চট্টগ্রাম কুমিরা রেলওয়ে ষ্টেশন এলাকায় রেললাইনের দুই পাশজুড়ে গড়ে উঠেছে শত শত অবৈধ স্থাপনা।
ওই এলাকায় রেলওয়ের জমি ও রেলের কোয়ার্টারসহ দখল করে বাসাবাড়ি নির্মাণ করে ভাড়া দিয়ে সাবেক রেলওয়ে কর্মকর্তা এটি এম নাসির উদ্দিন এখন বিরাট জমিদার। তাছাড়া রেলওয়ের জমিতে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করে ভাড়া দিয়ে বনে গেছেন কোটিপতি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রেলের ভূমি ব্যবস্থাপনা নীতি অমান্য করে তিনি দীর্ঘদিন ধরেই এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।
স্থানীয় এলাকাবাসীরা জানান, কুমিরা রেলওয়ে ষ্টেশনের উত্তর পাশে কর্ণফুলী ষ্টীল মিল সংলগ্ন রেলের ৫০ শতক জমি কৃষিলিজ নিয়ে এটি এম নাসির উদ্দিন নির্মাণ করেছেন একতলা ভবন। তিনি নিজেই সেখানে বসবাস করছেন আবার ভাড়া দেওয়ার জন্য অর্ধশতকেরও বেশি ঘর নির্মাণ করেছেন।
রেলের জমিতে নিজের জন্য বাড়ি নির্মাণ ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করে ভাড়া দেয়ার বিষয়টি স্বীকার করে নাসির উদ্দিন বলেন, আমি রেলওয়ে থেকে জমি কৃষি লিজ নিয়ে বাসা ভাড়া দিয়েছি। এই জমি দীর্ঘদিন খালি পড়েছিল। অন্যরা বাসাবাড়ি ও দোকান দিয়েছে, তাদের দেখে আমিও দোকান নির্মাণ করেছি। রেলওয়ের যখন প্রয়োজন হবে তখন ছেড়ে দেবো।
কৃষি লিজ নিয়ে দোকান করার কোন নিয়ম আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, শুধু আমি কেন, শত-শত লোক রেলওয়ের জমি অন্যায়ভাবে জবর দখল করে ভোগ করছে, আমিও করছি। আমার পাশে কর্ণফুলী স্টীল কৃষি লিজ নিয়ে সেখানে ইন্ডাস্ট্রি করে ফেলেছে, তাদের বিষয়ে কেউ মাথা ঘামাচ্ছে না।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, রেলওয়ের ভূমি ব্যবস্থাপনা নীতিমালায় বলা হয়েছে, যে উদ্দেশ্যে জমি ইজারা দেয়া হয়েছে সেই উদ্দেশ্য ছাড়া অন্য কোন কাজে ব্যবহার করা যাবেনা। যদি কেউ করে তাহলে তা লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ করার শামিল। আর এই অপরাধে বিনা নোটিশে ইজারা বা লাইসেন্স বাতিল করার বিধান আছে।
তবে চোখের সামনে এমন অপরাধ সংগঠিত হলেও কোন লাইসেন্স এখনো বাতিল হয়েছে বলে কোন নজির নেই।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, কুমিরা রেলওয়ে ষ্টেশনে রেলের অধিকাংশ জমি দখল করেছেন অনেকে। বছরের পর বছর রেলের এসব জমি বেদখল হয়ে থাকায় সরকার হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব। সেইসঙ্গে রেললাইনের দুই পাশে শত শত অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করায় মাঝে মধ্যে ঘটে দুর্ঘটনা।
অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নিয়েও উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করেনি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। এজন্য দিন দিন রেলের জমি দখল বাড়ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, এই কলোনিতে ৪০ টার অধিক রেলওয়ের কোয়ার্টার ছিল, অনেক এলোডিও ছিল একসময়। এখন অযত্ন অবহেলায় এগুলো ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এখন এখানে আর রেলের কেউ থাকেনা, যে যেভাবে পারছে সেভাবেই দখল করে ভাড়া বাণিজ্য চালাচ্ছে।
গতবছর একবার উচ্ছেদ অভিযান চালালেও ভূমিদস্যুদের বাধার মুখে পুরোপুরি উচ্ছেদ করতে পারেনি। আংশিক উচ্ছেদ করে ফিরে আসে অভিযানিক দল। কিছুদিন যেতে না যেতেই তা আবারো দখলে নেয় ভূমিদস্যুরা।
জানা যায়, বাংলাদেশ রেলওয়ের সম্পদ লুটেপুটে খাওয়ার জন্য গঠিত হয়েছে কয়েকটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। তাদের নিয়ন্ত্রণের অভিনব কৌশলগুলোও পুরো রেলওয়েকে জিম্মি করে রেখেছেন।
এই শক্তিশালী সিন্ডিকেটের একটি পরিচালিত হয় বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলকে কেন্দ্র করে। গুটি কয়েক ব্যবসায়ী নামধারী ভূমিদস্যুর নিয়ন্ত্রণে পূর্বাঞ্চলের ভূমি ও বানিজ্যিক ইজারা কার্যক্রম।
বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বানিজ্যিক জায়গা ও সর্বোচ্চ রাজস্বের জোগান দেওয়া প্রতিটি খাত নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে।
এই সিন্ডিকেটকে পর্দার আড়ালে রেখে যাবতীয় সুযোগ সুবিধা দিয়ে মাফিয়া-টাইপ একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের কৌশলগুলো প্রয়োগের ক্ষেত্র তৈরি করে দেয় পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় থাকা অসাধু কর্মকর্তারা।
এসব কর্মকর্তাদের যোগসাজশে সিন্ডিকেট তাদের নিয়ন্ত্রণে রেখে গুরুত্বপূর্ণ প্রায় প্রতিটি ভূমি ও বানিজ্যিক ইজারা কার্যক্রম পরিচালনা করে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দখলের বিষয়টি স্বীকার করে বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রামের বিভাগীয় ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা (ডিইও) দীপংকর তঞ্চ্যঙ্গা বলেন, আমরা সমস্ত অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করার চেষ্টা করছি, এর আগেও আমরা কুমিরা এলাকায় অভিযান চালিয়েছি, সেখানে ভূমিদস্যু চক্র আমাদের ওপর হামলা করেছে, স্কেভেটরের চালকের মাথায় আঘাত করেছে। ফলে আমরা পিছু হঠতে বাধ্য হয়েছি।
কিছুদিন আগেও ফৌজদার হাট এলাকায় অভিযান চালাতে গিয়েও হামলার শিকার হয়েছি। আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি আরো বেশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, আরএনবি ও আনসার সদস্যদের নিয়ে আবারো অভিযান চালানো হবে।
জেএন/পিআর




