চট্টগ্রাম নগরীর সিআরবি সংলগ্ন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান সংস্থাপন কর্মকর্তার (সিপিও) কার্যালয়। যেখানে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার কথা, সেখানেই দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে একচ্ছত্র রাজত্ব চালিয়ে যাচ্ছেন দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মচারী লুৎফা বেগম।
২০০৪ সালে যোগ দেওয়ার পর ২০২৬ সাল জানুয়ারি পর্যন্ত একটি বদলির আদেশও তাঁর দরজায় কড়া নাড়েনি।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন কিংবা গণঅভ্যুত্থানের ঢেউ-কোনো কিছুই তাঁর চেয়ারে আঁচড় কাটতে পারেনি, বরং উল্টো উপহার হিসেবে বাগিয়ে নিয়েছেন সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তার পদ।
লুৎফা বেগমের এই ‘অলৌকিক’ ক্ষমতার দৃশ্যমান চিত্র প্রতিদিন সকালে অফিসে স্পষ্ট হয়।
সহকর্মীরা যখন রিকশা বা লোকাল বাস থেকে নামেন, লুৎফা বেগম তখন কার্যালয়ে প্রবেশ করেন ৩,১৫৩ সিসির টয়োটা ল্যান্ডক্রুজার ডাবল কেবিন পিকআপে (ঢাকা মেট্রো-ঠ-১১-৩৫৪৪)।
বিআরটিএ-র তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গাড়িটি ২০০১ সালে নিবন্ধিত হয় ঢাকা সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীর নামে।
সওজ-এর টেকনিক্যাল সার্ভিসেস উইংয়ের সহকারী বৃক্ষপালনবিদ পদে কর্মরত তাঁর স্বামী মো. রফিকুল ইসলাম আইন ভেঙে এই গাড়ি পান, যা প্রতিনিয়ত ব্যবহার করছেন রেলের এই সাধারণ কর্মচারী।
সরকারি বিধিমালায় কেবল দপ্তর প্রধানদের জন্য ব্যক্তিগত গাড়ি বরাদ্দ থাকলেও কীভাবে এক দপ্তরের অনিয়ম অন্য দপ্তরের কর্মচারীর বিলাসিতার খোরাক হলো-তা নিয়ে চরম অস্পষ্টতা রেখে গেছেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় সওজ-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহে আরেফীন।
ল্যান্ডক্রুজারের দৃশ্যে সাধারণ কর্মচারীদের চোখ গিয়ে আটকে যায় লুৎফার দৃশ্যমান সাম্রাজ্যে।
চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহরে ‘কৃষ্ণচূড়া অ্যাপার্টমেন্টে’ জোড়া বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, নালাপাড়ার বহুতল আবাসন, ঢাকায় নিজস্ব ভবন এবং গ্রামের বাড়িতে অঢেল জমি-একজন স্বল্প বেতনের কর্মচারীর আয়-ব্যয়ের এই সমীকরণ কোনো বৈধ আর্থিক গণিতে মেলে না।
সূত্র বলছে, বাংলাদেশ রেলওয়ে শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় মহিলাবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে তৎকালীন রাজনৈতিক মন্ত্রী-আমলাদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তিনি তৈরি করেন নিজস্ব বলয়।
এমনকি সিআরবি জোড়া খুন মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি ও ক্যাডার সাইফুল ইসলাম লিমনের সঙ্গে তাঁর গোপন যোগসাজশের অভিযোগও প্রশাসনিক সূত্রে জোরালো হয়েছে।
রেলওয়েতে বদলি বাণিজ্য, পেনশন অনুমোদন, স্থগিত ফাইল খালাস কিংবা টিএলআর নিয়োগ-সবখানেই লুৎফা বেগমের আঙুলের ইশারা ছিল শেষ কথা।
শোকজ নোটিশ ফাইলবন্দি করা থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি করা তাঁর নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল।
অভিযোগে তোলপাড় শুরু হলে লুৎফা বেগম কেবল এটুকুই বলেন, আল্লাহর অলৌকিক শক্তি ছাড়া কোনো অশুভ শক্তি আমাকে সরাতে পারবে না।
একজন কর্মচারীর দুই যুগের এই অবাধ্যতা আর বিপুল সম্পদের উৎস অনুসন্ধানে প্রশাসনিক নিস্পৃহতা বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। অনিয়মের এই মহোৎসব বন্ধে দুদক ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন এখন সময়ের দাবি।




