আজ একজন মানুষ স্বাস্থ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে তাঁর সামনে তথ্যের অভাব নেই। গুগলে একটি উপসর্গ লিখলেই পাওয়া যায় অসংখ্য উত্তর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া যায় নানা পরামর্শ, ভিডিও ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। পরিচিতজনের কাছ থেকেও মেলে চিকিৎসা সম্পর্কে মতামত।
কিন্তু এত তথ্যের মধ্যেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায়—মানুষ কি সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন?
আমার দৃষ্টিতে, স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে আগামী দিনের বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হবে শুধু মানুষের কাছে তথ্য পৌঁছে দেওয়া নয়, বরং সেই তথ্য বুঝতে, যাচাই করতে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কাজে লাগাতে সাহায্য করা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভাষায়, স্বাস্থ্য সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য ও সেবা খুঁজে পাওয়া, বোঝা, মূল্যায়ন করা এবং ব্যবহার করার সক্ষমতাই স্বাস্থ্য-সাক্ষরতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অর্থাৎ স্বাস্থ্য সম্পর্কে কিছু তথ্য জানা আর সেই তথ্য কাজে লাগিয়ে সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়া এক বিষয় নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তথ্যের পরিমাণ বাড়ছে, বিভ্রান্তির সুযোগও বাড়ছে।
একজন মানুষ হয়তো কয়েক দিন ধরে শারীরিক অস্বস্তি অনুভব করছেন। তিনি ইন্টারনেটে উপসর্গটি খুঁজলেন এবং দেখলেন, একই লক্ষণের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে একাধিক রোগের কথা বলা হচ্ছে। কোনো ভিডিও তাঁকে ভয় দেখাল, আরেকটি পোস্ট জানাল যে বিষয়টি তেমন গুরুতর নয়।
এমন পরিস্থিতিতে তিনি কী করবেন?
নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নেবেন, পরিচিত কারও পরামর্শ নেবেন, নাকি চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলবেন?
সমস্যা হলো, অনলাইনে পাওয়া সব তথ্য সমানভাবে নির্ভরযোগ্য নয়। কোনো তথ্য অসম্পূর্ণ হতে পারে, পুরোনো হতে পারে কিংবা একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির অভিজ্ঞতাকে সবার জন্য প্রযোজ্য হিসেবে তুলে ধরতে পারে।
তাই স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্যের ক্ষেত্রে শুধু সহজে পাওয়া যাওয়াই যথেষ্ট নয়। তথ্যটি নির্ভরযোগ্য কি না, কার জন্য প্রযোজ্য এবং কখন পেশাদার চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন—এসব বোঝাও জরুরি।
স্বাস্থ্যতথ্যের প্রকৃত মূল্য শুধু মানুষ কতটা জানলেন, তা নয়; সেই তথ্য তাঁকে কতটা সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করল, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষাকে মানুষের ভাষায় আনতে হবে
চিকিৎসাবিজ্ঞানের অনেক শব্দ সাধারণ মানুষের কাছে অপরিচিত। পরীক্ষার রিপোর্টে কোনো শব্দ দেখে রোগী উদ্বিগ্ন হতে পারেন, অথচ শব্দটির অর্থ বা তাঁর ক্ষেত্রে সেটির তাৎপর্য সম্পর্কে তাঁর পরিষ্কার ধারণা নাও থাকতে পারে।
এখানে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করার গুরুত্ব রয়েছে
কোনো পরীক্ষার ফল কী বোঝায়, কোন বিষয়টি চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন, পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে—এসব তথ্য এমনভাবে উপস্থাপন করা দরকার, যাতে মানুষ বিষয়টি বুঝতে পারেন। তবে সহজ করে বোঝানোর অর্থ কখনোই চিকিৎসাবিজ্ঞানের জটিলতাকে আড়াল করা কিংবা নিশ্চিত নয় এমন বিষয়ে নিশ্চিত বক্তব্য দেওয়া নয়।
একইভাবে, স্বাস্থ্যবিষয়ক কনটেন্টে শুধু রোগের লক্ষণ তুলে ধরলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রয়োজন হলে কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে, কোন পরিস্থিতিতে জরুরি সহায়তা প্রয়োজন এবং অনলাইনের তথ্য ব্যক্তিগত রোগ নির্ণয়ের বিকল্প নয়—এসব বিষয়ও পরিষ্কার করা দরকার।
হাসপাতালের দায়িত্ব চিকিৎসার তথ্য দেওয়ার বাইরেও বিস্তৃত
একটি হাসপাতাল প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করে। কেউ চিকিৎসকের যোগ্যতা সম্পর্কে জানতে চান, কেউ কোনো রোগ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা নিতে চান, আবার কেউ চিকিৎসার পর কীভাবে নিজের যত্ন নেবেন, তা বুঝতে চান।
এই যোগাযোগগুলোকে শুধু সেবা সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখলে এর বড় একটি সম্ভাবনা অদেখা থেকে যায়।
হাসপাতাল চাইলে চিকিৎসকদের জ্ঞান সাধারণ মানুষের কাছে সহজ ভাষায় পৌঁছে দিতে পারে। রোগ সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণা ব্যাখ্যা করতে পারে। প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যচর্চা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য দিতে পারে। রোগী ও পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশ্নগুলো বুঝতেও সাহায্য করতে পারে।
এ ধরনের উদ্যোগের উদ্দেশ্য মানুষকে নিজে নিজে রোগ নির্ণয়ে উৎসাহিত করা নয়। বরং কখন পেশাদার পরামর্শ প্রয়োজন, কীভাবে নির্ভরযোগ্য তথ্য খুঁজতে হয় এবং নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে কীভাবে সচেতন থাকা যায়—সেই সক্ষমতা বাড়ানো।
স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান শুধু চিকিৎসার জায়গা নয়; নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্যজ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রও হতে পারে।
ডিজিটাল কনটেন্টের সাফল্য নতুনভাবে ভাবতে হবে
ডিজিটাল যোগাযোগে আমরা সাধারণত কতজন মানুষ একটি পোস্ট দেখেছেন, কতজন ভিডিও দেখেছেন কিংবা কতজন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন—এসব পরিমাপ করি। এগুলো কনটেন্টের পৌঁছানোর পরিধি বুঝতে সাহায্য করে।
কিন্তু স্বাস্থ্যবিষয়ক কনটেন্টের ক্ষেত্রে আরও কিছু প্রশ্ন করা প্রয়োজন।
মানুষ কি বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন? প্রয়োজনীয় তথ্য কি পরিষ্কার ছিল? কনটেন্টটি কি ভুল ধারণা দূর করতে সাহায্য করেছে? পাঠক কি বুঝতে পেরেছেন, কোন ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন?
এসব প্রশ্নের উত্তর সবসময় শুধু ভিউ বা লাইক দিয়ে পাওয়া যায় না। এর জন্য মানুষের প্রশ্ন, প্রতিক্রিয়া এবং কনটেন্টের উপযোগিতা সম্পর্কে নিয়মিত মূল্যায়ন প্রয়োজন।
একটি জটিল রোগ নিয়ে প্রকাশিত নির্ভরযোগ্য লেখা হয়তো বিনোদনমূলক ভিডিওর মতো বেশি মানুষের মনোযোগ পাবে না। কিন্তু যাঁদের ওই তথ্য প্রয়োজন, তাঁদের জন্য সেটির মূল্য অনেক বেশি হতে পারে।
তাই স্বাস্থ্যবিষয়ক ডিজিটাল কৌশলে পৌঁছানোর পাশাপাশি বোঝাপড়া ও তথ্যের ব্যবহারযোগ্যতাকেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
পরিবার ও সমাজও এই উদ্যোগের অংশ
স্বাস্থ্য সম্পর্কে মানুষের ধারণা শুধু হাসপাতাল থেকে তৈরি হয় না। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং দৈনন্দিন অভিজ্ঞতাও মানুষের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।
তাই স্বাস্থ্য-সাক্ষরতা বাড়ানো কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের একার কাজ নয়। স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসক, সাংবাদিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে দায়িত্বশীল সহযোগিতা প্রয়োজন।
বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের স্বাস্থ্যশিক্ষা, দীর্ঘমেয়াদি রোগ সম্পর্কে সচেতনতা এবং ভুল স্বাস্থ্যতথ্য শনাক্ত করার সক্ষমতা তৈরিতে ধারাবাহিক উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষকে ভয় দেখানো নয়, আবার অযথা আশ্বস্ত করাও নয়। লক্ষ্য হবে বাস্তবসম্মত, নির্ভরযোগ্য এবং বোঝার উপযোগী তথ্যের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানো।
আগামী দিনের স্বাস্থ্যসেবায় জ্ঞানও একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ
প্রযুক্তি যত উন্নত হবে, মানুষের কাছে স্বাস্থ্যতথ্য পৌঁছানো তত সহজ হতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও তথ্য খুঁজে পাওয়া ও ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি করছে। তবে প্রযুক্তির মাধ্যমে পাওয়া উত্তরও যাচাই করা প্রয়োজন, বিশেষ করে যখন বিষয়টি ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য বা চিকিৎসার সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত।
আমার কাছে ভবিষ্যতের স্বাস্থ্য যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো—মানুষ যেন শুধু বেশি তথ্য না পান, বরং তথ্যের অর্থ বুঝতে পারেন এবং প্রয়োজনের সময়ে সঠিক সহায়তা নিতে পারেন।
এটি মানুষের নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াবে, চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা আরও অর্থবহ করতে পারে এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে আরও কার্যকর করতে সাহায্য করবে।
শেষ পর্যন্ত স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা মানে সব রোগের উত্তর জানা নয়। বরং কোন তথ্যের ওপর নির্ভর করা যায়, কখন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ প্রয়োজন এবং নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত কীভাবে নিতে হয়—তা বোঝা।
কারণ স্বাস্থ্যসেবায় তথ্য পৌঁছে দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কিন্তু সেই তথ্য মানুষকে বুঝতে এবং সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করাই তার প্রকৃত সার্থকতা।
মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন মামুন (হেড অব ডিজিটাল, ব্র্যান্ড অ্যান্ড পিআর)
এভারকেয়ার হাসপাতাল চট্টগ্রাম।




