তিন মেয়েকে নিয়ে এখন কোথায় দাঁড়াবেন ৬৮ বছরের প্রনতি রানী?

অনলাইন ডেস্ক

স্বামীর রেখে যাওয়া এক চিলতে ভিটেমাটি আর মাথা গোঁজার একটি মাত্র ছাদ। দীর্ঘ এগারোটি বছর এই সম্বলটুকুই বুকে আগলে রেখেছিলেন ৬৮ বছর বয়সী প্রনতি রানী দাশ।

- Advertisement -

কিন্তু গায়ের জোর আর ক্ষমতার দাপটের কাছে হেরে গেলেন তিনি। বিচার চেয়ে থানায় ঘুরেছেন, কিন্তু পুলিশের দেখা মেলেনি।

- Advertisement -
google news follower

আর সেই সুযোগেই রাতের আঁধারে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হলো তিন মেয়েকে নিয়ে থাকার শেষ আশ্রয়টুকুও!

ঘটনাটি ঘটেছে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ৯ নম্বর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মিঠাছড়া এলাকার ‘দুলালের বাড়ি’ হিসেবে পরিচিত স্থানে।

- Advertisement -
islamibank

সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে এই অসহায় বিধবাকে উচ্ছেদ করতেই পরিকল্পিতভাবে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগী পরিবারের।

গাছ কেটে নেওয়ার ৮ দিন পরও আসেনি পুলিশ
প্রনতি রানীর স্বামী অমরন্দু দাশ রায় ওরফে দুলাল মারা যান ২০১৫ সালে। তার মৃত্যুর পর থেকে তিন মেয়েকে নিয়ে স্বামীর তফসিলভুক্ত ভিটায় বসবাস করে আসছেন প্রনতি। কিন্তু এই জমির ওপর দীর্ঘদিনের নজর ছিল প্রতিবেশীদের।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর দলবদ্ধভাবে প্রনতি রানীর লাগানো গাছপালা জোরপূর্বক কেটে নিয়ে যায় একটি চক্র। ওইদিনই তিনি মিরসরাই থানায় প্রতিবেশী চোটন কর্মকার (৩৭), মো. সোহেল, আজিম উদ্দিন ও আজাদ হোসেনের নাম উল্লেখ করে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

কিন্তু অভিযোগ দেওয়ার পর আট দিন পার হয়ে গেলেও, অজ্ঞাত কারণে পুলিশ ঘটনাস্থলে তদন্তে যায়নি।

মধ্যরাতে পুড়ল শেষ সম্বলটুকু
পুলিশের এই নীরবতার মাঝেই নেমে আসে চরম আঘাত। শুক্রবার দিবাগত রাত আনুমানিক ২টার দিকে প্রনতি রানীর বসতঘরে আগুন দেওয়া হয়। মুহূর্তে দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে চারপাশ। ঘরটি সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

ফাঁকা ভিটার সামনে দাঁড়িয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে প্রনতি রানী বলেন, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ বারবার সালিশ-মিমাংসা হলেও তারা কিছুই মানে না। আদালত রায় দিয়েছে, কিন্তু তারা গায়ের জোরে সব অমান্য করে। গাছ কেটে নিয়ে যাওয়ার বিচার চেয়ে থানায় অভিযোগ দিয়েছি, প্রতিকার পাইনি।

এখন রাতের আঁধারে আমার ঘরটাই পুড়িয়ে দেওয়া হলো। দুটি ঘটনা একই চক্র ঘটিয়েছে। ওদের মূল উদ্দেশ্য আমাকে উচ্ছেদ করে জমি দখল করা। আমার স্বামী কিছু জমি বিশ্ব দরবারের কাছে বিক্রি করেছে। এর বিচার কে করবে?

বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছিলেন মিরসরাই উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব গাজী নিজাম উদ্দীন।

শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) উভয় পক্ষকে নিয়ে একটি বৈঠকের দিন ধার্য ছিল। কিন্তু সেখানে প্রনতি রানী উপস্থিত হলেও হাজির হয়নি অভিযুক্ত পক্ষ।

গাজী নিজাম উদ্দীন বলেন, প্রনতি রানী ও চোটন কর্মকারের সম্পত্তি নিয়ে বিরোধটি দীর্ঘদিনের। আমি উভয় পক্ষকে নিয়ে কাগজপত্র পর্যালোচনা করে একটি সুষ্ঠু সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছিলাম।

কিন্তু প্রনতি রানী বৈঠকে আসলেও চোটন কর্মকার উপস্থিত হননি। এর মধ্যেই প্রনতি রানীর ঘর পোড়ানোর এই জঘন্য ঘটনা ঘটে। আমি তাকে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছি।

এদিকে, বৈঠকে অনুপস্থিতি ও মূল বিরোধের বিষয়ে নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত চোটন কর্মকার।

তিনি বলেন, আজকের বৈঠক সম্পর্কে আমি জানতাম না। মূল সম্পত্তির বিরোধ হচ্ছে সুমনের সঙ্গে প্রনতি রানীর।

সুমনের সঙ্গে আমার সুসম্পর্কের কারণে শুধু সমাধানের জন্য আমি সম্পৃক্ত হয়েছিলাম। এখন আমাকে অযথা বিবাদী করে অভিযুক্ত করা হচ্ছে।

মিরসরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফরিদা ইয়াসমিন জানান, ঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার বিষয়ে তিনি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অভিযোগ পাননি।

আর ১৪ সেপ্টেম্বরের গাছ কাটার অভিযোগের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য না করে তিনি বলেন, আমি বর্তমানে চট্টগ্রামে একটি মিটিংয়ে আছি। দ্রুত ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠিয়ে তদন্ত নিশ্চিত করা হবে এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আদালতের রায় আছে, দীর্ঘদিনের ভোগদখলও আছে। শুধু নেই পেশিশক্তি আর প্রভাব। আর এ কারণেই চোখের সামনে পুড়ে ছাই হলো ৬৮ বছরের এক বৃদ্ধার শেষ সম্বল।

খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা প্রনতি রানী আর তার তিন মেয়ের বুকফাটা কান্নার বিচার কি জুটবে? নাকি প্রভাবশালীদের দখলের কাছে এভাবেই হারিয়ে যাবে আরও একটি নিঃস্ব পরিবার?

KSRM
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জয়নিউজবিডি.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।

এই বিভাগের আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ