প্রধান প্রকৌশলী মো. আনিছুর রহমানকে ঘিরে গুরুতর অভিযোগ

‘টাকা দিলে ফাইল চলে, না দিলে ঘোরে’-চসিকের প্রকৌশল বিভাগে কী ঘটছে?

অনলাইন ডেস্ক

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) উন্নয়ন ও মেরামতকাজের ফাইল ছাড়ানো থেকে শুরু করে বিল পরিশোধ-প্রায় প্রতিটি ধাপেই কমিশন দিতে হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

- Advertisement -

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র ও কয়েকজন ঠিকাদারের দাবি, চসিকের প্রধান প্রকৌশলী মো. আনিছুর রহমানকে বিভিন্ন কাজের ক্ষেত্রে ৩ শতাংশ থেকে ক্ষেত্রবিশেষে ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দিতে হয়।

- Advertisement -
google news follower

এমনকি ভ্যাট ও ট্যাক্সের অর্থ থেকেও কমিশন দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কমিশনের অর্থ না দিলে ফাইল স্বাক্ষর না করার অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঠিকাদারদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন পর্যায়ে কমিশনের অর্থ জোগাতে গিয়ে কাজের ব্যয় সামাল দিতে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার বা কাজের মান কমিয়ে দেওয়ার চাপ তৈরি হয়।

- Advertisement -
islamibank

এর ফলে নতুন নির্মাণ বা সংস্কারকাজ দ্রুত নষ্ট হলে একই জায়গায় আবারও সরকারি অর্থ ব্যয় করে কাজ করতে হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, চসিকে বিভিন্ন উন্নয়ন, সংস্কার ও মেরামতকাজের ফাইল একাধিক ধাপ পেরিয়ে প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে যায়।

অভিযোগ রয়েছে, সেখানে চাহিদামতো কমিশন না দিলে ফাইল স্বাক্ষর পেতে বিলম্ব হয়। ‘আজ নয়, কাল’ করে ঠিকাদারদের দিনের পর দিন ঘোরানোর অভিযোগও রয়েছে।

অন্যদিকে কমিশনের অর্থ দেওয়া হলে তুলনামূলক দ্রুত ফাইল স্বাক্ষর ও ছাড় করার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ঠিকাদার। তাঁদের দাবি, কাজ শেষ হওয়ার পর বিল পাওয়ার প্রক্রিয়াতেও বিভিন্ন টেবিলে আনুপাতিক হারে অর্থ দিতে হয়।

তবে অভিযোগের বিষয়ে প্রধান প্রকৌশলী মো. আনিছুর রহমানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে এই প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।

চসিক সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে চারটি বড় প্রকল্প চলমান রয়েছে। এর মধ্যে এয়ারপোর্ট রোডসহ বিভিন্ন সড়ক উন্নয়ন ও প্রশস্তকরণ প্রকল্পের ব্যয় ২ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। এটি নগরে প্রায়ই ‘আড়াই হাজার কোটি টাকার প্রকল্প’ হিসেবে পরিচিত।

এ ছাড়া ১ হাজার ২৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়ক, ব্রিজ, কালভার্টসহ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জালালাবাদ ওয়ার্ডের কুলগাঁও এলাকায় বাস টার্মিনাল নির্মাণ, ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে বারইপাড়া খাল খনন এবং ৩০৯ কোটি টাকা ব্যয়ে সেবক নিবাস নির্মাণ প্রকল্প চলমান রয়েছে বলে সূত্রের তথ্য।

সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, এসব প্রকল্পে বছরে প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ হয়ে থাকে। অভিযোগকারীদের দাবি, কাজের বিলসংক্রান্ত ফাইল প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তর হয়ে যাওয়ার সুযোগে সেখানে ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়া হয়। তাঁদের হিসাব অনুযায়ী, এই খাত থেকেই বছরে প্রায় ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা কমিশন আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট নথি, বিল, অনুমোদন প্রক্রিয়া ও আর্থিক লেনদেনের স্বাধীন তদন্ত হলে অভিযোগকারীদের দেওয়া হিসাবের সত্যতা মিলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শুধু বড় প্রকল্প নয়, চসিকের রাজস্ব খাতের কাজেও কমিশনের অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, থোক বরাদ্দের কাজের ক্ষেত্রে এস্টিমেট তৈরির সময় ১ শতাংশ এবং চূড়ান্ত বিল প্রস্তুতের সময় আরও ১ শতাংশ-মোট ২ শতাংশ কমিশন নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

চসিকের রাজস্ব আয় থেকে বছরে প্রায় ১০০ কোটি টাকার মেরামতকাজ করা হয় বলেও সূত্র জানিয়েছে। এসব কাজের ফাইলেও কমিশন দেওয়ার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ঠিকাদার।

তাঁদের অভিযোগ, কমিশনের অর্থ না দিলে ফাইল ছাড়াতে জটিলতা তৈরি হয়। ফলে কাজের মূল্য নির্ধারণ, বাস্তবায়ন এবং বিল পরিশোধের পুরো প্রক্রিয়াটিই প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

ঠিকাদারদের অভিযোগের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকটি হচ্ছে কাজের গুণগত মান।

তাঁদের ভাষ্য, চসিকের কাজ পাওয়ার পর বিল পাওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে কমিশন দিতে হলে অনুমোদিত ব্যয়ের একটি অংশ কার্যত ঠিকাদারের হাতে থাকে না।

ফলে নির্ধারিত ব্যয়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে গিয়ে কোথাও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, কোথাও কাজের পরিমাণ বা মান কমিয়ে দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়।

এতে স্বল্পমেয়াদে একটি কাজ শেষ হলেও দীর্ঘমেয়াদে নগরবাসী তার সুফল পায় না। রাস্তা, ড্রেন, কালভার্ট বা অন্যান্য অবকাঠামো দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হলে পুনরায় সংস্কারের প্রয়োজন হয়। তখন একই নাগরিক অবকাঠামোর পেছনে আবারও সরকারি অর্থ ব্যয় করতে হয়।

অর্থাৎ অভিযোগগুলো সত্য হলে কমিশনের অর্থ কেবল ঠিকাদারের ব্যয় বাড়াচ্ছে না, শেষ পর্যন্ত এর আর্থিক বোঝা পড়ছে সরকারি কোষাগার এবং নগরবাসীর ওপর।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো শুধু প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তর নয়, প্রকল্প পরিচালক (পিডি), তত্ত্বাবধায়ক, নির্বাহী প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট আরও কয়েকটি পর্যায়ে কমিশন দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে।

সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা দেনার দায় নিয়ে আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে চসিক। এমন পরিস্থিতিতে নিয়মিত মেরামত ও উন্নয়নকাজ চালিয়ে যাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ছে।

এই আর্থিক বাস্তবতায় উন্নয়নকাজের অর্থ থেকে কমিশন নেওয়ার অভিযোগ আরও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করছে। কারণ, অভিযোগগুলো তদন্তে সত্য প্রমাণিত হলে সংকটাপন্ন একটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সীমিত অর্থের একটি অংশ অনিয়মের মাধ্যমে বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়টি সামনে আসবে।

আর কাজের মান কমে গিয়ে একই স্থানে বারবার অর্থ ব্যয় হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

নগরের নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে কাজ পরিদর্শন করছেন এবং নগরের উন্নয়ন কার্যক্রম তদারক করছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

কিন্তু কর্মকর্তাদের একটি অংশের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে মাঠপর্যায়ের এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

কারণ একজন জনপ্রতিনিধির উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের শেষ ধাপটি নির্ভর করে প্রশাসনিক ও প্রকৌশল ব্যবস্থার স্বচ্ছতার ওপর।

সেখানে যদি ফাইল, বিল কিংবা কাজের অনুমোদনকে কেন্দ্র করে কমিশনের সংস্কৃতি তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্দেশ্যই বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

চসিকের কয়েকজন ঠিকাদারের সঙ্গে কথা বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে, প্রকাশ্যে অভিযোগ করলে ভবিষ্যতে কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হতে পারে-এমন আশঙ্কায় তাঁরা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করতে চান না।

একজন ঠিকাদারের ভাষ্য, চসিকের সঙ্গে ব্যবসা করতে হলে কমিশন দেওয়াই যেন বাস্তবতা; আর অভিযোগ করলে ভবিষ্যতের ব্যবসার দরজা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চসিকের প্রধান প্রকৌশলী মো. আনিছুর রহমানের দপ্তরে একাধিকবার গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নিজস্ব ওয়েভসাইটে থাকা মোবাইল ও টিএন্ডটি নাম্বারে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও নাম্বারগুলো সঠিক নয় বলে জানা যায়। পরবর্তীতে তার সাথে যোগাযোগ ও বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে তা সংযুক্ত করা হবে।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সচিব ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আশরাফুল আমিন বলেন, বিষয়টি তাঁর জানা নেই। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

KSRM
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জয়নিউজবিডি.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।

এই বিভাগের আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ