চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার পুটিবিলা ও চুনতি ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী ডলুখালের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বেইলি সেতুটি স্থানীয় মানুষের কাছে ক্রমেই আতঙ্কের নাম হয়ে উঠছে।
সেতুর নিচ থেকে বছরের পর বছর ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, তার ওপর প্রতিদিন শত শত বালু, মাটি ও গাছবোঝাই ভারী যানবাহনের চলাচল-সব মিলিয়ে প্রায় ৩০ বছরের পুরোনো সেতুটির কাঠামো ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সেতুর মাঝের পিলারের গোড়ার মাটি সরে গেছে। প্রায় ৩০ ফুট পাইলিংয়ের অন্তত ২০ ফুট এখন মাটির ওপরে উন্মুক্ত।
বিভিন্ন অংশের লোহার পাটাতনও ঢিলে হয়ে পড়েছে। একটি অটোরিকশা সেতুর ওপর উঠলেই পুরো সেতু কেঁপে ওঠে। ভারী ট্রাক চলাচলের সময় সেই কম্পন আরও তীব্র হয়।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৯৬ সালে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অধীনে নির্মিত এই বেইলি সেতুটি লোহাগাড়ার সঙ্গে পার্বত্য বান্দরবানের লামা ও আলীকদম উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম। প্রতিদিন হাজারো মানুষ এ সেতু দিয়ে যাতায়াত করেন।
শুধু মানুষের চলাচল নয়, লামা-আলীকদম ও লোহাগাড়ার বিস্তীর্ণ এলাকার ধান, সবজি, ফলমূলসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য বাজারজাতের ক্ষেত্রেও সেতুটির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
সেতুটি যদি ধসে পড়ে, তাহলে উৎপাদিত কৃষিপণ্য সময়মতো বাজারে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। বাড়বে পরিবহন ব্যয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিতে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সেতুটি ধসে গেলে দুই লাখের বেশি মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়বেন। লোহাগাড়ার সঙ্গে লামা ও আলীকদমের সরাসরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। তখন বিকল্প পথে প্রায় ২০ কিলোমিটার ঘুরে চলাচল করতে হবে।
সেতুটির ঝুঁকির বড় কারণ হিসেবে স্থানীয়রা দীর্ঘদিনের অবৈধ বালু উত্তোলনকে দায়ী করছেন।
তাঁদের অভিযোগ, সেতুর নিচ থেকে ড্রেজার ও শ্যালো মেশিন দিয়ে নিয়মিত বালু তোলা হচ্ছে। এতে পিলারের ভিত্তির চারপাশের মাটি সরে গিয়ে কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে।
সরেজমিনে সেতুর বিভিন্ন অংশে লোহার পাটাতন ঢিলে হয়ে থাকার চিত্রও দেখা গেছে। ভারী যান চলাচলের সময় সেতুটি কেঁপে ওঠে। পিলারের গোড়ার মাটি সরে গিয়ে পাইলিংয়ের বড় অংশ উন্মুক্ত হয়ে পড়ায় ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অবৈধ বালু উত্তোলনের প্রভাব শুধু ডলুখালের বেইলি সেতুতেই সীমাবদ্ধ নয়।
পুটিবিলা বাজার, হাসিনাভিটা সেতু, মসজিদ, আশপাশের বসতভিটা ও বিস্তীর্ণ কৃষিজমিও ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে। এতে উদ্বেগে রয়েছেন স্থানীয় কৃষকেরাও।
পুটিবিলার বাসিন্দা ও এমচরহাট বাজারের ব্যবসায়ী নুর হোসেন বলেন, রিকশা বা সিএনজি উঠলেই পুরো সেতু কাঁপতে থাকে। নিচে যেভাবে বালু তোলা হয়েছে, তাতে যেকোনো সময় সেতু ভেঙে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
চুনতি পানত্রিশা গ্রামের বাসিন্দা রেজাউল বাহার রাজা বলেন, ভারী যান ও বালুবাহী বড় গাড়ি চলাচলের কারণে বেইলি সেতুটির মাঝের অংশ দেবে গেছে।
তাঁর ভাষ্য, সেতুটির বয়স ৩০ বছরের বেশি। তাই সেতুর আশপাশে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের পাশাপাশি দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
স্থানীয় ইউপি সদস্য জানে আলম (জানু) বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে সেতুটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বড় দুর্ঘটনার আগেই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
অতচ ২০১০ সালের বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন অনুযায়ী সেতু, কালভার্ট, বাঁধ, সড়ক, মহাসড়ক, বনসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার আশপাশ থেকে বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ। কোনো সেতুর এক কিলোমিটারের মধ্যে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনেরও সুযোগ নেই।
কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব বিধিনিষেধ উপেক্ষা করেই বছরের পর বছর ডলুখালের সেতুর গোড়া থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।
পুটিবিলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ইকবাল হোসেন বলেন, পুটিবিলা, ফারাঙ্গা ও পানত্রিশা এলাকায় শতাধিক শ্যালো মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
ঝুঁকির বিষয়টি স্বীকার করে লোহাগাড়া উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফাহাদ বিন মাহমুদ বলেন, নতুন সেতু নির্মাণের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। আপাতত ঝুঁকি কমাতে প্রয়োজনীয় সংস্কার কাজ চলছে।
লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বায়োজীদ-বিন-আখন্দ বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
ইজারা ছাড়া ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই। ইজারা ছাড়া বালু উত্তোলনে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, নতুন সেতুর প্রস্তাব বাস্তবায়িত হওয়ার আগ পর্যন্ত পুরোনো এই সেতুর নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করা যাবে?
কারণ একদিকে সেতুর পিলারের গোড়া থেকে মাটি সরে যাচ্ছে, অন্যদিকে তার ওপর দিয়েই চলছে ভারী যানবাহন।
নিচে অবাধে বালু উত্তোলন আর ওপরে ঝুঁকি নিয়ে মানুষের চলাচল-দুইয়ের চাপেই যেন প্রতিদিন একটু একটু করে দুর্বল হচ্ছে ডলুখালের বেইলি সেতু।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, বড় কোনো দুর্ঘটনার পর ব্যবস্থা নেওয়ার অপেক্ষায় না থেকে এখনই সেতুটির কাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
নইলে একটি সেতুর ধস শুধু কয়েকটি লোহার পাটাতন ভেঙে থমকে যেতে পারে লোহাগাড়া, লামা ও আলীকদমের মানুষের দৈনন্দিন জীবন, কৃষিপণ্য পরিবহন ও দীর্ঘদিনের যোগাযোগব্যবস্থা।




