পুরাতন বছরের জরা দূর করে নতুনের কেতন উড়িয়ে আবার এলো পহেলা বৈশাখ। বিশ্বের সব প্রান্তের সকল বাঙালি নানা আয়োজনে বাংলা নববর্ষকে বরণ করে নিয়েছে আজ সোমবার।
বাংলা নতুন বছরকে বরণ করতে অনুষ্ঠান আয়োজনে পিছিয়ে ছিলো না চট্টগ্রামবাসীও। বাঙালির প্রাণের উৎসবে জেগেছে বন্দরনগরী।
বর্ণিল আয়োজনে বাঙালির প্রাণের উৎসবে জেগেছে বন্দরনগরী। বাংলা নববর্ষ বরণ করতে বিভিন্ন স্থানে দিনব্যাপী গান, কবিতা, নৃত্য, শোভাযাত্রাসহ লোকজ নানা অনুষঙ্গে, আনন্দ-উচ্ছ্বাসে দিনব্যাপী মেতে ছিলেন নগরবাসী।
প্রখর রোদ উপেক্ষা করে বর্ষবরণের বিভিন্ন আয়োজনে যোগ দিয়েছে সর্বস্তরের মানুষ।
সিআরবির শিরিষতলা : প্রতিবছরের মতো এবারও চট্টগ্রামে বর্ষবরণের বড় আসর বসেছিলো নগরীর সিআরবির শিরিষতলায়। বর্ষবরণ-বর্ষবিদায় উপলক্ষ্যে সিআরবির শিরীষতলায় গতকাল রবিবার থেকে দুদিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করে নববর্ষ উদ্যাপন পরিষদ।
কোন ধরনের বিশৃঙ্খলা ছাড়াই এদিন বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দু ঘন্টার বর্ষবিদায়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়।
আজ সোমবার সকাল ৭টায় ভায়োলিনিস্ট চিটাগংয়ের বেহালা বাদনের মধ্য দিয়ে নতুন বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের শুভারম্ভ করে আয়োজক কমিটি।
দিনব্যাপী আয়োজনে উদীচী চট্টগ্রাম, সঙ্গীত ভবন, সুরাঙ্গন বিদ্যাপীঠ বাংলাদেশ রেলওয়ে সাংস্কৃতিক ফোরাম, স্বরলিপি সাংস্কৃতিক ফোরাম, সৃজামী, অদিতি সঙ্গীত নিকেতনসহ বিভিন্ন সংগঠনের শিল্পীরা সম্মিলিত গান পরিবেশন করেন।
বোধন আবৃত্তি পরিষদ, শব্দনোঙ্গর, তারুণ্যের উচ্ছ্বাসসহ কয়েকটি সংগঠনের শিল্পীরা পরিবেশন করেন বৃন্দআবৃত্তি।
ওড়িষি অ্যান্ড টেগোর ডান্স মুভমেন্ট সেন্টার, নৃত্যনীড়, রাগেশ্রীসহ বিভিন্ন সংগঠনের শিল্পীরা নৃত্য পরিবেশন করেন।
তবে বর্ষবরণের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ সাতরাস্তার মোড়ের সেই বলীখেলা এবার অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে সিরিষতলায় এবার দর্শনার্থীও ছিল কম। বিকল্প হিসেবে জাতীয় খেলা হা-ডু-ডু আয়োজন করা হলেও দর্শনার্থীর তেমন সাড়া মেলেনি।
আগের রাতে ভয়ংকর হয়ে উঠেছিল ডিসি হিল : চট্টগ্রাম নগরীর ডিসি হিলে গেল ৪৬ বছর ধরে বর্ষবরণের বড় আয়োজন হয়ে আসলেও আগের দিন রাতে ভয়ংকর হয়ে উঠেছিল। বর্ষবরণ-বর্ষবিদায়ের সবচেয়ে বড় আয়োজনস্থল ডিসি হিলের নজরুল স্কয়ারের মঞ্চে ভাঙচুর ও হামলার ঘটনা ঘটে।
এসময় ভয়-আতঙ্কে অনুষ্ঠানস্থল ছাড়াও পুরো এলাকা মুহুর্তে ফাঁকা হয়ে যায়। পরে সোমবারের নববর্ষ বরণের অনুষ্ঠান বাতিল করেন আয়োজকেরা।
পহেলা বৈশাখের প্রাণ শোভাযাত্রা : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের বের করা শোভাযাত্রায় আরও প্রাণময় হয়ে ওঠে পহেলা বৈশাখের আয়োজন।
সকাল ১০টায় নগরীর বাদশা মিয়া সড়কের ক্যাম্পাস থেকে পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রা বের হয়। তবে প্রতিবছর ওই শোভাযাত্রার ব্যানারে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ লেখা থাকলেও এবার ছিল না। এবার লেখা ছিল ‘বর্ষবরণ ২০৩২, চারুকলা ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়’।
শোভাযাত্রাটি বাদশা মিয়া সড়ক থেকে আলমাস মোড়, কাজির দেউড়ি, জামালখান হয়ে সার্সন রোড দিয়ে শোভাযাত্রা আবার চারুকলা ক্যাম্পাসে গিয়ে শেষ হয়।
শিক্ষার্থীদের তৈরি জাতীয় মাছ ইলিশ এবং টেপা পুতুলের ঘোড়ার মোটিফ স্থান পায় ঢোলবাদ্যের তালে তালে এগিয়ে যাওয়া শোভাযাত্রায়। মুখোশ হিসেবে ছিল বাঘ, মহিষ ও খরগোশ।
শোভাযাত্রায় চারুকলার শিক্ষকদের পাশাপাশি সাবেক-বর্তমান শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা জানান, ‘ধর্মীয় ভেদাভেদহীন, অসাম্প্রদায়িক একটি বাংলাদেশ আমাদের চাওয়া। এই বাংলাদেশ হোক সকল মানুষের। আমরা যেন সবাই মিলেমিশে এই বাংলাদেশকে গড়তে পারি।’
তাছাড়া বেলা ১২টায় নগরীর বাংলাদেশ মহিলা সমিতি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের নেতৃত্বে বর্ষবরণের শোভাযাত্রা বের হয়। শোভাযাত্রা যে পথে গেছে সেখানেও পুলিশের কড়া প্রহরা দেখা গেছে।
জেলা শিল্পকলা একাডেমি : পহেলা বৈশাখ ১৪৩২ উপলক্ষে জেলা প্রশাসন চট্টগ্রাম কর্তৃক আয়োজিত আলোচনা সভা, পুরস্কার বিতরণী এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান জেলা শিল্পকলা একাডেমী প্রাঙ্গনে সকাল ৮ টায় অনুষ্ঠিত হয়।
চট্টগ্রাম প্রশাসক ফরিদা খানমের সভাপতিত্বে ও চান্দগাঁও ভূমি সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইউসুফ হাসানের সঞ্চালনায় পহেলা বৈশাখের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন।
বিশেষ অতিথি ছিলেন পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি (ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট) ওয়াহিদুল হক চৌধুরী ও সিএমপির উপ-কমিশনার (অতিরিক্ত ডিআইজি) নেছার উদ্দিন আহমেদ।
প্রথমেই দলগতভাবে জাতীয় সংগীত পরিবেশন এবং পরবর্তীতে পহেলা বৈশাখের আগমন উপলক্ষে ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ গানের মাধ্যমে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়া হয়।
পহেলা বৈশাখের বর্ণাঢ্য আনন্দ শোভাযাত্রার শুভ উদ্বোধন করেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন।
অনুষ্ঠানে জেলা শিশু একাডেমিতে আয়োজিত চিত্রাংকন ও রচনা প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করেন প্রধান অতিথিসহ অন্যান্য অতিথিরা।
পহেলা বৈশাখের সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন তাঁর পুরনো দিনের নববর্ষ উদযাপনের স্মৃতিচারণ করে বলেন, নতুন প্রজন্ম যাতে হৃদয়ের আনন্দে নববর্ষ উদযাপন করতে পারে সে পরিবেশ সৃষ্টি করে দিতে হবে।
নববর্ষের দিনটি সকলের কাছে আনন্দের বিষয় হয়ে থাকুক-এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
সভাপতির বক্তব্যে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম বলেন, পহেলা বৈশাখ এমন একটা অনুষ্ঠান যেখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল সম্প্রদায়ের সম্প্রীতি বজায় থাকে।
আনন্দ শোভাযাত্রার মাধ্যমে এ অনুষ্ঠানে সকলের উপস্থিতি প্রমাণ করে পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রাণের উৎসব।
তাই পুরনো বছরের দৈন্যতা, গ্লানি মুছে দিয়ে নতুন বছরকে নতুনভাবে সাজিয়ে আমরা সকলে মিলে বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণ করবো।
এছাড়াও বক্তব্য রাখেন, জেলা আনসার-ভিডিপি কমান্ডার মো. আবু সোলায়মান ও জেলা মহিলা বিষয়ক উপ-পরিচালক আতিয়া চৌধুরী।
শেষে অনুষ্ঠান মঞ্চে দলীয় সংগীত ও দলীয় নৃত্য পরিবেশন করেন চট্টগ্রাম জেলা শিশু একাডেমি ও জেলা শিল্পকলা একাডেমির শিক্ষার্থীরা।
এদিকে প্রতিবছরের ন্যায় এবারও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বর্ষবরণের আয়োজন করা হয়েছে।
বর্ষবরণের আয়োজনকে ঘিরে নগরীজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে সিএমপি।
নববর্ষ উদযাপন পরিষদ, চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক ফারুক তাহের বলেন, পহেলা বৈশাখ আমাদের প্রাণের উৎসব।
সকল মত-পথের ঊর্ধ্বে উঠে দিনটি আমাদের এক হয়ে নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরার প্রেরণা দেয়। আমরা একেকজন একেক ধর্মের অনুসারী হতে পারি।
পহেলা বৈশাখ, পহেলা ফাল্গুন, পৌষপার্বণ, নবান্ন এগুলো আমাদের চিরায়ত সংস্কৃতি।
জেএন/রাজীব/পিআর