চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বাস্তবায়নাধীন বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচসংক্রান্ত মেগাপ্রকল্পের কাজ দৃশ্যমান অগ্রগতির মুখ দেখছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রকল্পের প্রায় ৭০ শতাংশ ভৌত কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। তবে ভূমি অধিগ্রহণের ধীরগতি এবং জ্বালানি সংকটের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে।
পাউবো সূত্রে জানা গেছে, ১ হাজার ১৫৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটি সাতটি ভাগে বিভক্ত। এর আওতায় নদী খনন, তীর সংরক্ষণ, বাঁধ নির্মাণ, ফ্লাড ওয়াল, রেগুলেটর স্থাপনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন কাজ চলছে।
দৃশ্যমান অগ্রগতি
প্রকল্প এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, খালের দু’পাশে আরসিসি ব্লক বসিয়ে তীর সংরক্ষণের কাজ দ্রুত এগোচ্ছে। ভাটিখাইন, ছনহরা ও হাইদগাঁও ইউনিয়নে ৪ দশমিক ৪০ কিলোমিটার তীর প্রতিরক্ষার মধ্যে প্রায় ৩ দশমিক ৫০ কিলোমিটার কাজ শেষ হয়েছে। এতে শ্রীমাই খালের ভাঙন রোধে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
এছাড়া প্রকল্পের আওতায় ৩০ দশমিক ২০ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের কাজ শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে। গরুলুডা, শ্রীমাই ও চানখালি খালসহ মোট ১১টি খালের কাজ শেষ হয়েছে।
পাউবো জানিয়েছে, নদীতীর সংরক্ষণ কাজের ৯২ শতাংশ এবং ৪ দশমিক ১০ কিলোমিটার ফ্লাড ওয়াল নির্মাণের ৮৩ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। ২৫টি সেচ রেগুলেটরের মধ্যে ৬৮ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।
লক্ষ্য ও সম্ভাবনা
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৩২০০ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে ১৩ হাজার ৫০০ হেক্টর জমি বন্যার ক্ষতি থেকে রক্ষা পাবে।
ফসল উৎপাদনের নিবিড়তা ১৯৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৩০ দশমিক ৫৪ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বছরে প্রায় ২ লাখ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য উৎপাদনের সম্ভাবনাও দেখছে কর্তৃপক্ষ।
পাশাপাশি মিঠা পানির মৎস্য চাষ বৃদ্ধি, খালে মাছের স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করা এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার কথাও বলা হচ্ছে।
স্থানীয়দের আশা
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, আগে জলাবদ্ধতা ও বন্যার কারণে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হতো। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ১৭টি ইউনিয়নের মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে। দীর্ঘদিন অনাবাদি থাকা জমিও আবার চাষের আওতায় আসবে বলে আশা করছেন তারা।
ধীরগতি ও শঙ্কা
তবে প্রকল্পের সব দিক সমান গতিতে এগোয়নি। বিশেষ করে ভূমি অধিগ্রহণের কাজ এখনো মাত্র ১৭ দশমিক ১০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে, যা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সংকট দেখা দেওয়ায় কাজের গতি কিছুটা কমেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোও এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের আশঙ্কা, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে উন্নয়ন কাজ স্থবির হয়ে পড়তে পারে।
কর্মকর্তাদের বক্তব্য
চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড ডিভিশন-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে সাহীদ বলেন, প্রকল্পের ফ্লাড ওয়াল, বেড়িবাঁধ ও সিসি ব্লকের কাজসহ প্রায় ৭০ শতাংশ ভৌত কাজ শেষ হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পটিয়ার কয়েক লাখ মানুষ উপকৃত হবে। একই সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটবে এবং নদী ও খালের ভাঙন ও লবণাক্ত পানির প্রবেশ রোধ করা সম্ভব হবে।
সময়সীমা
জুলাই ২০২১ থেকে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা জুন ২০২৭ সালে।
তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে হলে ভূমি অধিগ্রহণ ও জ্বালানি সংকটসহ বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ দ্রুত কাটিয়ে ওঠা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পটিয়ার এই মেগাপ্রকল্প একদিকে কৃষি ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে বড় সম্ভাবনার দ্বার খুলছে, অন্যদিকে বাস্তবায়নের গতি ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে প্রশ্নও তুলছে।
দৃশ্যমান অগ্রগতি যেমন আশার বার্তা দিচ্ছে, তেমনি কিছু কাঠামোগত সমস্যার সমাধান না হলে নির্ধারিত সময়সীমা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।




