চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলা পল্লী বিদ্যুৎ জোনাল কার্যালয়কে ঘিরে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্নীতি ও গ্রাহক হয়রানির অভিযোগ এবার নতুন মাত্রা পেয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অফিসটির একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গ্রাহকদের জিম্মি করে রেখেছে। নতুন সংযোগ, মিটার, লাইন নির্মাণ কিংবা বিভিন্ন প্রশাসনিক সেবা—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ঘুষ ও অনৈতিক লেনদেন ছাড়া কাজ এগোয় না বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ অবস্থায় লোহাগাড়া উপজেলার বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেন খান দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের স্থাপনা ও সম্পদের ছবিও জমা দেওয়া হয়েছে। সূত্র জানায়, বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ইতোমধ্যে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে দুদক।
‘অফিসে গেলে পাঠানো হয় সিন্ডিকেট সদস্যদের কাছে’ :
একাধিক ভুক্তভোগীর ভাষ্য, কোনো গ্রাহক সমস্যার সমাধান নিয়ে জোনাল অফিসে গেলে তাকে সরাসরি সহযোগিতা না করে বিভিন্ন দালাল ও সিন্ডিকেট সদস্যদের কাছে পাঠানো হয়।
সেখানে গ্রাহকদের নানা আইনি জটিলতা, মামলা, সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ কিংবা জরিমানার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, নতুন সংযোগের আবেদন অনলাইনে বা অফলাইনে জমা নেওয়া হলেও নানা অজুহাতে মাসের পর মাস ফাইল আটকে রাখা হয়।
কখনো বলা হয় মিটার নেই, কখনো ট্রান্সফরমার নেই, আবার কখনো সার্ভিস ড্রপ বা তার সংকটের কথা বলা হয়। অথচ দালালদের মাধ্যমে ‘সমঝোতা’ হলে একই কাজ অল্প সময়েই সম্পন্ন হয়ে যায়।
স্থানীয়দের দাবি, একজন গ্রাহকের নামে একাধিক মিটার নিয়ে সেগুলো পরে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকায় বিক্রির ঘটনাও ঘটেছে।
তদন্ত হয়েছে, কিন্তু শাস্তি হয়নি :
লোহাগাড়া জোনাল অফিসে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে অতীতেও তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল।
তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পরও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর সাবেক জিএম প্রকৌশলী দীলিপ চন্দ্র চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, গুরুতর অনিয়মের অভিযোগে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল এবং তদন্ত প্রতিবেদনে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গিয়েছিল।সূত্র-যুগান্তর
পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হলেও এরপর কী হয়েছে, তা তার জানা নেই।
নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ :
অভিযোগ অনুযায়ী, চুনতি এলাকায় আমিনুর রহমান নামে এক গ্রাহকের একই স্থাপনায় নিয়মবহির্ভূতভাবে দুটি বাণিজ্যিক সংযোগ দেওয়া হয়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, বিদ্যমান নীতিমালা অনুসারে একটি সংযোগ হলে গ্রাহককে নিজ খরচে ট্রান্সফরমার স্থাপন করতে হতো।
কিন্তু বিশেষ সুবিধা দিতে নীতিমালার ব্যত্যয় ঘটিয়ে দুটি সংযোগ দেওয়া হয় এবং অফিস থেকে ছয়টি ২৫ কেভিএ ট্রান্সফরমার সরবরাহ করা হয়। এতে সরকারি আর্থিক ক্ষতির অভিযোগও উঠেছে।
একইভাবে ট্যান্ডলপাড়া এলাকার মো. আনোয়ার হোসেনের নির্মাণ সংযোগ এবং আমিরাবাদ ইউনিয়নের খালেকের দোকান এলাকার মো. ফরিদুল আলমের রাইস মিল সংযোগেও অনুমোদিত স্টেকিং শিট ও কার্যাদেশ ছাড়াই কাজ সম্পন্ন করার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, যেসব শিল্প ও বহুতল সংযোগ দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে রয়েছে, সেগুলোর আগে বিশেষ সুবিধাভোগীদের সংযোগ দেওয়া হয়েছে।
ভিলেজ ইলেকট্রিশিয়ানদের সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন :
অভিযোগের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ভিলেজ ইলেকট্রিশিয়ান মো. সেলিম ও মোজাম্মেল হক।
স্থানীয়দের দাবি, পূর্ব কলাউজান এলাকায় মো. সেলিমের বিলাসবহুল একাধিক ভবন নির্মাণাধীন রয়েছে। একটি বাণিজ্যিক ভবনের নাম রাখা হয়েছে ‘আহমদ হোসেন টাওয়ার’।
এছাড়া তার মালিকানায় বা অংশীদারিত্বে ‘ওয়েল ফুড’ ও ‘ফ্রেশ বাইট’সহ একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের কেউ কেউ অভিযোগ করেন, বিভিন্ন সময় প্রভাব খাটিয়ে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার এবং বিরোধীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনাও ঘটেছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে মো. সেলিম বলেন, তিনি কোনো দালালির সঙ্গে জড়িত নন।
তার সম্পদের উৎস সম্পর্কে তিনি দাবি করেন, তিনি জমি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এবং বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অংশীদার হিসেবে বিনিয়োগ রয়েছে।
অন্যদিকে মোজাম্মেল হকের বিরুদ্ধেও বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তিনি বলেন, অভিযোগগুলো দুদক তদন্ত করে দেখুক। তার সব সম্পদের তথ্য তিনি দিতে প্রস্তুত।
অভিযুক্তদের বক্তব্য :
জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার হাবিবুর রহমান নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি মাত্র এক বছর আগে এ অফিসে যোগ দিয়েছেন এবং অফিসকে দালালমুক্ত করার চেষ্টা করছেন।
লোহাগাড়া জোনাল অফিসের ডিজিএম রফিকুল ইসলাম খান বলেন, কিছু অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে বলে তিনি অবগত আছেন। যে কোনো সংস্থা তদন্ত করলে তার আপত্তি নেই।
ভিলেজ ইলেকট্রিশিয়ান সেলিম ও মোজাম্মেল হকের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, তারা হাইকোর্টের রায়ের ভিত্তিতে কাজ করছেন বলে দাবি করেছেন, তবে তার কাছে সেই রায়ের কপি নেই।
এখন প্রশ্ন জবাবদিহির :
লোহাগাড়ার সাধারণ গ্রাহকদের প্রশ্ন একটাই—বছরের পর বছর ধরে অভিযোগ, তদন্ত ও অনিয়মের খবর সামনে এলেও কেন দৃশ্যমান শাস্তি হচ্ছে না?
কেন সাধারণ মানুষ বিদ্যুতের মতো মৌলিক সেবা পেতে গিয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন?
দুদকের তদন্তে যদি অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়, তাহলে শুধু কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর জবাবদিহিই নয়, পুরো ব্যবস্থার সংস্কার জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।
কারণ বিদ্যুৎ সেবা জনগণের অধিকার; সেটিকে কোনো সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে দেওয়া রাষ্ট্র ও জনগণ—উভয়ের জন্যই উদ্বেগের বিষয়।




