আন্তর্জাতিক মুদ্রা তাহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে আগামী ডিসেম্বর থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদে ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ নিতে চায় বাংলাদেশ। গতকাল বৃহস্পতিবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর নাইজেল ক্লার্কের সঙ্গে ‘ফলপ্রসূ আলোচনা’ শেষে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ঋণচুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের শীর্ষ কর্মকর্তারা। চলতি মাসের শেষে আইএমএফের একটি মিশন ঢাকায় আসবে।
সভায় উপস্থিত বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের এক কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার পরিকল্পনা আইএমএফের কাছে তুলে ধরা হবে। সেখানে আমানতকারীদের আস্থা ফেরানোর উপায় এবং খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার বিষয়ে অগ্রাধিকার থাকবে। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের আমানত ফেরত দেওয়া হচ্ছে। বৃহস্পতিবার থেকে ন্যাশনাল ব্যাংকের গ্রাহকদের আমানত ফেরত দেওয়া শুরু হয়েছে।
২০২৩ সালে আওয়ামী লীগ আমলে স্বাক্ষর করা ঋণচুক্তিতে ২০২৬ সালের মধ্যে খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি ছিল, যা এখন বেড়ে প্রায় ৩৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। নতুন ঋণচুক্তিতে খেলাপি ঋণের হার কতটুকু কমানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হবে, তা এখনও নির্ধারিত হয়নি বলে জানান ওই কর্মকর্তা।
বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, আইএমএফের সঙ্গে নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ সহায়তা নিতে হলে কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে। ঋণের জন্য শর্ত থাকবে; তা পূরণও করতে হবে। কিছু বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা করা হবে। যদিও সম্প্রতি ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, কঠিন শর্ত মেনে আইএমএফের ঋণ নেওয়া হবে না।
গতকাল অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, আইএমএফের নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে। তবে এ কর্মসূচির আওতায় কী ধরনের শর্ত থাকবে এবং সেগুলো কীভাবে পূরণ করা হবে, তা নিয়ে আরও আলোচনা হবে। কিছু বিষয়ে দুই পক্ষের সমঝোতার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছানো হবে।
তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাত, কর-জিডিপি অনুপাত, ব্যাংকের পুনঃমূলধনীকরণ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আইএমএফের পর্যবেক্ষণ রয়েছে। এসব বিষয়ে বাংলাদেশেরও সম্মতি রয়েছে। ইতোমধ্যে অনেক সমস্যার সমাধান হয়েছে। বাকি বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা চলবে।
সংস্কারের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে আইএমএফের প্রশ্ন রয়েছে কিনা– এমন প্রশ্নে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদেরও কিছু পর্যবেক্ষণ আছে। ব্যাংক, ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত নিয়ে তাদেরও পর্যবেক্ষণ নিয়ে আমরা একমত। ইতোমধ্যে অনেকটি পূরণও হয়ে গেছে।’
বাজেট-পরবর্তী অগ্রগতি, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধসহ বৈশ্বিক নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাংলাদেশের অগ্রগতি নিয়ে সংস্থাটি সন্তোষ প্রকাশ করেছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, শুধু আইএমএফ নয়; বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীর সঙ্গেও অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করবে বাংলাদেশ। দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে এসব সংস্থার সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত থাকবে।
রাজস্ব ও আর্থিক খাত সংস্কারে জোর আইএমএফের
নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি ও আর্থিক খাতের সংস্কারকে গুরুত্ব দিচ্ছে আইএমএফ। সংস্থাটির মতে, দেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত কমে প্রায় ৭ শতাংশে নেমে এসেছে, যা বিশ্বের সর্বনিম্ন অনুপাতগুলোর একটি। একই সঙ্গে আর্থিক খাতের বিদ্যমান বড় সমস্যাগুলো সমাধানে কৌশলগত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
গতকাল এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন আইএমএফের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের উপপরিচালক সোনালি জৈন চন্দ্র।
সাড়ে তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলা মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলায় শুধু কঠোর মুদ্রানীতি যথেষ্ট কিনা– এমন প্রশ্নের জবাবে সোনালি জৈন চন্দ্র বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি কঠোর রাখা গুরুত্বপূর্ণ। এর পাশাপাশি অন্যান্য সংস্কারও জরুরি। বাংলাদেশ বর্তমানে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাত ও মূল্যস্ফীতি– এই তিন ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সংস্কার যথাসময়ে বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন তিনি। আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
সোনালি জৈন চন্দ্র বলেন, আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বজায় রাখা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার যথাসময়ে বাস্তবায়ন জরুরি।
বাংলাদেশের দুর্বল রাজস্ব আহরণ পরিস্থিতিও আইএমএফের উদ্বেগের অন্যতম কারণ। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, দেশে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ধারাবাহিকভাবে কমেছে। বর্তমানে এ অনুপাত প্রায় ৭ শতাংশ, যা বিশ্বের সর্বনিম্ন অনুপাতগুলোর একটি।
আইএমএফের মতে, উন্নয়ন ব্যয় নির্বাহের পাশাপাশি আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করতে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য রাজস্ব ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং আহরণ বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
রাজস্ব বাড়াতে সমন্বিত উদ্যোগের ওপরেও জোর দিয়েছে সংস্থাটি। অর্থনীতির বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমের অর্থায়ন নিশ্চিত করতে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন বলে মনে করছে আইএমএফ।
সোনালি জৈন চন্দ্র জানান, আগের কর্মসূচির আওতায় আর ঋণের কিস্তি না নেওয়ার সিদ্ধান্তের পর গত মে মাসে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ আইএমএফের সহায়তায় নতুন একটি কর্মসূচির অনুরোধ জানায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত জুলাইয়ে আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকা সফর করে। ওই সফরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কারের বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। আইএমএফের আলোচনায় উঠে আসা সংস্কারের বিষয়গুলো চলতি বছরের আর্টিকেল ফোর পরামর্শে দেওয়া সুপারিশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
জুলাইয়ের ওই সফরের পর থেকে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আইএমএফের নিয়মিত যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে উল্লেখ করে সোনালি জৈন চন্দ্র বলেন, প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম শুরু করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সহায়তা দিতে আইএমএফ আগ্রহী।
জেএন/এমআর




