বিপজ্জনক গ্রাউন্ডিং থেকে মুক্তি, রাতভর সমন্বিত অভিযানে স্বস্তি চট্টগ্রাম বন্দরে

অনলাইন ডেস্ক

চট্টগ্রাম বন্দরের চ্যানেলে হঠাৎ বিপদ। ১৭০ মিটার দীর্ঘ কনটেইনার জাহাজের স্টিয়ারিং বিকল হয়ে ধাক্কা লাগে ২ নম্বর লাল বয়ার সঙ্গে।

- Advertisement -

এরপর নদী মোহনার সংলগ্ন রিটেইনিং ওয়ালে আছড়ে পড়ে গ্রাউন্ডেড হয় জাহাজটি।

- Advertisement -
google news follower

একদিকে ১ হাজার ২৮২ টিইইউএস পণ্য, অন্যদিকে বন্দরের নৌ চলাচল স্বাভাবিক রাখার চ্যালেঞ্জ। শুরু হয় রাতভর টানটান উত্তেজনার উদ্ধার অভিযান।

শেষ পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের সমন্বিত প্রচেষ্টায় ৭টি টাগবোট দিয়ে পরিচালিত সুসংগঠিত ও নিখুঁত উদ্ধার অভিযানে আটকে পড়া কনটেইনার জাহাজ ‘এমভি সিএনসি ইউরেনাস’ সফলভাবে উদ্ধার করা হয়েছে।

- Advertisement -
islamibank

মুক্ত করার পর জাহাজটিকে নিরাপদে বহির্নোঙরের ‘বি’ (ব্রাভো) অ্যাঙ্করেজে নোঙর করানো হয়। ফলে দেশের প্রধান সামুদ্রিক বন্দরের কার্যক্রম কোনো ধরনের আশঙ্কা ছাড়াই স্বাভাবিক রয়েছে।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রাম বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম।

যেভাবে বিপদে পড়ে জাহাজটি

বন্দর সচিব জানান, সোমবার বেলা ২টা ১৫ মিনিটে ২০১৭ সালে নির্মিত মাল্টার পতাকাবাহী ১৭০ মিটার দীর্ঘ কনটেইনার জাহাজ ‘এমভি সিএনসি ইউরেনাস’ কর্ণফুলী নদীর চ্যানেলে আনার সময় যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে স্টিয়ারিং বিকল হয়ে যায়।

নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে জাহাজটি প্রথমে ২ নম্বর লাল বয়ার সঙ্গে ধাক্কা খায়। পরে নদী মোহনার সংলগ্ন রিটেইনিং ওয়ালের ওপর আছড়ে পড়ে এবং গ্রাউন্ডেড হয়।

চীনের শিকৌ বন্দর থেকে আসা জাহাজটির ড্রাফট ৯ দশমিক ৫০ মিটার। এতে রয়েছে ১ হাজার ২৮২ টিইইউএস (২০ ফুট লম্বা) পণ্য।

মাস্টারসহ জাহাজটিতে ছিলেন ২৪ জন নাবিক। জাহাজটির স্থানীয় এজেন্ট এপিএল (বাংলাদেশ)।

খবর পেয়েই শুরু সর্বাত্মক উদ্ধার অভিযান

জরুরি বার্তা পাওয়ার পর সময় নষ্ট না করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে শুরু করে সুপরিকল্পিত সর্বাত্মক উদ্ধার অভিযান।

দুর্ঘটনাস্থলে দ্রুত মোতায়েন করা হয় বন্দরের সিনিয়র পাইলট এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের টাগবোট ‘কাণ্ডারী-২’, ‘কাণ্ডারী-৪’, ‘কাণ্ডারী-৬’ ও ‘কাণ্ডারী-১১’।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর টাগবোট ‘শিবসা’, টানেল টাগবোট এবং বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের টাগবোট ‘প্রমত্ত’।

অর্থাৎ, জাহাজটিকে নিরাপদে মুক্ত করতে মাঠে নামে মোট ৭টি টাগবোট।

শুধু উদ্ধার নয়, নেভিগেশন চ্যানেলের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের সদস্যরা সরাসরি অভিযানে অংশ নেন।

জাহাজটি আটকে পড়ার পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল নিরাপদে সেটিকে মুক্ত করা এবং একই সঙ্গে বন্দরের নেভিগেশন চ্যানেল সচল রাখা।

চরম ঝুঁকি সত্ত্বেও উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা অসাধারণ দক্ষতা, সাহস ও পারস্পরিক সমন্বয়ের মাধ্যমে রাতভর নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ চালিয়ে যান।

জাহাজের ড্রাফট কমিয়ে সেটিকে দ্রুত মুক্ত করার লক্ষ্যে সাময়িকভাবে কিছু কনটেইনার খালাস করার পরিকল্পনাও রাখা হয়েছিল।

তবে শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মীবাহিনীর কঠোর, সমন্বিত ও নিরলস প্রচেষ্টাই সাফল্যের পথ তৈরি করে।

গভীর রাতে মিলল কাঙ্ক্ষিত সাফল্য

দীর্ঘ অপেক্ষার পর গভীর রাতে সফল হয় উদ্ধার অভিযান। আটকে পড়া ‘সিএনসি ইউরেনাস’-কে নিরাপদে মুক্ত করা সম্ভব হয়। এরপর জাহাজটিকে নিরাপদে ‘ব্রাভো’ অ্যাঙ্করেজে নোঙর করানো হয়।

পুরো উদ্ধার অভিযান চলাকালে বন্দর চ্যানেল ছিল সম্পূর্ণ নিরাপদ ও নৌ চলাচলের উপযোগী। এ ঘটনায় কোনো হতাহতের ঘটনাও ঘটেনি।

চ্যালেঞ্জিং এই অভিযানে অসাধারণ পেশাদারিত্ব, সাহসিকতা ও নিষ্ঠার পরিচয় দেওয়ায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সব পাইলট, টাগ ক্রু, নৌ বিভাগের কর্মী এবং বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের সদস্যদের প্রতি আন্তরিক অভিনন্দন ও গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সফল উদ্ধার অভিযান আন্তর্জাতিকমানের সিম্যানশিপ, নেতৃত্ব, পেশাদারিত্ব, নিবিড় সমন্বয় ও দায়িত্ববোধের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

সংকটময় মুহূর্তে এমন সফল উদ্ধার অভিযান শুধু একটি জাহাজকে বিপদমুক্ত করেনি, বরং দেশের জাতীয় বাণিজ্যের স্বার্থও সুরক্ষিত করেছে এবং চট্টগ্রাম বন্দরের সুনাম অক্ষুণ্ণ রেখেছে।

এই কঠিন অভিযানে অবদান রাখা প্রতিটি সদস্যের পেশাদারিত্ব ও সাহসিকতা নিয়ে গর্বিত পুরো দেশ।

চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের আমদানি ও রপ্তানি পণ্যের প্রায় ৯২ শতাংশ পরিচালনা করে। ফলে বন্দরের নেভিগেশন চ্যানেলে বড় কোনো দুর্ঘটনা বা দীর্ঘস্থায়ী প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে এর প্রভাব পড়তে পারে দেশের সামগ্রিক বাণিজ্য ব্যবস্থায়।

তবে ‘সিএনসি ইউরেনাস’ গ্রাউন্ডেড হওয়ার পর দ্রুততম সময়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে সফল উদ্ধার অভিযান পরিচালনা প্রমাণ করেছে-জরুরি ও আপদকালীন পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের দ্রুত সাড়াদান সক্ষমতা, আন্তঃসংস্থার সমন্বয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীদের পেশাদারিত্ব কতটা কার্যকর।

KSRM
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জয়নিউজবিডি.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।

এই বিভাগের আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ