চট্টগ্রামের অন্যতম পরিচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সিডিএ পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক)-এর মালিকানাধীন এই প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা কার্যক্রম ও শৃঙ্খলার জন্য পরিচিত হলেও সাম্প্রতিক সময়ে এখানে একাধিক অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ এবং প্রশাসনিক পরিবর্তন ঘিরে তৈরি হয়েছে জটিল পরিস্থিতি।
অভিযোগগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, নিয়োগ প্রক্রিয়া, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং তদন্ত কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন। তবে এসব অভিযোগ এখনো বিভিন্ন পর্যায়ে তদন্তাধীন বা যাচাইবিহীন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের পর প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সূত্রগুলোর দাবি অনুযায়ী, এই সময় গভর্নিং বডির দুই শিক্ষক প্রতিনিধি—মাসুদ রানা ও মো. নাসির উদ্দীন—প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার শুরু করেন।
এ সময় তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে পদত্যাগে বাধ্য করার মতো পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল বলে কিছু পক্ষের অভিযোগ।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
পরবর্তীতে আবু হেনা মোস্তফা কামাল ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
নতুন প্রশাসনিক কাঠামো গঠনের পর প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম নিয়ে একাধিক অভিযোগ সামনে আসে।
অভিযোগগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—নিয়ম বহির্ভূতভাবে শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হয়েছে। কোচিং, পরীক্ষার ফি এবং বিভিন্ন সেবাখাতে অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো হয়েছে এবং স্টেশনারি ও অন্যান্য শিক্ষা উপকরণ ক্রয়ে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
তবে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জানায়, সব কার্যক্রম নিয়ম অনুযায়ী পরিচালিত হয়েছে এবং কোনো ধরনের অনিয়মের সুযোগ নেই।
১৭ শিক্ষকের নিয়োগ ও দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব:
প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ হিসেবে উঠে এসেছে ১৭ জন শিক্ষক ও কর্মচারীর নিয়োগ ও স্থায়ীকরণ সংক্রান্ত বিষয়।
ভুক্তভোগীদের দাবি অনুযায়ী—২০১৭ সালে নিয়োগ পাওয়া এসব শিক্ষক ২০২১ সালে স্থায়ীকরণের সময় ঘুষ দাবির মুখে পড়েন।
ঘুষ না দেওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে পরবর্তীতে বিভিন্ন অভিযোগ তোলা হয় এবং পরবর্তী সময়ে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়ায় হয়রানির অভিযোগ ওঠে।
অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট পক্ষের দাবি—নিয়োগ ও স্থায়ীকরণ সম্পূর্ণ নিয়ম মেনেই হয়েছে। অভিযোগগুলো ব্যক্তিগত বিরোধ ও ভুল ব্যাখ্যার ফল।
এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত নিরপেক্ষ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।
দুদক তদন্ত ঘিরে নতুন বিতর্ক:
২০২৪ সালের পর কিছু অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এ জমা পড়ে বলে জানা যায়।
অভিযোগকারীদের দাবি—তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে মিথ্যা অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রক্রিয়া পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারে।
অন্যদিকে অভিযোগকারী পক্ষ বলছে—তারা আইনগত প্রক্রিয়ায় অভিযোগ করেছেন। সত্য উদঘাটনের জন্যই তদন্ত প্রয়োজন।
বর্তমানে এ বিষয়ে তদন্ত চলমান রয়েছে বলে জানা যায়, তবে বিস্তারিত ফলাফল প্রকাশিত হয়নি।
২০১২ সালের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে পৃথক অভিযোগ :
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ উঠে এসেছে শিক্ষক প্রতিনিধি মাসুদ রানার নিয়োগ প্রক্রিয়া ঘিরে।
অভিযোগ অনুযায়ী—নিয়োগ পরীক্ষায় তিনি তৃতীয় স্থান অর্জন করেছিলেন। দ্বিতীয় স্থানের প্রার্থী যোগদান না করায় নিয়োগ পাওয়ার কথা ছিল পরবর্তী প্রার্থীর। কিন্তু অভিযোগ, সেই প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও নথি জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ নিশ্চিত করা হয়।
অভিযুক্ত ব্যক্তি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, তিনি কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নিয়োগ পেয়েছেন এবং কোনো অনিয়ম সম্পর্কে তিনি অবগত নন।
এ বিষয়ে শিক্ষা অধিদপ্তরের একটি তদন্ত চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে।
তদন্ত কমিটি গঠন নিয়ে প্রশ্ন?
আরেকটি বিতর্কের বিষয় হলো তদন্ত কমিটি গঠন প্রক্রিয়া। অভিযোগ রয়েছে, চউক চেয়ারম্যানকে অবগত না করেই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং এতে কিছু বিতর্কিত ব্যক্তি অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
আইনজ্ঞদের মতে, মালিকানা কর্তৃপক্ষকে বাদ দিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলে তা প্রক্রিয়াগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ :
শিক্ষা প্রশাসন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক পরিবর্তনের সময়—স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
ব্যক্তিগত বিরোধ প্রশাসনিক কাঠামোকে প্রভাবিত করলে দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অভিযোগগুলো অবশ্যই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়া উচিত।
তারা আরও বলেন, অভিযোগ প্রমাণ ছাড়া কাউকে দায়ী করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি অভিযোগকে উপেক্ষা করাও ঝুঁকিপূর্ণ।
প্রতিষ্ঠানের ভেতরের অস্থিরতার চিত্র:
সব মিলিয়ে সিডিএ পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ এখন এক জটিল বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে প্রশাসনিক পরিবর্তন ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অভিযোগ, অন্যদিকে নিয়োগ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন—সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটি এক ধরনের অনিশ্চয়তার মুখোমুখি।
তবে এখনো পর্যন্ত কোনো অভিযোগই চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে সিডিএ পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্ভরযোগ্য নাম হলেও সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে থাকা প্রশাসনিক কাঠামো ও স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন— নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষা পরিবেশকে সব ধরনের প্রভাবমুক্ত রাখা।
এখন নজর থাকবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।




