ্রামে। যার হাতে বাঁশি না থাকলেও যার কণ্ঠের ঐক্যের সুরে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন চট্টগ্রামের পুরো আওয়ামী লীগ পরিবার। দলবেঁধে নেমেছেন নৌকার বিজয়ের জন্য।

হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা প্রাপ্য সম্মান না পাওয়ায় অভিমান করেছিল। কিন্তু এক্ষেত্রে মেয়র নাছিরের ভূমিকা অভিমানের নয়। তিনি দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন নীরবে। চট্টগ্রামবাসীর প্রাণের দাবি, মর্যাদাবান মানুষটিকে দেওয়া হোক মন্ত্রীর মর্যাদা!

লেখক: সম্পাদক, জয়নিউজবিডি
আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...