লোহাগাড়ায় ভয়ংকর জালিয়াতি: রোহিঙ্গারা ভুয়া পরিচয়ে ‘বাংলাদেশি’

রাজীব সেন প্রিন্স

চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় সংঘবদ্ধ একটি জালিয়াতি চক্রের মাধ্যমে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ভুয়া পরিচয়ে বাংলাদেশি ভোটার বানানোর অভিযোগ উঠেছে।

- Advertisement -

টাকার বিনিময়ে স্থানীয়দের পিতা-মাতা সাজিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে। পরে সেই পরিচয়ে পাসপোর্ট বানিয়ে তারা মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে পাড়ি দিচ্ছেন—এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে অনুসন্ধানে।

- Advertisement -
google news follower

অনুসন্ধানে জানা যায়, একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট স্থানীয় কিছু অসাধু জনপ্রতিনিধি ও নির্বাচন অফিসের অসৎ কর্মচারীদের সঙ্গে যোগসাজশ করে এই জালিয়াতি চালিয়ে যাচ্ছে।

রোহিঙ্গারা নিজেদের প্রকৃত পরিচয় গোপন রেখে স্থানীয় স্বামী-স্ত্রীকে ভুয়া পিতা-মাতা বানিয়ে কাগজপত্র তৈরি করছে। একটি এনআইডি তৈরিতে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে দালাল চক্র।

- Advertisement -
islamibank

সম্প্রতি অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, লোহাগাড়ার চুনতি ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের হাটখোলা মুড়া আনসার ভিডিপি স্কুলের ঠিকানা ব্যবহার করে জেসমিন আক্তার কলি নামে এক নারী ভোটার হয়েছেন।

তবে তদন্তে জানা যায়, তার প্রকৃত নাম রোকেয়া বেগম। তিনি কয়েক বছর আগে কক্সবাজারের বালুখালী ১৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বাবা-মায়ের সঙ্গে বসবাস করতেন।

পরে সেখান থেকে পালিয়ে বান্দরবানের লামা উপজেলার আজিজনগর এলাকায় আশ্রয় নেন।

আরও জানা যায়, মালয়েশিয়া প্রবাসী জোবাইর হোসেনের সঙ্গে সম্পর্কের সূত্রে তিনি ভুয়া পরিচয়ে এনআইডি তৈরির প্রক্রিয়ায় যুক্ত হন।

টাকার বিনিময়ে বান্দরবানের লামা উপজেলার আজিজনগর হিমছড়িপাড়ার বাসিন্দা কালু ও তার স্ত্রী মনোয়ারা বেগমকে পিতা-মাতা দেখিয়ে গত বছর লোহাগাড়ার চুনতি এলাকা থেকে ভোটার হন তিনি।

তবে সরেজমিন গিয়ে ওই এলাকায় এমন কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

গোপন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, তথাকথিত পিতা কালু কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার হারবাং ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কলাতলী এলাকার রিজার্ভ ফরেস্টে বসবাস করেন।

অর্থের বিনিময়ে তার পরিচয় ব্যবহার করে ৫-৬ জন রোহিঙ্গাকে এনআইডি করে দেওয়ার কথা গণমাধ্যমের কাছে স্বীকার করেছেন তিনি।

একইভাবে ২০২৪ সালে সৈয়দা খাতুন নামে আরেক রোহিঙ্গা নারীকে ভুয়া পিতা-মাতা সাজিয়ে এনআইডি তৈরি করে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় জড়িত আবুল কালামও বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

তার এনআইডিতে ঠিকানা চুনতি ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড রহমানিয়াপাড়া উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে তাকে সেখানে পাওয়া যায়নি।

স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় ২০ বছর আগে রোহিঙ্গা নেতা আবুল কালাম এ দেশে এসে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার হারবাং ইউনিয়নের কলাতলী রিজার্ভ ফরেস্টে বসবাস শুরু করেন।

তার এনআইডি ব্যবহার করে আরও একাধিক রোহিঙ্গা ভোটার হয়েছেন বলে অনুসন্ধানে তথ্য মিলেছে। এমনকি তার পরিচয় ব্যবহার করে ওবাইদুল হক নামে এক রোহিঙ্গা পাসপোর্ট করতে গিয়ে দুবছর আগে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, টাকার বিনিময় ছাড়া এ ধরনের জালিয়াতি সম্ভব নয়। তাদের দাবি, কিছু জনপ্রতিনিধি ও অসাধু চক্রের সহযোগিতায় রোহিঙ্গারা শুধু ভোটারই হচ্ছেন না, বরং স্থানীয়দের মেয়েদের বিয়ে করে স্থায়ী পরিচয়ও নিচ্ছেন। এরপর পাসপোর্ট বানিয়ে বিদেশে পালিয়ে যাচ্ছেন।

এ বিষয়ে আইনজীবী প্রকৃতি চৌধুরী ছোটন বলেন, এটি শুধু জালিয়াতি নয়, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি।

রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের নাগরিক নন, তাই তাদের ভোটার হওয়ার কোনো আইনি সুযোগ নেই।

ভুয়া তথ্য দিয়ে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া একটি দণ্ডনীয় অপরাধ এবং এতে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।

চুনতি ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. ইয়াসিন বলেন, তার ওয়ার্ড থেকে কিভাবে এসব ব্যক্তি ভোটার হয়েছেন, তা তার জানা নেই। যাদের পিতা-মাতা দেখানো হয়েছে তাদের কোনো অস্তিত্ব এলাকায় নেই।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মং এছেন বলেন, রোহিঙ্গাদের ভোটার হওয়া ঠেকাতে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

কেউ আগে ভুয়া উপায়ে ভোটার হয়ে থাকলে তথ্য দিলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এই ঘটনার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে, স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নথি জালিয়াতির মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

এখন প্রশ্ন—এই চক্রের শিকড় কত গভীরে?

KSRM
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জয়নিউজবিডি.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।

এই বিভাগের আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ