এক জাহাজেই ৬০৭ কোটি বাড়তি খরচ!

ইস্টার্ন রিফাইনারির ‘কমব্যাক’ নাকি অস্থায়ী স্বস্তি?

অনলাইন ডেস্ক

দীর্ঘ অব্যবস্থাপনা, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি আর আমদানি নির্ভরতার নগ্ন বাস্তবতায় বিপর্যস্ত জ্বালানি খাত—অবশেষে সাময়িক স্বস্তির খোঁজে চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়তে যাচ্ছে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ ‘এমটি নাইনেমিয়া’।

- Advertisement -

আজ বুধবার দুপুরে জাহাজটির আগমন শুধু একটি নিয়মিত সরবরাহ নয়, বরং টালমাটাল জ্বালানি ব্যবস্থাপনার ওপর চাপা সংকটের এক অস্থায়ী উপশম।

- Advertisement -
google news follower

রিফাইনারি সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো স্পষ্ট করে বলছে—মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি মার্চ ও এপ্রিলে বাংলাদেশকে কার্যত জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খল থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।

নির্ধারিত সময়সূচি ভেঙে পড়ে, জাহাজ আসেনি, আর সেই ব্যর্থ পরিকল্পনার খেসারত গুনতে হয়েছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসিকে।

- Advertisement -
islamibank

মজুত দ্রুত তলানিতে ঠেকে গেলে বাধ্য হয়ে উৎপাদন কমানো হয়, শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় তেল পরিশোধন—যা একটি কৌশলগত খাতের জন্য সরাসরি সতর্কসংকেত।

এই প্রেক্ষাপটে ‘এমটি নাইনেমিয়া’র আগমন নিছক একটি জাহাজের নোঙর ফেলা নয়—এটি একটি ভঙ্গুর সিস্টেমের ওপর জরুরি অক্সিজেন সরবরাহ।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, তেল খালাসে কয়েক দিন সময় লাগবে। এরপর রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি ধাপে ধাপে ইউনিট চালু করে ৮ অথবা ৯ মে থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে ফেরার কথা।

অর্থাৎ ডিজেল, পেট্রলসহ জ্বালানির সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার আশা দেখানো হচ্ছে—যদিও সেটি কতটা টেকসই, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

ইস্টার্ন রিফাইনারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শরীফ হাসনাত সংক্ষিপ্তভাবে বলেন, জাহাজটি বুধবার দুপুরে পৌঁছাবে, এরপরই শুরু হবে তেল শোধনের প্রক্রিয়া এবং উৎপাদন পুরোদমে চালু হবে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো—এই ‘পুরোদম’ শব্দটি এখন নির্ভর করছে একটি অনিশ্চিত বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) কর্মকর্তাদের তথ্য আরও উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে।

দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার ৮০ শতাংশই সরাসরি পরিশোধিত তেল আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়, মাত্র ২০ শতাংশ আসে নিজস্ব পরিশোধন থেকে।

অর্থাৎ সামান্য একটি সরবরাহ ব্যাঘাত পুরো ব্যবস্থাকে অচল করে দিতে পারে—যার সাম্প্রতিক উদাহরণ গত দুই মাস।

সংকটের গভীরতা বোঝাতে ‘নরডিক পলুকস’ জাহাজের ঘটনাই যথেষ্ট। ২ মার্চ সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দরে গিয়ে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আটকে পড়ে জাহাজটি।

৩ মার্চ তেল বোঝাই করেও সেটি রওনা দিতে পারেনি, বরং আবার ফিরে যেতে বাধ্য হয় টার্মিনালে—এখনো সেখানেই অচল অবস্থায় পড়ে আছে। অর্থাৎ পরিকল্পনা শুধু ব্যাহত হয়নি, সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।

অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি (অ্যাডনক) থেকে তেল আনার চুক্তিও ভেস্তে যায়। ‘এমটি ওমেরা গ্যালাক্সি’ জাহাজের মাধ্যমে তেল আনার পরিকল্পনা থাকলেও জাহাজ কোম্পানি চুক্তি বাতিল করে।

জেবেল ধানা বন্দর বাদ দিয়ে ফুজাইরা বন্দর থেকে তেল নেওয়ার প্রস্তাব আসে—যা হরমুজ প্রণালি এড়াতে সহায়ক হলেও আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দেয় বহুগুণে।

শেষ পর্যন্ত বিকল্প হিসেবে সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে ২৪ এপ্রিল রওনা দেয় ‘এমটি নাইনেমিয়া’। কিন্তু এই বিকল্পের মূল্য ভয়াবহ। এক জাহাজেই অতিরিক্ত খরচ পড়ছে প্রায় ৬০৭ কোটি টাকা।

প্রায় এক লাখ টন অপরিশোধিত তেলের জন্য গুনতে হচ্ছে ১০০ দশমিক ৮৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার—বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ১ হাজার ২২৩ কোটি টাকা।

প্রতি ব্যারেলের দাম দাঁড়িয়েছে ১২৬ দশমিক ২৮ ডলার—যা স্বাভাবিক বাজারদরের তুলনায় অনেক বেশি।

বলা যায়, বাংলাদেশের জ্বালানি খাত এখনও গভীরভাবে আমদানি নির্ভর, ঝুঁকিপূর্ণ এবং বহির্ভূত সংকটের কাছে অসহায়।

‘এমটি নাইনেমিয়া’ সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। বরং এটি মনে করিয়ে দিচ্ছে—কৌশলগত পরিকল্পনা, বিকল্প সরবরাহ চেইন এবং নিজস্ব পরিশোধন সক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া ভবিষ্যতে আরও বড় সংকট অনিবার্য।

KSRM
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জয়নিউজবিডি.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।

এই বিভাগের আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ