স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে রোগী ও পরিবারের প্রথম উদ্বেগ থাকে—কীভাবে দ্রুত রোগীকে সুস্থ করা যাবে? কিন্তু চিকিৎসার সঠিক পথ নির্ধারণের আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানা প্রয়োজন: সব স্ট্রোকের কারণ এক নয়, তাই সব স্ট্রোকের চিকিৎসাও এক নয়। কোনো ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের রক্তনালিতে রক্ত জমাট বেঁধে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়, আবার কোনো ক্ষেত্রে রক্তনালি ফেটে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়। রোগের ধরন, ক্ষতির মাত্রা এবং রোগীর শারীরিক অবস্থা বুঝেই চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
এ ক্ষেত্রে নিউরোলজি, নিউরোসার্জারি এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের সমন্বিত মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
স্ট্রোকের দুই ধরন, চিকিৎসার ভিন্ন পথ
ইস্কেমিক স্ট্রোক হয় যখন মস্তিষ্কের কোনো রক্তনালি বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশে রক্ত ও অক্সিজেনের সরবরাহ কমে যায়। নির্বাচিত রোগীর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে রক্ত জমাট গলানোর ওষুধ অথবা বিশেষ পদ্ধতিতে রক্তনালি থেকে জমাট অপসারণের চিকিৎসা দেওয়া যেতে পারে। তবে কোন রোগী এ ধরনের চিকিৎসার উপযুক্ত, তা নির্ধারণে লক্ষণ শুরুর সময়, মস্তিষ্কের স্ক্যান, রক্তনালির অবস্থা এবং অন্যান্য চিকিৎসাগত বিষয় বিবেচনা করা হয়।
অন্যদিকে, হেমোরেজিক স্ট্রোক হয় মস্তিষ্কের ভেতরে বা আশপাশে রক্তক্ষরণের কারণে। এ ক্ষেত্রে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং রক্তক্ষরণের কারণ ও পরিমাণ অনুযায়ী চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার বা অন্য কোনো স্নায়ুশল্যচিকিৎসার প্রয়োজন হয়, আবার অনেক রোগীর ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার ছাড়াই চিকিৎসা করা সম্ভব।
তাই স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে নিজে থেকে অ্যাসপিরিন বা রক্ত পাতলা করার ওষুধ দেওয়া উচিত নয়। রক্তক্ষরণ হচ্ছে কি না, তা না জেনে এ ধরনের ওষুধ দেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে।
কখন নিউরোসার্জারির প্রয়োজন হতে পারে?
সব স্ট্রোকের রোগীর অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হয় না। তবে কিছু পরিস্থিতিতে নিউরোসার্জারি জীবন রক্ষা এবং মস্তিষ্কের ওপর চাপ কমানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
মস্তিষ্কে বড় ধরনের রক্তক্ষরণ হলে জমে থাকা রক্ত অপসারণের প্রয়োজন হতে পারে। আবার স্ট্রোকের কারণে মস্তিষ্কে অতিরিক্ত ফোলা তৈরি হয়ে আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ অংশে চাপ সৃষ্টি করলে নির্বাচিত রোগীর ক্ষেত্রে চাপ কমানোর অস্ত্রোপচার বিবেচনা করা হয়। কিছু নির্দিষ্ট ধরনের রক্তক্ষরণ, যেমন মস্তিষ্কের আবরণীর আশপাশে রক্তক্ষরণের ক্ষেত্রে, রক্তনালির অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করে তার চিকিৎসাও প্রয়োজন হতে পারে।
কোন পদ্ধতি উপযুক্ত হবে, তা নির্ভর করে রক্তক্ষরণের স্থান ও পরিমাণ, রোগীর সচেতনতার মাত্রা, মস্তিষ্কের ওপর চাপ, অন্যান্য শারীরিক সমস্যা এবং চিকিৎসার সম্ভাব্য ঝুঁকি ও সুবিধার ওপর। প্রতিটি সিদ্ধান্তই রোগীর অবস্থা অনুযায়ী নিতে হয়।
দ্রুত রোগ নির্ণয় কেন গুরুত্বপূর্ণ?
স্ট্রোকের চিকিৎসায় সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার পর মস্তিষ্কের সিটি স্ক্যান বা প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য পরীক্ষা করে স্ট্রোকের ধরন নির্ধারণ করা হয়। এরপর নিউরোলজি, নিউরোসার্জারি ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিভাগের চিকিৎসকেরা রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করতে পারেন।
মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া, শরীরের এক পাশ দুর্বল হয়ে পড়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া, হঠাৎ দৃষ্টিশক্তির সমস্যা, ভারসাম্য হারানো কিংবা আকস্মিক তীব্র মাথাব্যথা—এসব লক্ষণ অবহেলা করা উচিত নয়। লক্ষণ কখন শুরু হয়েছে, তা মনে রাখা এবং দ্রুত জরুরি চিকিৎসাসেবা নেওয়া প্রয়োজন। লক্ষণ সাময়িকভাবে সেরে গেলেও চিকিৎসা মূল্যায়ন জরুরি।
অস্ত্রোপচারের পরও চিকিৎসা চলতে থাকে
স্ট্রোকের পর রোগীর সুস্থতার জন্য শুধু জরুরি চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচারই যথেষ্ট নয়। শারীরিক সক্ষমতা, কথা বলা, গিলতে পারা এবং দৈনন্দিন কাজ করার ক্ষমতা অনুযায়ী পুনর্বাসনের প্রয়োজন হতে পারে। পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, রক্তে কোলেস্টেরলের অস্বাভাবিক মাত্রা ও হৃদ্রোগের মতো ঝুঁকিগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।
এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রামে নিউরোসার্জারি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ রোগী ও পরিবারের সদস্যদের অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয়তা, সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং চিকিৎসার বিকল্প সম্পর্কে বুঝতে সহায়তা করতে পারে। তবে স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে নিয়মিত অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য অপেক্ষা না করে জরুরি বিভাগে যেতে হবে।
স্ট্রোকের চিকিৎসায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত। সব রোগীর অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হয় না, কিন্তু যাঁদের প্রয়োজন, তাঁদের ক্ষেত্রে দ্রুত শনাক্তকরণ ও উপযুক্ত চিকিৎসা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তৈরি করতে পারে।
লেখক: ডা. মোঃ আনিসুল ইসলাম খান
সিনিয়র কনসালট্যান্ট অ্যান্ড কো-অর্ডিনেটর, নিউরোসার্জারি
এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রাম।




