সিআরবিতে হাসপাতাল/জনবিরোধী সিদ্ধান্তের আশঙ্কায় ফুঁসছে চট্টগ্রাম

রাজীব সেন প্রিন্স

চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক ও পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল সিআরবি এলাকায় হাসপাতাল নির্মাণের সম্ভাব্য উদ্যোগ ঘিরে আবারও উত্তাল জনমত।

- Advertisement -

টানা কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচিতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই প্রকল্পকে সহজভাবে নিতে রাজি নন চট্টগ্রামবাসী।

- Advertisement -
google news follower

সচেতন একাধিক নগরবাসী জানিয়েছে, চট্টগ্রাম নগরের “ফুসফুস” হিসেবে পরিচিত সিআরবি শুধু একটি রেলওয়ে এলাকা নয়। এটি শহরের অন্যতম প্রধান সবুজ অঞ্চল এবং ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান। যেখানে রয়েছে, শত বছরের পুরোনো বৃক্ষরাজি, পাহাড়ি প্রাকৃতিক গঠন ও ব্রিটিশ আমলের রেলওয়ে স্থাপত্য ঐতিহ্য।

ফলে এখানে যেকোনো স্থাপনা নির্মাণ মানেই পরিবেশ ও ঐতিহ্যের ওপর সরাসরি প্রভাব। আর তাই এটি কোনো বিচ্ছিন্ন প্রতিবাদ নয়। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, পেশাজীবী গোষ্ঠী, সাধারণ নাগরিক এমনকি স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব সবাই প্রায় এক সুরে বিরোধিতা করছে।

- Advertisement -
islamibank

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন-এর সরাসরি অবস্থান এই বিরোধিতাকে আরও শক্তিশালী করেছে।

এদিকে গতকাল রোববার সন্ধ্যায় এলাকায় পরিদর্শনে এসে সরাসরি বিক্ষোভের মুখে পড়েন সড়ক, সেতু, রেল ও নৌ পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।

সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে তাঁর গাড়িবহর সিআরবিতে পৌঁছালে আগে থেকেই অবস্থান নেওয়া বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীরা ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে স্লোগান দিতে থাকেন। মন্ত্রী উপস্থিত থাকাকালীন পুরো সময়জুড়েই চলে প্রতিবাদ।

পরে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, পরিবেশের ক্ষতি করে বা চট্টগ্রামবাসীকে ঝুঁকিতে ফেলে সরকার কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে না। তবে তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট অস্বীকৃতির বদলে এক ধরনের কৌশলী অবস্থানই ফুটে ওঠে।

তিনি বলেন,“সরকার এই জায়গায় হাসপাতাল করতে যাচ্ছে, এমন কোনো প্রকল্প এই মুহূর্তে নেই।” কিন্তু একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, “জনবান্ধব” কোনো উদ্যোগ হলে তা বিবেচনায় আনা হতে পারে। যা আন্দোলনকারীদের মধ্যে নতুন করে সন্দেহ তৈরি করেছে।

‘মাফিয়া সিন্ডিকেটের চক্রান্ত’ অভিযোগ
এর আগে সকালে সিআরবি সাত রাস্তার মোড়ে সমাবেশ করে ‘সিআরবি রক্ষা মঞ্চ’। সংগঠনটির সমন্বয়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমান সরাসরি অভিযোগ তোলেন। বলেন, এই প্রকল্পের পেছনে রয়েছে “মুনাফালোভী মাফিয়া সিন্ডিকেটের গভীর চক্রান্ত”।

তিনি বলেন, শত বছরের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জাতীয় ঐতিহ্যকে ধ্বংস করে বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে তোলার চেষ্টা জনস্বার্থের বিরুদ্ধে।

চসিক মেয়র ডা. শাহাদাতের কঠোর অবস্থান:
একই দিনে নগরের জামালখানে এক কর্মসূচিতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “গাছ কেটে সিআরবিতে কোনো হাসপাতাল বা স্থাপনা করতে দেওয়া হবে না। চট্টগ্রামবাসী এটা কখনো মেনে নেবে না।”

তিনি জানান, মন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর আলোচনায় পুরোনো রেলওয়ে হাসপাতাল উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। প্রয়োজনে সেটি আধুনিকায়ন বা পুনর্নির্মাণের কথাও বলা হয়েছে।

পুরোনো ক্ষত, নতুন উত্তাপ
গেল ২০২১ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সিআরবির ছয় একর জমিতে হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয়।

সেই সময় টানা ১৫ মাস ধরে আন্দোলনের মুখে প্রকল্পটি স্থগিত হয়ে যায়। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে সংসদ সদস্য পর্যন্ত অনেকেই তখন এই উদ্যোগের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।

সরকারি ভাষ্য বলছে-“এই মুহূর্তে কোনো প্রকল্প নেই।” কিন্তু জনগণের প্রশ্ন-তাহলে বারবার কেন এই এলাকা পরিদর্শন? কেনই বা ‘বিকল্পভাবে বিবেচনার’ কথা বলা হচ্ছে?

চট্টগ্রামের ফুসফুসখ্যাত সিআরবি এখন শুধু একটি জায়গা নয়—এটি হয়ে উঠেছে পরিবেশ বনাম উন্নয়নের এক প্রতীকী সংঘর্ষ। আর সেই সংঘর্ষে আপাতত পিছিয়ে যেতে রাজি নয় সাধারণ মানুষ।

সিআরবি ইস্যুটি শুধু একটি হাসপাতাল নির্মাণ বিতর্ক নয়—এটি এখন পরিবেশ, নগর পরিকল্পনা, জনমত এবং নীতিনির্ধারণের স্বচ্ছতা—এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে আছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবেশ ক্ষতি না করে বিদ্যমান রেলওয়ে হাসপাতালের উন্নয়নে দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য করলে নগরবাসী সরকারের ওপর আস্তা রাখবে। অতবা নগরের অন্য অনুন্নত এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা বিস্তারের লক্ষ্যে বিকল্প স্থানে নতুন হাসপাতাল তৈরি করতে পারে সরকার।

KSRM
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জয়নিউজবিডি.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।

এই বিভাগের আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ