সকাল ৯টায় চিকিৎসকেরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন রোগীকে আইসিইউতে নিতে হবে। পরিবারের দাবি, তখনই তারা সম্মতি দেন।
অর্থের সংকট যেন চিকিৎসার পথে বাধা না হয়, সে জন্য আগেই হাসপাতালের হিসাবে জমা রাখা হয়েছিল অগ্রিম টাকা।
কিন্তু অভিযোগ, সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে হতে পেরিয়ে যায় প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা। বিকেল ২টা ৩৫ মিনিটে আইসিইউ নয়, হাসপাতালের কেবিনেই থেমে যায় ৩৫ বছর বয়সী সুবিমল দাশ সুবীরের জীবন।
এই মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের স্বজন হারানোর বেদনা নয়, এটি দেশের বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থার জবাবদিহি, রোগীর অধিকার এবং করপোরেট স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়ে নতুন করে কঠিন প্রশ্ন তুলেছে।
চট্টগ্রামের অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়কের এভারকেয়ার হাসপাতালের বিরুদ্ধে একের পর এক অব্যবস্থাপনা ও চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তুলেছেন মৃত সুবিমলের পরিবার।
অভিযোগগুলো সামনে এনেছেন তার বড় ভাই চিকিৎসক ডা. আবীর দাশ, যিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চিকিৎসার শুরু থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রতিটি ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন।
সুবিমল দাশ সুবীর ছিলেন থ্যালামিক গ্লাইওমা-মস্তিষ্কের গভীরে হওয়া জটিল ব্রেইন টিউমারে আক্রান্ত। চার বছর আগে সংসার শুরু করেছিলেন। রেখে গেলেন দেড় বছরের এক সন্তান। তার স্ত্রী বর্তমানে ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা।
পরিবারের ভাষ্য, জীবন বাঁচানোর শেষ আশাতেই ২০ জুলাই তাকে রেডিয়েশন চিকিৎসার জন্য এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। কিন্তু সেই চিকিৎসাই শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে অভিযোগ আর প্রশ্নের দীর্ঘ তালিকা।
পরিবারের দাবি, বিকেল ৩টার দিকে কেবিনে নেওয়ার পরই চিকিৎসক ও নার্সদের জানানো হয়েছিল, রোগী দুপুর ১২টার পর থেকে কিছুই খাননি। দ্রুত ফিডিংয়ের অনুরোধ জানানো হলেও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অজুহাতে দীর্ঘ সময় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
ডা. আবীর দাশের অভিযোগ, প্রায় ছয় ঘণ্টা পর সন্ধ্যা ৬টায় প্রথমবার রোগীকে মাত্র ২০০ মিলিলিটার ডাবের পানি দেওয়া হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, রোগী প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টা ও রাত ৯টায় নিয়মিত খিঁচুনি প্রতিরোধক ওষুধ গ্রহণ করতেন। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের ওষুধ দেওয়া হয়নি।
পরিবারের দাবি, নিজেদের কাছে ওষুধ থাকা সত্ত্বেও হাসপাতাল বাইরের ওষুধ দিতে রাজি হয়নি। পরে রাত ৯টার দিকে একসঙ্গে দুটি ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। এরপর থেকেই রোগী অস্বাভাবিকভাবে ঝিমিয়ে পড়েন বলে অভিযোগ।
ডা. আবীর দাশ দাবি করেন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের আটজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রোগীকে ‘নন-অপারেবল’ বলে মত দিয়েছিলেন। কিন্তু এভারকেয়ার হাসপাতালের নিউরোসার্জন ব্রেইন টিউমার অপসারণের সিদ্ধান্ত নেন।
এছাড়া, রোগীর শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় এমআরআই উইথ কনট্রাস্ট কতটা নিরাপদ-সে প্রশ্নও তিনি চিকিৎসকদের সামনে তুলেছিলেন। তবু পরীক্ষা করা হয়। পরিবারের দাবি, ওই পরীক্ষার পর থেকেই রোগীর উচ্চমাত্রার জ্বর শুরু হয়।
পরিবারের অভিযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ আইসিইউতে স্থানান্তর নিয়ে। ডা. আবীর দাশের ভাষ্য অনুযায়ী, ২২ জুলাই সকাল ৯টায় রেডিয়েশন বিভাগের চিকিৎসক ও আইসিইউর চিকিৎসক রোগীকে দ্রুত আইসিইউতে নেওয়ার সিদ্ধান্ত দেন। পরিবার সঙ্গে সঙ্গে সম্মতি দেয়। কিন্তু অভিযোগ, দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলেও রোগীকে কেবিনেই রাখা হয়।
দুপুর ২টায় ফিডিং দেওয়ার মাত্র ২০ মিনিট পর রোগীর অক্সিজেন স্যাচুরেশন দ্রুত কমতে শুরু করে। পরিবারের দাবি, রোগীর মা প্রায় ৩০ মিনিট চিকিৎসকদের ডাকলেও কেউ কেবিনে আসেননি। চিকিৎসকেরা পৌঁছানোর আগেই বিকেল ২টা ৩৫ মিনিটে সুবিমলের মৃত্যু হয়।
আমরা যদি নিরাপদ না হই…
ডা. আবীর দাশ তার পোষ্টে লিখেছেন, “আমরা দুই ভাইই চিকিৎসক। আমরা যদি এমন অব্যবস্থাপনা ও চিকিৎসায় অবহেলার শিকার হই, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় নিরাপদ চিকিৎসা পাবে?”
তার অভিযোগ, শুধু চিকিৎসা নয়, রোগীকে নিয়মিত পাশ পরিবর্তন, পরিচ্ছন্নতা রক্ষা এবং মৌলিক নার্সিং সেবাতেও ঘাটতি ছিল।
সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ
ডা. আবীর দাশের পোস্ট প্রকাশের পর বহু চিকিৎসক নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
চিকিৎসক মঈনুল আনাম অভিযোগ করেন, তার বাবার ক্যান্সারের চিকিৎসাকালেও হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা ছিল অত্যন্ত দুর্বল।
চিকিৎসক শম্পা দত্ত বিশ্বাস দাবি করেন, তার মায়ের চিকিৎসায় একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত ও অব্যবস্থাপনার কারণে শেষ পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে।
এ ছাড়া বুশরা সিকদার, পুনম চৌধুরীসহ আরও কয়েকজন সামাজিক মাধ্যমে হাসপাতালটির চিকিৎসা নিয়ে নিজেদের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পরে তাদের বক্তব্য জানাবে বললেন এভারকেয়ার হাসপাতাল, চট্টগ্রামের ব্র্যান্ড অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের সহকারী ব্যবস্থাপক আল মামুন।
কয়েকটি প্রশ্ন এখন জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ
সকাল ৯টায় আইসিইউতে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হলে বাস্তবে কেন তা কার্যকর হয়নি?
সময়মতো ফিডিং ও প্রয়োজনীয় ওষুধ না দেওয়ার অভিযোগের ব্যাখ্যা কী?
রোগীর শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় এমআরআই উইথ কনট্রাস্টের সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়েছিল?
অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমার পর চিকিৎসক পৌঁছাতে বিলম্ব হয়েছিল কি না?
হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ অডিট বা চিকিৎসা-পর্যালোচনায় কী উঠে এসেছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু সুবিমল দাশের পরিবারের জন্য নয়; বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা, রোগীর নিরাপত্তা এবং জনআস্থার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিবেদনটি রোগীর পরিবারের অভিযোগ, ডা. আবীর দাশের প্রকাশ্য বক্তব্য এবং সামাজিক মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে প্রস্তুত। অভিযোগগুলোর বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিলে তা প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।




