গালাতাসারাইয়ের মাঠে ৪-১ গোলের জয়। মৌসুমের প্রথম ১০ ম্যাচেই জয় তুলে নিয়ে নতুন ইতিহাস গড়ল বার্সেলোনা।
গোলের বন্যা বইছে হান্সি ফ্লিকের দলের আক্রমণে, দুর্দান্ত ছন্দে আছেন লামিনে ইয়ামালও। তবু শিরোপার স্বপ্ন দেখলেও এখনই আত্মতুষ্টিতে ভুগতে রাজি নন বার্সা কোচ।
এক ম্যাচে পেটব্যথায় মাঠ ছাড়তে হলো পেদ্রিকে। কিন্তু তাতে বার্সেলোনার গোলের উৎসবে ছেদ পড়েনি। বরং ইস্তাম্বুলে গালাতাসারাইয়ের বিপক্ষে ৪–১ গোলের জয়ে নিজেদের সামর্থ্যের আরেকটি প্রমাণ দিল হান্সি ফ্লিকের দল।
মৌসুমের প্রথম ১০ ম্যাচে ১০ জয়, সঙ্গে ৪৩ গোল। পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, আক্রমণভাগে কী দুর্দান্ত সময় কাটাচ্ছে কাতালানরা।
ম্যাচের ২৮ মিনিটে পিছিয়ে পড়েছিল বার্সেলোনা। কিন্তু সেই ধাক্কা সামলে শেষ পর্যন্ত ৪–১ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে দলটি। ৭৩ মিনিটে পেটব্যথার কারণে মাঠ ছাড়তে হয় পেদ্রিকে।
ডাগআউটে ইশারা করে নিজের অস্বস্তির কথা জানানোর পর তাঁকে তুলে নেওয়া হয়। তবে জয় শেষে দলের গোল করার সামর্থ্য নিয়ে কোনো সংশয় রাখতে চাননি এই স্প্যানিশ মিডফিল্ডার।
পেদ্রির কথায়, ‘আমরা গোল পাব কি না, তা নিয়ে (মৌসুমের শুরুতে) বেশ কথা হয়েছে। সে সামর্থ্য দলের যে আছে, আমরা তা দেখিয়ে দিচ্ছি।’
মৌসুমের শুরুটা যে শুধু ভালো হচ্ছে, তা নয়, পরিসংখ্যানের বিচারে এটি বার্সেলোনার জন্য ঐতিহাসিক এক যাত্রাও। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে প্রথম ১০ ম্যাচেই জয় তুলে নিয়েছে দলটি।
স্প্যানিশ ফুটবলবিষয়ক পরিসংখ্যানের এক্স হ্যান্ডল ‘মিস্টার চিপ’-এর তথ্য অনুযায়ী, ১০২ বছর পর এবারই প্রথম মৌসুমের প্রথম ১০ ম্যাচ জিতল বার্সেলোনা।
এই ১০ ম্যাচে প্রতিপক্ষের জালে ৪৩ বার বল পাঠিয়েছে ফ্লিকের দল। অর্থাৎ, ম্যাচপ্রতি গড়ে ৪.৩ গোল!
বিপরীতে গোল হজম করেছে মাত্র ৯টি। আক্রমণে এমন ধার, সঙ্গে তুলনামূলক নিয়ন্ত্রিত রক্ষণ-দুইয়ে মিলে বার্সেলোনার ছন্দ এখন প্রতিপক্ষের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ।
চোটের কারণে রাফিনিয়া নেই। কিন্তু তাতে আক্রমণভাগের ধার কমেনি। লামিনে ইয়ামাল আছেন, আছেন গোল করার মতো আরও অনেকে। এই বার্সাকে দেখে মনে হচ্ছে, গোল করার দায়িত্ব কোনো একজনের কাঁধে আটকে নেই। বরং সুযোগ পেলেই জ্বলে উঠছেন দলের একাধিক খেলোয়াড়।
মৌসুমের শুরুতে রবার্ট লেভানডফস্কি ও ফেরান তোরেসকে ঘিরে প্রশ্ন উঠেছিল-বার্সার হয়ে গোল করবেন কে? এখন সেই প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে পুরো দল। ইতিমধ্যে গোলের খাতায় নাম তুলেছেন ১০ জন খেলোয়াড়। অর্থাৎ, গোল করার দায়িত্ব শুধু নির্দিষ্ট কয়েকজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
লা লিগায় আটটি জয়, চ্যাম্পিয়নস লিগে দুটি। ইউরোপের শীর্ষ ক্লাব প্রতিযোগিতায় প্রথম দুই ম্যাচেই বার্সার গোলসংখ্যা ৯। প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙতে যেমন পারদর্শিতা দেখাচ্ছে দলটি, তেমনি ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখার ক্ষমতাও হয়ে উঠেছে তাদের বড় শক্তি।
দলের এমন পারফরম্যান্সে সন্তুষ্ট কোচ হান্সি ফ্লিক। তাঁর ভাষায়, ‘আমি আমার দলকে জানি। যেভাবে তারা ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করে, সেটা দুর্দান্ত। প্রতিযোগিতাটা চ্যাম্পিয়নস লিগ, সেখানে আমাদের পারফরম্যান্সটা উঁচু দরের ছিল।’
ফ্লিকের অধীনে চ্যাম্পিয়নস লিগে বার্সেলোনার আক্রমণাত্মক ফুটবল আরও বেশি চোখে পড়ছে। জার্মান এই কোচ দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রতিযোগিতাটিতে ২৭ ম্যাচে ৮০ গোল করেছে কাতালান ক্লাবটি। ম্যাচপ্রতি গোলের গড় ২.৯৬।
১৯৯২–৯৩ মৌসুম থেকে হিসাব করলে, চ্যাম্পিয়নস লিগে কোনো কোচের অধীনে অন্তত ২০ ম্যাচ খেলা দলগুলোর মধ্যে ম্যাচপ্রতি গোলের এই হারই সেরা। পরিসংখ্যানটি শুধু বার্সার আক্রমণভাগের শক্তিই তুলে ধরে না, ফ্লিকের কৌশলও কতটা কার্যকর হচ্ছে, তার ইঙ্গিত দেয়।
তবে এত সাফল্যের পরও শিরোপা জয়ের ঘোষণা দিয়ে আগেভাগে আত্মতুষ্টিতে ভুগতে চান না ফ্লিক। সংবাদ সম্মেলনে তাঁর বক্তব্যে ছিল সতর্কতা, সঙ্গে বড় লক্ষ্য অর্জনের প্রত্যয়।
বার্সা কোচ বলেন, ‘ফুটবল খুব দ্রুত পাল্টে যেতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আমরা খুশি। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য হলো শিরোপা জয়। এখনো কিছুই জিতিনি। মে–জুনে বড় শিরোপা জেতা সম্ভব। সেই লক্ষ্যেই আমরা কাজ করছি।’
গালাতাসারাইয়ের বিপক্ষে ম্যাচে স্কোরশিটে লামিনে ইয়ামালের নাম না থাকলেও মাঠে তাঁর প্রভাব ছিল স্পষ্ট। দুটি গোল বানিয়ে সতীর্থদের গোল করার সুযোগ করে দিয়েছেন এই তরুণ তারকা। চোটের কারণে রাফিনিয়ার অনুপস্থিতিতে আক্রমণে ইয়ামালের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এ মৌসুমে বার্সেলোনার হয়ে ১০ ম্যাচে ইয়ামালের গোল ৮টি, সঙ্গে ৯টি অ্যাসিস্ট। অর্থাৎ, গোল করা ও করানো-দুই ক্ষেত্রেই দলের অন্যতম বড় ভরসা তিনি। গালাতাসারাইয়ের বিপক্ষেও তাঁর পারফরম্যান্স ছিল সেই ধারাবাহিকতারই প্রতিফলন।
ইয়ামালের প্রশংসা করে ফ্লিক বলেন, ‘এই পর্যায়ে তার মতো খেলোয়াড় পাওয়াটা অসাধারণ ব্যাপার। সে ম্যাচটা ঘুরিয়ে দিয়েছে এবং অসাধারণ খেলেছে।’
মৌসুমের প্রথম ১০ ম্যাচে জয়, ৪৩ গোল, চ্যাম্পিয়নস লিগে দুর্দান্ত শুরু, সব মিলিয়ে বার্সেলোনার সামনে এখন সম্ভাবনার বড় দুয়ার। রাফিনিয়ার অনুপস্থিতি কিংবা পেদ্রির মাঠ ছাড়ার মতো ঘটনাও আপাতত দলের জয়ের ছন্দে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।
তবে ফুটবলে ভালো শুরুর সঙ্গে শিরোপা জয়ের দূরত্ব যে অনেক, সেটি ভালো করেই জানেন ফ্লিক। তাই তাঁর চোখ মে–জুনের বড় মঞ্চে। এখনকার কাজ হলো ধারাবাহিকতা ধরে রাখা, গোলের এই গতি বজায় রাখা এবং গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নিজেদের সেরা ফুটবল খেলা।
বার্সেলোনা আপাতত জিতছে, গোল করছে, ইতিহাসও গড়ছে। কিন্তু ফ্লিকের কাছে মৌসুমের আসল সাফল্যের হিসাব হবে শেষ পর্যন্ত ট্রফির সংখ্যায়।




