বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন

0

যাদের এখনও উড়োজাহাজে চড়ার সুযোগ হয়নি তাদের জন্য বলা, বাংলাদেশের বিমানবন্দরগুলোতে এখনও ‘আদিম’ পদ্ধতিতে শুধু শরীর হাতড়েই তল্লাশি করা হয়! লাগেজ স্ক্যানারে পরীক্ষা হলেও যাত্রীদের তল্লাশির ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের কোন উদ্যোগ এখন পর্যন্ত নেওয়া হয়নি। দেশজুড়ে তোলপাড় তোলা বিমান ছিনতাই চেষ্টার পর তাই দেশের বিমানবন্দরগুলোর পুরো নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েই বড় ধরনের প্রশ্ন উঠে গেছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে বিস্তারিত জানাচ্ছেন জয়নিউজের নিজস্ব প্রতিবেদক রুবেল দাশ

চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক যাত্রীর বিমান ছিনতাইয়ের চেষ্টার ঘটনায় সারাদেশে তোলপাড় শুরু হয়েছে। সেনা কমান্ডোদের অভিযানে ওই ছিনতাইকারী নিহত হলেও এখনো জনমনে রয়ে গেছে অনেক প্রশ্ন। দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রাজধানী ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে কীভাবে এত নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেদ করে পিস্তল নিয়ে একজন যাত্রী বিমানে চড়ে বসে, সেটাই এখন ‘টক অব দ্যা কান্ট্রি’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফেসবুকে দেশের সাধারণ মানুষ এ নিয়ে নানা মন্তব্য করছেন। এছাড়া ছিনতাইকারীর সঙ্গে থাকা পিস্তলটি খেলনা নাকি আসল, সেটাও এখনো নিশ্চিত করে বলছে না সংশ্লিষ্ট কেউ।

সোমবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মুহিবুল হক বলেন, ‘ছিনতাইয়ের চেষ্টা করা ওই যুবকের হাতে যে পিস্তলটি ছিল সেটা খেলনা নাকি আসল পিস্তল তা এখনও নিশ্চিত নই। তদন্তের পর তা নিশ্চিত হওয়া যাবে।’ বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনা তদন্তে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোকাব্বির হোসেনকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। তবে দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এরকম দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে দুঃখজনক ও ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত হিসেবে আখ্যায়িত করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সূত্র জানায়, যত দিন যাচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থাও তত আধুনিক হচ্ছে। এর বিপরীতে বাংলাদেশের শাহজালালসহ বিভিন্ন বিমানবন্দরে এখনও যাত্রীদের তল্লাশি করা হচ্ছে আদিম পদ্ধতিতে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া দরকার তার কোনোটিই পরিলক্ষিত হয় না দেশের বিমানবন্দরগুলোতে। ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে মানুষের শরীর হাতড়েই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। শুধু শাহজালাল নয়, দেশের অন্যান্য বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও অনেক দিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। কক্সবাজার বিমানবন্দর দিয়ে ইয়াবা আদান-প্রদানও ধরা পড়েছে বিভিন্ন সময়।

এদিকে, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সূত্রগুলো বলছে, রোববার ছিনতাইয়ের চেষ্টা করা উড়োজাহাজটির গন্তব্য ছিল ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে দুবাই। উড়োজাহাজটি আন্তর্জাতিক রুটের হলেও সেটিতে অভ্যন্তরীণ যাত্রীদেরও নেওয়া হয়। বিমান ছিনতাইয়ের চেষ্টায় অভিযুক্ত নিহত পলাশ অভ্যন্তরীণ টার্মিনাল দিয়ে ঢুকে উড়োজাহাজে উঠেছিলেন। অভ্যন্তরীণ টার্মিনালে যাত্রীদের ব্যাগ স্ক্যানারে পরীক্ষা করা হলেও যাত্রীদের দেহ তেমন একটা তল্লাশি করা হয় না। ধারণা করা হচ্ছে, এই ঢিলেমির সুযোগটাই ওই যাত্রী নিয়েছেন। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পথের যাত্রীদের শাহজালাল বিমানবন্দরের মূল টার্মিনাল দিয়ে অন্তত তিন দফা সর্বাত্মক নিরাপত্তা তল্লাশি পার হতে হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক উইং কমান্ডার সারওয়ার-ই-জামান জয়নিউজকে বলেন, একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীদের জন্য তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকে। সেগুলো পার হয়েই তাকে বিমান পর্যন্ত যেতে হয়। ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কীভাবে একজন যাত্রী পিস্তল নিয়ে বিমানে উঠে গেল সেটি অবশ্যই চিন্তার বিষয়। তবে তদন্ত কমিটি যেহেতু হয়েছে, তারাই বিষয়টি উদঘাটন করবে। বিমান ছিনতাই চেষ্টার ঘটনার পর চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরো জোরদার করা হয়েছে।

এদিকে, দেশের অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরগুলো অনেকটাই অরক্ষিত বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, জেএফকে, হিথ্রো, দুবাই, ইস্তাম্বুলসহ বিশ্বের অর্ধশতাধিক বিমানবন্দর এখন রেড লেবেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় রাখে। কোনো ধরনের ঝুঁকি এ বিমানবন্দরগুলো নেয় না। আধুনিক নিরাপত্তাবলয়ের মাধ্যমে পণ্য ও মানুষের চলাচল পর্যবেক্ষণ করা হয়। সামান্যতম সন্দেহ হলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিয়ে থাকে এ বিমানবন্দরগুলো। জেএফকে ও দুবাই বিমানবন্দরে অটোমেটিক স্ক্যানারে পুরো শরীরের তল্লাশি হয়। নিরাপত্তার জন্য সজাগ রাখা হয় বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত কুকুর। লাগেজ ও যাত্রীদের সন্দেহ হলেই কুকুর দিয়ে পরীক্ষা করা হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ড. মুহাম্মদ সেকান্দার খান জয়নিউজকে বলেন, দেশের একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কোন যাত্রী পিস্তল নিয়ে ঢুকে যাবে এটি খুবই দুঃখজনক। এটি দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্যও হুমকিস্বরূপ। যতুটুকু জেনেছি, বিমানটি একটি আন্তর্জাতিক রুটের ফ্লাইট ছিল। সেখানে যদি বাইরের দেশের কোন যাত্রী থাকতো তাহলে দেশের মান-সম্মানও প্রশ্নবিদ্ধ হত। ফলে বলা যায়, ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের এ বিষয়ে গাফিলতি ছিল। তাদের খামখেয়ালীপনার কারণেই এ ঘটনাটি ঘটেছে। ওই যাত্রীকে যদি বিমানবন্দরেই আটক করা যেত তাহলে এত বড় ঘটনা ঘটতো না।

উন্নত বিশ্বের বিমানবন্দরগুলোর উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, বিমানবন্দর একটি স্পর্শকাতর জায়গা। এখানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা হতে হবে বিশ্বমানের। উন্নত বিশ্বের বিমানবন্দরগুলোতে যে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তা এখানেও নেওয়া হলে এ ধরনের ঘটনা আর ঘটবে না।

জয়নিউজ/জুলফিকার
আরও পড়ুন
লোড হচ্ছে...