জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ২ বছর: থামেনি লোহাগাড়ার শহীদ ইশমামের মায়ের কান্না

দুই বছরেও ফেরেনি ইশমাম, দরজার দিকেই তাকিয়ে থাকেন মা!

অনলাইন ডেস্ক

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোতে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের রাজপথে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার তরুণ ইশমামুল হক।

- Advertisement -

বৃহস্পতিবার (৭ আগস্ট) তাঁর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও পরিবারের কাছে তিনি আজও যেন ঘরেরই একজন-যে কোনো মুহূর্তে দরজা খুলে ফিরে আসবেন। কিন্তু সেই প্রতীক্ষার শেষ হয়নি।

- Advertisement -
google news follower

এরই মধ্যে মামলার রায় হলেও তা বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না থাকায় হতাশা প্রকাশ করেছেন স্বজনরা।

ইশমামুল হক চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের দর্জিপাড়ার বাসিন্দা। তিনি প্রয়াত নুরুল হকের ছেলে। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন মেজ।

- Advertisement -
islamibank

পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে ঢাকার চকবাজার থেকে শাহবাগমুখী ছাত্র-জনতার মিছিলে অংশ নেন ১৭ বছর বয়সী ইশমাম।

মিছিলটি চানখাঁরপুল এলাকায় পৌঁছালে পুলিশ গুলি চালায়। এ সময় পেটে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন তিনি।

পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭ আগস্ট বিকেল সাড়ে ৪টায় তাঁর মৃত্যু হয়।

ইশমামের বাবা নুরুল হক ২০১৭ সালে মারা যান। পরিবারের অভাব-অনটনের কারণে তাঁর পড়াশোনা বেশিদূর এগোয়নি।

সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে ২০২৩ সালে ঢাকায় গিয়ে চকবাজারের একটি জুয়েলারি দোকানে মাসিক চার হাজার টাকা বেতনে চাকরি নেন।

সামান্য আয়ের বড় একটি অংশ নিয়মিত মায়ের কাছে পাঠিয়ে সংসারের খরচে সহায়তা করতেন তিনি।

দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে ইশমামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মা শাহেদা বেগম এখনও ছেলের স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে আছেন।

ঘরের প্রতিটি কোণে যেন ছড়িয়ে আছে তাঁর স্মৃতি। ছেলের ছবির দিকে তাকালেই চোখ ভিজে ওঠে অশ্রুতে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে শাহেদা বেগম বলেন, আন্দোলনের পুরো সময়ই সে রাজপথে ছিল। ৫ আগস্ট সকালেও মিছিলে গিয়েছিল। কিছুক্ষণ পর খবর পাই, ও গুলিবিদ্ধ হয়েছে।

কিন্তু সেদিন যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় লোহাগাড়া থেকে ঢাকায় যেতে পারিনি। পরদিন হাসপাতালে পৌঁছাই। আর তার পরদিনই আমার ছেলেটা চলে গেল।

তিনি বলেন, দুই বছর হয়ে গেছে, কিন্তু এখনও মনে হয় দরজা খুলে আমার ছেলেটা ঘরে ঢুকবে। একজন মা সন্তানের মৃত্যু কোনো দিন ভুলতে পারে না।

ইশমামের বড় ভাই মুহিবুল হক বলেন, ইশমাম শুধু আমার ছোট ভাই ছিল না, সে ছিল আমাদের পরিবারের সবচেয়ে বড় ভরসা। অল্প বয়সেই সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিল। নিজের প্রয়োজন কমিয়ে মায়ের জন্য টাকা পাঠাত।

আন্দোলনে যাবে জানতাম, কিন্তু কখনো ভাবিনি সে আর ফিরে আসবে না। দুই বছর কেটে গেলেও প্রতিটি মুহূর্তে তার শূন্যতা অনুভব করি।

তিনি আরও বলেন, আমরা চাই, ইশমামের আত্মত্যাগ যেন দেশের মানুষ চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। একই সঙ্গে শহীদদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে উঠুক।

মামলার বিষয়ে মুহিবুল হক বলেন, মামলার রায় হয়েছে। কিন্তু রায় বাস্তবায়নের জন্য এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। আমরা দ্রুত রায় কার্যকর করে দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানাই।

শহীদ ইশমামুল হকের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর স্মরণে পারিবারিকভাবে দোয়া মাহফিল, কোরআনখানি ও কবর জিয়ারতের আয়োজন করা হয়েছে। এতে পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, সহপাঠী, স্থানীয় বাসিন্দা এবং আন্দোলনের সহযোদ্ধারা অংশ নেবেন।

লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বায়েজীদ বিন আখন্দ বলেন, শহীদ ইশমামুল হকের পরিবারের খোঁজখবর নিয়মিত নেওয়া হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সেই রক্তাক্ত দিনের দুই বছর পরও শহীদ ইশমামুল হকের আত্মত্যাগ লোহাগাড়ার মানুষের স্মৃতিতে অম্লান।

পরিবারের কাছে তিনি হারানো এক সন্তান, আর অনেকের কাছে তিনি ন্যায়বিচার, অধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আত্মোৎসর্গকারী এক সাহসী তরুণ।

সময় যতই পেরিয়ে যাক, তাঁর আত্মত্যাগ ইতিহাসের পাতায় যেমন উজ্জ্বল থাকবে, তেমনি মানুষের হৃদয়েও চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

KSRM
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জয়নিউজবিডি.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।

এই বিভাগের আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ