চট্টগ্রামে বাড়ছে ডেঙ্গুর হটস্পট

ডেঙ্গুতে বদলেছে উপসর্গ, জ্বর কম হলেও বাড়ছে জটিলতা-২১ দিনেই আক্রান্ত ৩০৫

অনলাইন ডেস্ক

চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে শুরু করেছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে যেখানে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিলেন ২৯৮ জন, সেখানে জুলাইয়ের প্রথম ২১ দিনেই আক্রান্ত হয়েছেন ৩০৫ জন।

- Advertisement -

অর্থাৎ বছরের শুরু থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে যত মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন, চলতি জুলাইয়ের মাত্র ২১ দিনেই সেই সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে।

- Advertisement -
google news follower

চট্টগ্রাম জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত জেলায় মোট ৬০৩ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৩০৫ জনই আক্রান্ত হয়েছেন জুলাই মাসের প্রথম তিন সপ্তাহে।

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিবছর জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ে। বছরের মোট আক্রান্তের ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ রোগী এই পাঁচ মাসেই হাসপাতালে ভর্তি হন।

- Advertisement -
islamibank

গত বছরও একই প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৪ হাজার ৬৭ জন।

ওই বছর মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৮৪৬ জন। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালেও প্রায় একই চিত্র দেখা গেছে।

তবে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, গত কয়েক বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছর এখনো ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক কম।

কিন্তু জুলাইয়ের শুরু থেকে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় সামনে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চলতি জুলাইয়ের প্রথম তিন সপ্তাহে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৩০৫ জন ডেঙ্গু রোগীর মধ্যে ১৮৪ জনই চট্টগ্রাম নগরের বাইরের বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দা। নগর থেকে ভর্তি হয়েছেন ১২১ জন।

গতকাল সকাল ১০টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ১৬ জন।

তাঁদের মধ্যে নগরের সাতজন, চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলার ছয়জন এবং অন্য জেলার তিনজন।

এ সময় জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন ৯২ জন। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মারা গেছেন দুজন। তাঁদের একজন সীতাকুণ্ডের এবং অন্যজন নগরের পাহাড়তলী এলাকার বাসিন্দা।

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সকাল পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে সীতাকুণ্ডের বাসিন্দা রয়েছেন তিনজন।

এ ছাড়া চন্দনাইশ, রাউজান ও কর্ণফুলী উপজেলার একজন করে বাসিন্দা ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

চলতি বছর আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে সীতাকুণ্ডের বাসিন্দাই সবচেয়ে বেশি, ৫৯ জন। উপজেলাগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আক্রান্ত কর্ণফুলীতে ৩১ জন।

চিকিৎসকেরা বলছেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার পেছনে ভারী বৃষ্টির ভূমিকা রয়েছে। গত জুনে স্বাস্থ্য বিভাগের চালানো

এক জরিপে দেখা যায়, চট্টগ্রামের প্রতি ১০০টি বাড়ির মধ্যে ২৭টিতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে।

চলতি মাসে ভারী বৃষ্টির কারণে নগরের বিভিন্ন এলাকা ও বাসাবাড়ির আশপাশে পানি জমে থাকায় এডিস মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব এখন হাসপাতালেও পড়তে শুরু করেছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ডেঙ্গুর মৌসুম জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত হলেও এ সময় মানুষের সচেতনতা বাড়ানো গেলে আক্রান্তের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

বিশেষ করে বাসাবাড়ি, ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন, ফুলের টব কিংবা যেকোনো পাত্রে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করার ওপর জোর দিচ্ছেন তাঁরা।

চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের প্রায় ৯৫ শতাংশই চিকিৎসা নিচ্ছেন বা নিয়েছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে।

গত সোমবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ড ১৬ নম্বর মেডিসিন ওয়ার্ডে কথা হয় কর্ণফুলী উপজেলার বাসিন্দা শাহ আলমের সঙ্গে (৪০)।

পেশায় কাঠমিস্ত্রি শাহ আলম তিন দিন ধরে জ্বরে ভুগছিলেন। এদিন সকালে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন।

শাহ আলম বলেন, ‘তিন দিন আগে হঠাৎ জ্বর আসে। প্রথমে সাধারণ জ্বর মনে করে স্থানীয় ফার্মেসি থেকে ওষুধ খেয়েছিলাম।

কিন্তু জ্বর কমছিল না। শরীর প্রচণ্ড দুর্বল লাগছিল, মাথাব্যথা আর হাত-পা ব্যথাও ছিল। পরে পরীক্ষা করানোর পর জানতে পারি ডেঙ্গু হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘কীভাবে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলাম, সেটাই বুঝতে পারছি না। আমি তো কাজের জন্য বাইরে থাকি। কোথা থেকে মশা কামড়েছে, তা বলতে পারছি না।’

শাহ আলমের মতো অনেক রোগীই প্রথমে ডেঙ্গুকে সাধারণ জ্বর মনে করে স্থানীয়ভাবে ওষুধ খাচ্ছেন।

পরে শারীরিক দুর্বলতা কিংবা অন্যান্য জটিলতা দেখা দিলে হাসপাতালে এসে পরীক্ষা করানোর পর ডেঙ্গু শনাক্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।

এবার ডেঙ্গুর উপসর্গে আগের বছরের তুলনায় কিছুটা ভিন্নতা লক্ষ করছেন চিকিৎসকেরা।

তাঁদের ভাষ্য, অনেক রোগীরই উচ্চমাত্রার জ্বর হচ্ছে না। শরীরে র‍্যাশও তুলনামূলক কম দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এর বিপরীতে বমি, তীব্র পেটব্যথা, ডায়রিয়া, অতিরিক্ত দুর্বলতা এবং লিভার ও কিডনির জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে আসছেন অনেকে।

কিছু রোগীর ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্টের পাশাপাশি ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের প্রবণতাও তুলনামূলক বেশি দেখা যাচ্ছে। এ অবস্থায় রোগীর রক্তচাপ দ্রুত কমে যেতে পারে, যা জীবনঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ কনসালট্যান্ট (মেডিসিন) এ এস এম লুৎফুল কবির গণমাধ্যমকে বলেন, এবার অনেক রোগীর উচ্চমাত্রার জ্বর হচ্ছে না। শরীরে র‍্যাশও তুলনামূলক কম দেখা যাচ্ছে। কিন্তু বমি, তীব্র পেটব্যথা, ডায়রিয়া, অতিরিক্ত দুর্বলতা এবং লিভার ও কিডনির জটিলতা নিয়ে রোগীরা হাসপাতালে আসছেন।

তাই জ্বরকে সাধারণ ভাইরাল জ্বর ভেবে অবহেলা করা ঠিক হবে না। জ্বর হলে দ্রুত ডেঙ্গু পরীক্ষা করানো এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সূত্র-প্রথম আলো

চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গুর চিকিৎসায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শরীরের তরল বা ফ্লুইডের সঠিক ব্যবস্থাপনা। জ্বর কমে যাওয়ার পরই সাধারণত ডেঙ্গু রোগীর প্লাটিলেট কমতে শুরু করে।

এ সময় কিছু শারীরিক জটিলতাও দেখা দিতে পারে। রোগীর অবস্থা বিবেচনায় তখন হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

প্লাটিলেটের সংখ্যা ১০ হাজারের নিচে নেমে গেলে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তখন রোগীকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে সংকটাপন্ন অবস্থার চিকিৎসা দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

সম্প্রতি এক জরিপে চট্টগ্রাম নগরের আটটি ওয়ার্ডকে এডিস মশার ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ এলাকা বা রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ওয়ার্ডগুলো হলো-উত্তর কাট্টলী, পাঁচলাইশ, জালালাবাদ, পশ্চিম বাকলিয়া, দক্ষিণ বাকলিয়া, দক্ষিণ হালিশহর, পাথরঘাটা ও আন্দরকিল্লা।

এসব এলাকায় এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ম্যালেরিয়া ও মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. সরফুল ইসলাম বলেন, আমাদের নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি হটস্পটগুলোতে মশার ওষুধ ছিটানোর জন্য ৬০ জনের একটি প্রশিক্ষিত টিম তৈরি করা হয়েছে।

এলাকাভিত্তিক সচেতনতামূলক কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রতিদিন সকাল-বিকেল লার্ভিসাইড ওষুধ ছিটানো হচ্ছে, ফগিংও চলছে।

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ডেঙ্গু রোগীর চাপ সামাল দিতে সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মানুষের সচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বাসাবাড়ি ও আশপাশে কোথাও যাতে পানি জমে না থাকে, সে বিষয়ে সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে।

তিনি বলেন, সময়মতো চিকিৎসা নিলে এবং সচেতন থাকলে এ বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে জুলাইয়ের ২১ দিনেই আক্রান্তের সংখ্যা আগের ছয় মাসকে ছাড়িয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর মৌসুম যে ইতিমধ্যে জোরালোভাবে শুরু হয়ে গেছে, তা স্পষ্ট।

সামনে আগস্ট থেকে নভেম্বর-ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সম্ভাব্য আরও চার মাস। ফলে এখনই যদি জমে থাকা পানি অপসারণ, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং রোগের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে পরিস্থিতি আরও বড় আকার নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সচেতনতা, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং সময়মতো চিকিৎসাই এখন ডেঙ্গু মোকাবিলায় সবচেয়ে বড় ভরসা।

KSRM
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জয়নিউজবিডি.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।

এই বিভাগের আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ