কাপ্তাইয়ে কর্ণফুলী নদীতে আত্মহত্যা করেছে মুন্নি আক্তার প্রকাশ বিবি ফাতেমা (১৬) নামের এক কিশোরী। শনিবার (১ জুন) সকালে কাপ্তাইয়ের চন্দ্রঘোনার কয়লার ডিপো এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
আত্মহননকারী মুন্নি মাছ ব্যবসায়ী মো. কাশেমের মেয়ে। আত্মহত্যা করার আগে একটি চিরকুটও লিখে সে। টানা ১১ ঘণ্টা কর্ণফুলীতে অভিযান চালিয়ে বিকেল ৫টায় তার মরদেহ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ডুবুরি দল।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, কাপ্তাইয়ের চন্দ্রঘোনার কয়লার ডিপো এলাকার কেআরসি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে চলতি বছর এসএসসি পাস করে মুন্নি। সম্প্রতি তার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় চট্টগ্রামের ইপিজেড এলাকার হাফেজ এমরান হোসেনের ছেলে মো. ফরহাদের (১৭)।
বৃহস্পতিবার (৩০ মে) সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম থেকে চন্দ্রঘোনায় আসে ফরহাদ। মুন্নির বাড়ির সামনে পেয়ারা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে মিনিট পাঁচেক ধরে কথা বলে ফরহাদ। কিন্তু বিষয়টিকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করে স্থানীয় এক কুচক্রী। ডেকে আনে স্থানীয় ইউপি সদস্যকে। এক পর্যায়ে ফরহাদকে বেঁধে রাখা হয় মসজিদের পাশে। ততক্ষণে এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া হয় নানা অপপ্রচার।
এসব অপপ্রচারের একপর্যায়ে মুন্নি ফরহাদকে বলে, এলাকার মানুষ আমার নামে মিথ্যা বদনাম ছড়াচ্ছে। তুমি আমাকে বিয়ে করে ফেল। কিন্তু এতে রাজি হয়নি ফরহাদ। সে বলে, তোমার সঙ্গে আমার সবেমাত্র পরিচয়, আমি হঠাৎ কিভাবে তোমাকে বিয়ে করবো?
এদিকে স্থানীয় মেম্বার থানা-পুলিশের কথা বলে বিষয়টি সমাধানে ৫০ হাজার টাকা দাবি করে। টাকা না পেয়ে এলাকায় রটিয়ে দেওয়া হয় কুৎসা। এই কুৎসা রটনার সঙ্গে স্থানীয় অটোরিকশা চালক সাইফুল ইসলাম ও জনৈক নবীর বউ জড়িত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ অবস্থায় মানসিক যন্ত্রণা সইতে না পেরে লজ্জায় আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় মুন্নি।
শনিবার সকাল ৬টায় একটি চিরকুট লিখে আত্মহত্যা করে কর্ণফুলী নদীতে ঝাঁপ দেয় মুন্নি। সেই চিরকুটে পরিবারের সবার কাছে ক্ষমা চায় মুন্নি।
এদিকে কাপ্তাই ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ডুবুরি দল টানা ১১ ঘণ্টা অভিযানের পর বিকেল ৫টার দিকে মুন্নির মরদেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। কান্নাজড়িত কণ্ঠে জয়নিউজ প্রতিনিধিকে এসব কথা বলেন মুন্নির ভাই মোশাররফ হোসেন।
অপরদিকে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করলেও টাকা দাবির বিষয়টি অস্বীকার করেন চন্দ্রঘোনা ইউপি সদস্য আজিজুল হক প্রকাশ মন্ত্রী। তিনি জয়নিউজকে বলেন, আমি তাদের বলেছিলাম, তারা যেন থানায় যোগাযোগ করেন। বিষয়টি থানার ওসিকেও আমি অবহিত করেছি।
বাড়ির সামনে মুন্নি-ফরহাদকে স্বাভাবিক অবস্থায় দেখার পরও কেন তাদের এভাবে হয়রানি করা হলো জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে কাপ্তাই থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) নূরুল আলম জয়নিউজকে বলেন, বৃহস্পতিবার ঘটনার সূত্রপাত হলেও আমরা জানতে পারি শনিবার। স্থানীয়ভাবে আমাদের বিষয়টি কেউই জানায়নি।
কাপ্তাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশ্রাফ আহমেদ রাসেল ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, টানা অভিযানের পর বিকেলে মরদেহটি উদ্ধার করতে সক্ষম হয় ফায়ার সার্ভিস। সামাজিকভাবে মুন্নিকে লজ্জিত করার বিষয়টি নিয়ে কোনো মন্তব্য না করলে এ ঘটনার তদন্তে বিস্তারিত জানা যাবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তবে আত্মহত্যার বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন কাপ্তাই উপজেলা চেয়ারম্যান মো. মফিজুল হক। কোনো রাখঢাক না রেখে তিনি জয়নিউজকে বলেন, মেয়েটিকে সামাজিকভাবে হেয় করায় সে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে।
এদিকে কাপ্তাই উপজেলা ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক এ আর লিমন জানান, আমি বিষয়টি জেনে ঘটনাস্থলে গেলে ছেলেটিকে মসজিদে বাঁধা অবস্থায় দেখতে পাই। পরে স্থানীয়দের বলি, একটা ছেলেকে এভাবে আটকে রাখার কোনো লজিক নেই। সে যদি অন্যায় করে থাকে তাহলে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দিন। কিন্তু কেন তাকে আটকে রেখেছেন? তবে মেয়েটি বদনাম সইতে না পেরে সেদিনই আত্মহত্যা করার বিষয়টি সবাইকে জানায়। কিন্তু কেউই বিষয়টি আমলে নেয়নি। অবশেষে মুন্নি আত্মহত্যা করে প্রমাণ করলো সে সত্যি বলেছিল।