নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার ছয় দিন আগে চট্টগ্রামে ‘মেমেই’, এরপরই কালো তালিকায়

‘ডিসকো শওকত’-এর প্রতিষ্ঠানের কেনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা

অনলাইন ডেস্ক

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে একটি জাহাজ কয়েক দিন ধরে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে। নাম তার ‘মেমেই’।

- Advertisement -

সাধারণ চোখে এটি হয়তো একটি পুরোনো কেমিক্যাল ট্যাংকার, যার গন্তব্য ছিল সীতাকুণ্ডের কোনো শিপব্রেকিং ইয়ার্ড।

- Advertisement -
google news follower

কিন্তু আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, ইরানি পেট্রোকেমিক্যাল বাণিজ্য, অফশোর কোম্পানি এবং বহু হাজার কোটি টাকার আর্থিক লেনদেনের প্রশ্ন এক সুতোয় গাঁথা হয়ে যাওয়ায় জাহাজটি এখন আর কেবল একটি স্ক্র্যাপ জাহাজ নয়; এটি পরিণত হয়েছে এক বিস্তৃত অনুসন্ধানের কেন্দ্রে।

প্রায় ৬১ কোটি টাকা মূল্যের ‘মেমেই’ গত ২২ মে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছায়। ১৯৯৭ সালে নির্মিত, ৪৪ হাজার ৮০০ টন ধারণক্ষমতার এই রাসায়নিক ও তেলবাহী ট্যাংকারটি স্ক্র্যাপ হিসেবে ভাঙার জন্য আনা হয়েছিল।

- Advertisement -
islamibank

এর লাইট ডিসপ্লেসমেন্ট টনেজ ৯ হাজার ৮৭৭ দশমিক ১ টন। দৈর্ঘ্য ১৮০ মিটার, প্রস্থ ৩২ দশমিক ২ মিটার।

কিন্তু জাহাজটি বাংলাদেশের জলসীমায় পৌঁছানোর মাত্র ছয় দিন পরই দৃশ্যপট পাল্টে যায়।

গত ২৮ মে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এবং অফিস অব ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল (ওএফএসি) ‘মেমেই’কে নিষেধাজ্ঞার তালিকাভুক্ত করে।

অভিযোগ, জাহাজটি ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ইরান থেকে পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য পরিবহনে জড়িত ছিল।

একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয় এর নিবন্ধিত মালিক হংকংভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এভার শাইনিং লিমিটেডকেও।

মার্কিন প্রশাসনের ভাষ্য আরও উদ্বেগজনক। তাদের দাবি, এভার শাইনিং লিমিটেডের মালিকানাধীন আরেকটি জাহাজ ‘ফ্লোরা’ ২০২৩ সাল থেকে অন্তত ১৪ বার ইরান থেকে পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য পরিবহন করেছে।

অর্থাৎ ‘মেমেই’ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একটি বৃহত্তর নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে মার্কিন নজরে এসেছে।

প্রশ্ন হলো, এই তথ্যগুলো কি একেবারেই অজানা ছিল?
আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী বিভিন্ন উন্মুক্ত ডাটাবেসে জাহাজের মালিকানা, গতিবিধি ও বাণিজ্যিক ইতিহাসের তথ্য দীর্ঘদিন ধরেই সংরক্ষিত থাকে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এভার শাইনিং লিমিটেড এবং তাদের জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ নতুন নয়। সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠছে—এসএন কর্পোরেশন কি যথাযথ যাচাই-বাছাই করেছিল? নাকি সম্ভাব্য ঝুঁকি জেনেও চুক্তি সম্পন্ন করা হয়েছিল?

নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার পর পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, জাহাজটিকে আর শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে নেওয়া যাচ্ছে না।

স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এখন এটি মূল মালিকের কাছে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানা গেছে।

কিন্তু ‘মেমেই’-এর গল্প এখানেই শেষ নয়:
এই ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে চট্টগ্রামভিত্তিক এসএন কর্পোরেশন। প্রতিষ্ঠানটির মালিক ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান শওকত আলী চৌধুরী, যিনি ব্যবসায়ী মহলে ‘ডিসকো শওকত’ নামে পরিচিত।

অতীতে পুরোনো জাহাজ আমদানি ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন নিয়ে তার প্রতিষ্ঠানের নাম আলোচনায় এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে এসএন কর্পোরেশনের পক্ষে খোলা কয়েকটি ঋণপত্রের সুবিধাভোগী ছিল একই ঠিকানায় নিবন্ধিত তিনটি বিদেশি কোম্পানি।

অনুসন্ধানে এসব প্রতিষ্ঠানের বাস্তব অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

পরে এসব লেনদেনকে কেন্দ্র করে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার আর্থিক কার্যক্রম নিয়ে অনুসন্ধান শুরু হয়।

ফলে ‘মেমেই’কে ঘিরে নতুন করে যে প্রশ্নগুলো সামনে এসেছে, সেগুলো কেবল একটি জাহাজ কেনাবেচার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

বরং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের একটি শিপব্রেকিং কোম্পানির বাণিজ্যিক সম্পর্ক কতটা গভীর ছিল, সেটিই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে দাঁড়িয়ে থাকা ‘মেমেই’ তাই শুধু একটি পরিত্যক্ত ট্যাংকার নয়।

এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্ধকার করিডোর, নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর কৌশল, অফশোর মালিকানা এবং আর্থিক স্বচ্ছতার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে।

একটি জাহাজ হয়তো ফেরত পাঠানো যাবে। কিন্তু তার পেছনে তৈরি হওয়া প্রশ্নগুলোর উত্তর এত সহজে সমুদ্রপথে ফিরে যাবে না।

KSRM
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জয়নিউজবিডি.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।

এই বিভাগের আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ