লাইটারেজ সংকটে আমদানিকারকদের মাথায় হাত, বহির্নোঙরে বাড়ছে মাদার ভেসেলের জট

অনলাইন ডেস্ক

দেড়শ থেকে দুইশ জাহাজের দৈনিক চাহিদার বিপরীতে বরাদ্দ মাত্র ২০ থেকে ৪০টি, ৮-১০ দিনের খালাসে লাগছে ২০-২৫ দিন-বাড়ছে ডেমারেজ ও আমদানিকারকদের আর্থিক ক্ষতি

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে যেন তৈরি হয়েছে অদৃশ্য এক জট। খাদ্যশস্যসহ বিভিন্ন পণ্য নিয়ে একের পর এক মাদার ভেসেল অপেক্ষায় থাকলেও পর্যাপ্ত লাইটারেজ জাহাজ না পাওয়ায় সময়মতো খালাস করা যাচ্ছে না পণ্য।

- Advertisement -

বৈরী আবহাওয়া, বিভিন্ন ঘাটে জাহাজ আটকে থাকা এবং লাইটারেজ ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলার কারণে সংকট আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

- Advertisement -
google news follower

বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পণ্য খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে প্রায় ৫৫টি মাদার ভেসেল। এর মধ্যে লাইটারেজ জাহাজ না পেয়ে অলস বসে আছে ১৬টি।

বাকিগুলোও প্রয়োজনের তুলনায় কম সংখ্যক লাইটারেজ পাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, একটি মাদার ভেসেল একদিন অলস বসে থাকলেই গড়ে ২০ থেকে ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ক্ষতি হচ্ছে।

- Advertisement -
islamibank

এ পরিস্থিতিতে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন আমদানিকারক ও শিপিং এজেন্টরা। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, লাইটারেজ জাহাজ বরাদ্দে বিডব্লিউটিসিসির অব্যবস্থাপনা এবং গুটিকয়েক জাহাজ মালিকের সিন্ডিকেট সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে।

অন্যদিকে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটররা সংকট নিরসনে সিরিয়াল প্রথা বাতিল করে লাইটারেজ জাহাজ বরাদ্দ উন্মুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন।

চট্টগ্রাম বন্দরের নাব্যতা সংকটের কারণে কাঁচামালবাহী বড় জাহাজগুলো সরাসরি বন্দরের জেটিতে ভিড়তে পারে না।

ফলে এসব মাদার ভেসেলের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পণ্য বহির্নোঙরে ছোট লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে খালাস করতে হয়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ৫০ হাজার টনের একটি মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাস করতে প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে চারটি লাইটারেজ জাহাজ প্রয়োজন হয়।

বিভিন্ন বড় শিল্পগ্রুপ নিজেদের লাইটারেজ জাহাজ ব্যবহার করে পণ্য খালাস করলেও সাধারণ আমদানিকারকরা নির্ভর করেন ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের ওপর। আর সেখানেই এখন তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বড় সংকট।

প্রতিদিন যেখানে দেড়শ থেকে দুইশ লাইটারেজ জাহাজ প্রয়োজন, সেখানে গত এক সপ্তাহে গড়ে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মাত্র ৪০টি। আর রোববার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মাত্র ২০টি জাহাজ।

ফলে বহির্নোঙরে থাকা মাদার ভেসেলগুলোর পণ্য খালাস কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

৮ দিনের কাজ গড়াচ্ছে ২৫ দিনে

লাইটারেজ সংকটের কারণে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার ভয়াবহতা তুলে ধরেছেন শিপ হ্যান্ডলিং অ্যান্ড বার্থ অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মো. সারোয়ার হোসেন।

তিনি বলেন, একটা মাদার ভেসেল, ৫০ থেকে ৬০ হাজার টনের মাদার ভেসেল ৮ থেকে ১০ দিনে খালাস করতাম, সেগুলো এখন ২০ থেকে ২৫ দিন পর্যন্ত লাগছে খালাস করতে।

তার মানে প্রতিটা জাহাজে প্রায় ১৫ দিনের মতন আমাদেরকে ফরেন কারেন্সির ডেমারেজ দিতে হচ্ছে। কোনো জাহাজ ২৫ হাজার ডলার, কোনো জাহাজ ৩০ হাজার ডলার, যেই যেভাবে চুক্তি আছে। সূত্র-এখন

অর্থাৎ, লাইটারেজ জাহাজ সংকটের কারণে একটি মাদার ভেসেলের পণ্য খালাসে অতিরিক্ত প্রায় ১৫ দিন সময় লাগছে।

আর এই অতিরিক্ত সময়ের জন্য বিদেশি মুদ্রায় ডেমারেজ গুনতে হচ্ছে আমদানিকারক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে।

ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে আমদানি ব্যয় বাড়বে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত দেশের বাজারেও পড়তে পারে।

সংকটের বিষয়টি স্বীকার করেছে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল। তাদের দাবি, বৈরী আবহাওয়া, বিভিন্ন ঘাটে জাহাজ আটকে থাকা এবং প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০টি লাইটারেজ জাহাজ সিরিয়ালের বাইরে চলাচল করায় পরিস্থিতিতে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে।

ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের পারভেজ আহমেদ বলেন, দুই-তিনদিনের মধ্যে আমরা একটা টিম সমুদ্রে নামাব।

যারা এই ধরণের অবৈধ যে জাহাজগুলো চলাফেরা করে ছাড়পত্র ছাড়া, ওইগুলোকে আমরা নিষেধ করব। নিষেধ না শুনলে আমরা ডিজি শিপিংয়ের মাধ্যমে তাদের ওপর অ্যাকশন নেব।

কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়মের বাইরে চলাচলকারী জাহাজগুলো নিয়ন্ত্রণে আনা গেলে লাইটারেজ ব্যবস্থাপনায় কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরতে পারে।

সংকটের পেছনে লাইটারেজ জাহাজের সংখ্যা কমে যাওয়াকেও বড় কারণ হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ীরা।

তাদের দাবি, একসময় দেশে দেড় থেকে দুই হাজার লাইটারেজ জাহাজ পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত থাকলেও বর্তমানে সেই সংখ্যা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। ফলে আমদানি পণ্য খালাসে সক্ষমতার ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের দাবি অনুযায়ী, গত বছরের ৫ আগস্টের পর মামলা-হয়রানির আশঙ্কায় সাবেক মন্ত্রী-এমপি ও ব্যবসায়ীদের অনেকেই তাদের জাহাজ কেটে শিপইয়ার্ডে বিক্রি করে দিয়েছেন। এতে লাইটারেজ জাহাজের সংখ্যা কমে গিয়ে বর্তমান সংকট আরও তীব্র হয়েছে।

চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সহ-সভাপতি মশিউল আলম স্বপন মনে করেন, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব।

তিনি বলেন, ‘ডিজি স্যার যে উদ্যোগটা নিয়েছেন অ্যাপের মাধ্যমে, এই জিনিসটা যদি সবাই সহযোগিতা করে তাহলে এই প্রবলেম অনেকটা সলভ হয়ে যাবে।

পাশাপাশি যারা এই ডব্লিউটিসিগুলি নেতৃত্ব করছেন, উনারা যদি জিনিসগুলি সুন্দরভাবে করার চেষ্টা করেন সততার সঙ্গে, সব মালিকরা যাতে স্যাটিসফায়েড থাকেন, তাহলে আমার মনে হয় এই প্রবলেমগুলি খুব বেশি থাকার কথা না।

সংশ্লিষ্টদের মতে, লাইটারেজ জাহাজ বরাদ্দে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা চালু করা এবং সিরিয়াল ব্যবস্থার অনিয়ম দূর করা গেলে বহির্নোঙরের পণ্য খালাস কার্যক্রমে গতি ফিরতে পারে।

৫৬টি লাইটার জাহাজের লাইসেন্স স্থগিত

পণ্য পরিবহনে অনিয়মের অভিযোগে ইতিমধ্যে ৫৬টি লাইটার জাহাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে নৌ-পরিবহন অধিদপ্তর।

নৌ বাণিজ্য দপ্তরের প্রিন্সিপাল অফিসার শেখ জালাল উদ্দিন গাজী বলেন, পণ্য পরিবহনে অনিয়মের অভিযোগে ইতিমধ্যে ৫৬টি লাইটার জাহাজে ‘বে-ক্রসিং’ লাইসেন্স স্থগিত করেছে নৌ-পরিবহন অধিদপ্তর। নৌপথে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠুভাবে চালু রাখতে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

প্রতিদিন বাড়ছে ক্ষতির হিসাব

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে বর্তমানে যে সংকট চলছে, তার সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে আমদানিকারকদের ওপর।

একদিকে মাদার ভেসেল অলস বসে থাকায় প্রতিদিন বাড়ছে ডেমারেজ, অন্যদিকে সময়মতো কাঁচামাল ও খাদ্যশস্য খালাস করতে না পারায় ব্যাহত হচ্ছে শিল্প ও সরবরাহ ব্যবস্থাও।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, একটি মাদার ভেসেল একদিন অলস বসে থাকলেই গড়ে ২০ থেকে ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ক্ষতি হচ্ছে। আর খালাসে অতিরিক্ত ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগলে সেই ক্ষতির পরিমাণ কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে।

এখন ব্যবসায়ীদের মূল দাবি, লাইটারেজ জাহাজ বরাদ্দ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে হবে।

সিন্ডিকেট ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ তদন্ত করতে হবে। একই সঙ্গে সিরিয়াল প্রথার পরিবর্তে উন্মুক্ত ও প্রযুক্তিনির্ভর জাহাজ বরাদ্দ ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

কারণ বহির্নোঙরে একটি মাদার ভেসেলের অপেক্ষা শুধু একটি জাহাজের অপেক্ষা নয়-এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কোটি টাকার আমদানি পণ্য, শিল্পকারখানার কাঁচামাল, বৈদেশিক মুদ্রা এবং দেশের পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার গতি।

লাইটারেজ সংকট দ্রুত নিরসন না হলে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে অপেক্ষমাণ জাহাজের সংখ্যা যেমন বাড়বে, তেমনি প্রতিদিন বাড়তে থাকবে ডলারে ক্ষতির হিসাবও।

KSRM
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জয়নিউজবিডি.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।

এই বিভাগের আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ