বিদেশি নম্বর থেকে ব্যবসায়ীকে হুমকি-সন্তান হত্যার ভয় দেখানোর অভিযোগ
‘আমি রায়হান, যা বলি তা করি’
বড় সাজ্জাদের নাম ব্যবহার করে হুমকি, দাবি সাজ্জাদের
আগের ঘটনাগুলোতেও চাঁদা দাবির পর হামলা ও গুলির অভিযোগ
চাঁদার অঙ্ক ২০ লাখ টাকা। টাকা না দিলে শুধু ব্যবসায়ীকে নয়, তাঁর সন্তানদেরও মেরে ফেলার হুমকি। হুমকির ভাষা আরও ভয়াবহ-‘পুত–নাতির লাশ নিয়ে কূল পাবে না।’
চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার মোজাফফরনগরে এক ব্যবসায়ীকে বিদেশি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে দেওয়া এমন হুমকি নতুন করে সামনে এনেছে নগরজুড়ে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের উদ্বেগজনক চিত্র।
গত ৩১ আগস্ট ব্যবসায়ী মাকসুদ চৌধুরীকে ‘রায়হান’ পরিচয়ে হুমকি দেওয়া হয়। বলা হয়, ২০ লাখ টাকা চাঁদা না দিলে তাঁর ছেলে ও মেয়েকে হত্যা করা হবে এবং ক্ষতি করা হবে পুরো পরিবারের।
এ ঘটনায় গতকাল বৃহস্পতিবার বায়েজিদ বোস্তামী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন মাকসুদ চৌধুরীর স্ত্রী মাহফুজা রুনা।
অভিযোগের ভাষ্য অনুযায়ী, হুমকিদাতা নিজেকে বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের সহযোগী রায়হান হিসেবে পরিচয় দেন। হুমকির একপর্যায়ে মাকসুদ চৌধুরীকে বলা হয়, ‘২০ লাখ টাকা না নিলে আমি রায়হান না।’
এরপর আসে নজরদারি ও হত্যার হুমকি। বলা হয়, মোজাফফরনগরে তাঁর সঙ্গে ‘লোক’ থাকবে। তিনি কোথায় যাচ্ছেন, কী করছেন-সবকিছু নজরদারি করা হবে। তাঁর ছেলেকে নিয়ে এসে হত্যা করার হুমকিও দেওয়া হয়।
হুমকিদাতার কথিত বক্তব্য আরও ছিল, ‘আমি রায়হান, যা বলি তা করি। কালকের মধ্যে মেরে ফেলব। তোকে কে বাঁচায় আমি দেখব। কোনো সুপারিশে কাজ হবে না।’
চাঁদা না দিলে পুরো পরিবারকে লক্ষ্য করার হুমকিও দেওয়া হয়। বলা হয়, ‘তোমরা সব ভাই পুত–নাতির লাশ নিয়ে কূল পাবে না।’ ব্যবসায়ীর বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া মেয়েকেও হুমকির আওতায় আনা হয়।
এই হুমকির পর আতঙ্কে দিন কাটছে মাকসুদ চৌধুরী ও তাঁর পরিবারের। ব্যবসায়ী মাকসুদ চৌধুরী বলেন, ‘হুমকি পাওয়ার পর থেকে আমরা ভয়ে আছি। হুমকিদাতাদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হোক।’ সূত্র-প্রথম আলো
বায়েজিদ বোস্তামী থানায় করা জিডিতে মাহফুজা রুনা উল্লেখ করেন, তাঁর স্বামীকে ২০ লাখ টাকা চাঁদা না দিলে ছেলে ও মেয়েকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়েছে। হুমকিদাতারা পুরো পরিবারের ক্ষতি করার কথাও বলেছেন।
বায়েজিদ বোস্তামী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোস্তফা কামাল জিডির তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমরা তদন্ত করছি। কে বা কারা হুমকি দিয়েছে, শনাক্তের চেষ্টা চলছে।’
ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, হুমকিদাতা নিজেকে বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর সহযোগী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে সাজ্জাদ আলী নিজেই দাবি করেছেন, তাঁর কোনো সহযোগী মাকসুদ চৌধুরীর কাছে চাঁদা চাননি।
মুঠোফোনে তিনি বলেন, ‘আমার কোনো লোক চাঁদা চেয়ে ফোন করেনি। নিরীহ কোনো মানুষের ক্ষতি আমরা করি না। আমাদের নাম ব্যবহার করে কোনো টোকাই হয়তো এই কাজ করেছে। ভয় পাওয়ার কিছু নেই। পুলিশ তাদের খুঁজে বের করুক।’
সাজ্জাদের এই বক্তব্যও তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, অভিযোগটি সত্য হলে চাঁদা দাবির পেছনে কারা আছে, আর তাঁর নাম ব্যবহার করে কেউ অপরাধ করছে কি না-দুই সম্ভাবনাই খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
মাকসুদ চৌধুরীকে হুমকির ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো অভিযোগ কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কারণ, এর আগে চট্টগ্রাম নগরের আরও কয়েকটি ঘটনায় চাঁদা দাবির পর হামলার অভিযোগ সামনে এসেছে।
গত ১১ আগস্ট নগরের হামজারবাগে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে একটি ভবনের ফটকে গুলি করার অভিযোগ ওঠে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে।
এর আগে দুপুর ১২টার দিকে ভবনমালিকের ছেলের কাছে হোয়াটসঅ্যাপে অডিও বার্তা পাঠিয়ে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দেওয়ার জন্য এক ঘণ্টার আলটিমেটাম দেওয়া হয়েছিল। পরে রাতে ভবনটিতে হামলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় অজ্ঞাতনামা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়।
গুলির লক্ষ্য হওয়া ভবনটির নাম রুনা টাওয়ার। ১১ তলা ভবনটির মালিক মোহাম্মদ ইউসুফ। তাঁর দুই ছেলে প্রবাসী ব্যবসায়ী। তাঁদের গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি। ইউসুফ কার্যক্রম নিষিদ্ধ স্বেচ্ছাসেবক লীগের চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমানের শ্বশুর।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দুই দিন পর গ্রেপ্তার হয়ে আজিজ কারাগারে রয়েছেন।
এরও আগে গত ১৩ জুলাই চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের বড় দিঘিরপাড় এলাকার ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিনের নির্মাণাধীন ভবনে ২০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমনের অনুসারীদের বিরুদ্ধে। মামলা হওয়ার পর সেখানে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করার অভিযোগও ওঠে।
ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি বিষয় লক্ষণীয়-চাঁদার দাবি, নির্দিষ্ট সময়ের আলটিমেটাম, যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে হোয়াটসঅ্যাপ এবং এরপর হামলা বা হামলার হুমকি।
চাঁদাবাজির পুরোনো চিত্রে দেখা যেত সরাসরি ফোন, চিঠি কিংবা সামনাসামনি ভয় দেখানোর ঘটনা।
এখন অভিযোগের ধরন বদলে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে হোয়াটসঅ্যাপ। বিদেশি নম্বর ব্যবহার করার অভিযোগও উঠছে।
এতে ভুক্তভোগীর ভয় আরও বাড়ে। কারণ, অপরিচিত নম্বর, কণ্ঠস্বরের আড়ালে থাকা ব্যক্তি এবং নিজেকে কোনো প্রভাবশালী সন্ত্রাসীর সহযোগী হিসেবে পরিচয়-সব মিলিয়ে তৈরি হয় অনিশ্চয়তা।
মাকসুদ চৌধুরীর ক্ষেত্রেও হুমকিদাতা শুধু টাকা দাবি করেননি; পরিবারের সদস্যদের গতিবিধি নজরদারি করার কথা বলেছেন, সন্তানকে হত্যার হুমকি দিয়েছেন এবং পুলিশ বা কোনো সুপারিশেও তাঁকে রক্ষা করা যাবে না-এমন বার্তা দিয়েছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রামে খুন ও চাঁদাবাজিতে কিছু সন্ত্রাসী বেপরোয়া হয়ে উঠেছে-এমন অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন ঘটনায় বড় সাজ্জাদের অনুসারীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও সামনে এসেছে।
এর মধ্যে ছোট সাজ্জাদ, মোবারক হোসেন ইমন, মোবারক ওরফে গলাকাটা মোবারককে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। তবে মো. রায়হান, বোরহান উদ্দিন ও কাদের এখনো পলাতক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানেই সামনে আসে আরও একটি প্রশ্ন-যাঁদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের কেউ কেউ কীভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়িয়ে থাকছেন?
বিশেষ করে মো. রায়হান নিয়মিত ফেসবুকে পোস্ট দিলেও পুলিশ তাঁকে খুঁজে পাচ্ছে না-এই তথ্যটি পরিস্থিতির একটি অস্বস্তিকর দিক সামনে আনে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় একজন অভিযুক্তকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা নিয়েও স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়।
তবে এসব ঘটনায় কারও বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তাঁকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করা যায় না।
চাঁদাবাজির ঘটনায় সাধারণত আলোচনায় আসে টাকার অঙ্ক। কিন্তু মাকসুদ চৌধুরীর পরিবারের ক্ষেত্রে টাকার অঙ্কের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে নিরাপত্তার প্রশ্ন।
২০ লাখ টাকা দেওয়া হবে কি না-এটি এখন আর একমাত্র প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো, টাকা না দিলে সত্যিই কি হামলা হবে? সন্তানরা নিরাপদ তো? বাড়ির আশপাশে কেউ নজর রাখছে কি না? হুমকিদাতা আসলে কে? আর তাঁর পেছনে কেউ আছে কি না? একটি পরিবারের কাছে এসব প্রশ্নের প্রতিটিই ভয়াবহ।
মাকসুদ চৌধুরীর পরিবার এখন পুলিশের তদন্তের দিকে তাকিয়ে আছে। তাঁদের দাবি, হুমকিদাতাদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হোক।
অন্যদিকে সাজ্জাদ আলী দাবি করছেন, তাঁর নাম ব্যবহার করে অন্য কেউ এই কাজ করেছে। পুলিশও বলছে, কে বা কারা হুমকি দিয়েছে, তা শনাক্তের চেষ্টা চলছে।




