চট্টগ্রাম নগরের দীর্ঘস্থায়ী যানজটের পেছনে শুধু সড়কের সীমাবদ্ধতা নয়, নগর পরিকল্পনা উপেক্ষা করে পরিচালিত কিছু বেসরকারি হাসপাতালের কার্যক্রমও বড় কারণ হয়ে উঠছে-এমন আশঙ্কাই সামনে এসেছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) সর্বশেষ পরিদর্শনে।
সোমবার নগরের জিইসি মোড় এলাকার চারটি বেসরকারি হাসপাতাল পরিদর্শন করে চউকের একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টিম।
পরিদর্শনে ছিল মেট্রোপলিটন হাসপাতাল, রয়েল হাসপাতাল, মেডিক্যাল সেন্টার হাসপাতাল এবং সিএসসিআর হাসপাতাল।
উদ্দেশ্য ছিল অনুমোদিত নকশা, ইমারত নির্মাণ বিধিমালার প্রতিপালন এবং পার্কিং ব্যবস্থার বাস্তব অবস্থা যাচাই করা।
সরেজমিনে গিয়ে কর্মকর্তারা যে চিত্র দেখেছেন, তা নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, কোথাও বাণিজ্যিক ভবনের অনুমোদন নিয়ে হাসপাতাল পরিচালিত হচ্ছে, কোথাও প্রয়োজনীয় পার্কিং নেই, আবার কোথাও নকশায় পার্কিং হিসেবে দেখানো স্থান অন্য কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।
কোনো কোনো স্থানে পার্কিং এলাকা যথাযথভাবে চিহ্নিতও করা হয়নি। এমনকি পার্কিংয়ের জায়গায় ময়লা-আবর্জনা ফেলা এবং ঝুঁকিপূর্ণভাবে গ্যাস সিলিন্ডার সংরক্ষণের অভিযোগও উঠে এসেছে।
পরিদর্শন শেষে চউকের প্রধান প্রকৌশলী আহমেদ আনোয়ারুল নজরুল বলেন, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নকশা ও বাস্তব অবস্থা যাচাই করে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে।
তাৎক্ষণিক কঠোর সিদ্ধান্ত নিলে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হতে পারে।
তাই আপাতত সংশ্লিষ্ট হাসপাতালগুলোকে সতর্ক করা হয়েছে। খুব শিগগিরই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে আরও কঠোর অবস্থানের কথা জানান চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন।
তিনি বলেন, বেসরকারি হাসপাতালগুলোর প্রায় কোনোটিই পর্যাপ্ত পার্কিং ব্যবস্থা গড়ে তোলেনি। তারা সিডিএর নকশা বহির্ভূতভাবে এবং পার্কিং ব্যবস্থা না রেখেই বাণিজ্যিকভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছে।
তারা নিজেরাও খুব ভালো করে জানে যে তারা সিডিএর কোন কোন আইন ভঙ্গ করেছে।
তিনি আরও বলেন, “তারা যেন অবিলম্বে নিজস্ব উদ্যোগে পর্যাপ্ত পার্কিং ব্যবস্থা গড়ে তোলে। আংশিক পার্কিং ব্যবস্থা একটি আইওয়াশ। সেটি করা চলবে না। অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
চেয়ারম্যানের ভাষ্য অনুযায়ী, সিডিএ, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, ওয়াসা, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নগরের যানজট নিরসনে সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
নগরবাসীর দুর্ভোগ কমাতে কোনো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও তিনি সতর্ক করেন।
কোন হাসপাতালে কী পাওয়া গেল
মেট্রোপলিটন হাসপাতাল: পার্কিং ব্যবস্থা থাকলেও অধিকাংশ গাড়ি নির্ধারিত স্থানে রাখা হচ্ছে না। এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
রয়েল হাসপাতাল: বাণিজ্যিক ভবনের অনুমোদন নিয়ে হাসপাতাল পরিচালনার অভিযোগ পাওয়া গেছে। পাশাপাশি পার্কিং ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত বলে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত হয়েছে।
মেডিক্যাল সেন্টার হাসপাতাল: বাণিজ্যিক ভবনের অনুমোদনে হাসপাতাল পরিচালনার অভিযোগের পাশাপাশি পার্কিং সংকট দেখা গেছে। নির্ধারিত পার্কিং এলাকায় ডাস্টবিন ও গ্যাস সিলিন্ডার সংরক্ষণের বিষয়টিও কর্মকর্তাদের নজরে এসেছে।
সিএসসিআর হাসপাতাল: পরিদর্শনের সময় তাৎক্ষণিকভাবে অনুমোদিত নকশা উপস্থাপন করতে পারেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
পরিদর্শনে উপস্থিত ছিলেন চউকের প্রধান প্রকৌশলী আহমেদ আনোয়ারুল নজরুল, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও ইমারত নির্মাণ কমিটি-২-এর চেয়ারম্যান এ.জি.এম. সেলিম, নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক মো. মাহফুজুর রহমান, অথোরাইজড অফিসার-১ কাজী কাদের নেওয়াজ, অথোরাইজড অফিসার-২ তানজীব হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এই পরিদর্শন আপাতত সতর্কবার্তায় সীমাবদ্ধ থাকলেও চউকের বক্তব্য স্পষ্ট-পরবর্তী পরিদর্শনে হাসপাতালের আকার অনুযায়ী কার্যকর পার্কিং ব্যবস্থা দৃশ্যমান না হলে কোনো অজুহাত গ্রহণ করা হবে না, সরাসরি কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নগরের যানজট, ইমারত নির্মাণ বিধিমালার বাস্তবায়ন এবং হাসপাতাল পরিচালনার জবাবদিহি-এই তিনটি প্রশ্ন এখন একই সূত্রে গিয়ে মিলেছে।
পরবর্তী পদক্ষেপে শুধু সতর্কবার্তা নয়, বাস্তবায়ন কতটা হয়, সেদিকেই এখন নজর নগরবাসীর।




