বিদেশে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে কিরগিজস্তানে পাড়ি জমানো অর্ধশতাধিক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর জীবনে নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা। প্রশাসনিক কাজ ও বিশ্ববিদ্যালয় স্থানান্তরের অংশ হিসেবে দেশে ফিরে এসে এখন তারা আটকা পড়েছেন ভিসা জটিলতায়।
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও, নতুন করে ভিসার আবেদন করলে তা বাতিল করে দিয়েছে কিরগিজ কর্তৃপক্ষ। সূত্র: এখনটিভি
বিশ্ববিদ্যালয় বদল, আর সেখানেই বিপত্তি
ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে কিরগিজস্তানে পড়তে যাওয়া আব্দুস সাত্তার চারটি সেমিস্টার শেষ করতে খরচ করেছেন প্রায় ১৫ হাজার ডলার। বাবার পেনশনের টাকায় কোনোভাবে সেই ব্যয় চালালেও পুরো টিউশন ফি জোগাতে হিমশিম খেতে হচ্ছিল তাকে।
খরচ কমাতে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তই এখন তার জীবনে বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ছুটিতে দেশে ফিরে এসে তিনি জানতে পারেন, তার ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। নতুন ভিসার জন্য আবেদন করলে সেটি বাতিল করা হয়। প্রায় এক বছর ধরে তিনি দেশে আটকে আছেন।
সাত্তার বলেন, ‘পরীক্ষা শেষ ছুটিতে আমি দেশে চলে আসি। যখন আমি ফেরত যাব তখন আমার ভিসার মেয়াদ শেষ। নতুন ভিসার জন্য যখন আমি আবেদন করি তখন দেখি আমার ভিসা বাতিল হয়ে গেছে।’
অর্ধশত শিক্ষার্থীর একই অবস্থা
সাত্তারের মতো আরও প্রায় অর্ধশত শিক্ষার্থী একই সমস্যায় পড়েছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৩০ জন বর্তমানে দেশে আটকে আছেন। অনেকে ইতোমধ্যে ৪ থেকে ৯ সেমিস্টার শেষ করেছেন।
শাহনাজ নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘এতগুলো সেমিস্টারে এতগুলো টাকা দেয়ার পর এখন আমাদের সামনে কি আছে তা অনিশ্চিত। আমরা জানি না কবে এর সমাধান পাবো।’
দীর্ঘদিন দেশে আটকে থাকার ফলে তাদের সেমিস্টার নষ্ট হচ্ছে, পাশাপাশি ক্যারিয়ার নিয়েও দেখা দিয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা।
আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমার ইচ্ছাটা কি পূরণ করতে পারবো না? এ প্রশ্নটা প্রতিদিন আমাদের মাথায় থাকে।’
বিপুল আর্থিক ক্ষতি
কিরগিজস্তানের স্বীকৃত ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে শতাধিক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। অনেকেই প্রায় ৬ হাজার ডলারের প্যাকেজে সেখানে যান।
৫ বছরে ১০ সেমিস্টার শেষ করতে মোট খরচ পড়ে ২০ থেকে ৩০ হাজার ডলার, যার মধ্যে কেবল টিউশন ফি বাবদই প্রায় ৩৭ লাখ টাকা।
দেশে আটকে পড়া শিক্ষার্থীদের অনেকেই ইতোমধ্যে ২ বছরে ২০ লাখ টাকার বেশি খরচ করেছেন। এখন তাদের সেই বিনিয়োগ অনিশ্চয়তার মুখে।
কূটনৈতিক তৎপরতা, তবু সমাধান নেই
সমস্যা সমাধানে শিক্ষার্থীরা উজবেকিস্তানে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের শরণাপন্ন হন। দূতাবাস কিরগিজ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ভিসা নবায়নের সুযোগ দিতে একাধিকবার চিঠি পাঠিয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
উজবেকিস্তানে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব শুকলা বণিক বলেন, ‘আমাদের ফরেইন মিনিস্ট্রি থেকে ২২/২৩ জনের একটা তালিকাও পেয়েছি। সেটাসহ আমরা একাধিকবার নোট ভার্বাল দিয়েছি। তাদের কাছ থেকে কোনো রিপ্লাই পাইনি। আশা করছি এ মাসে আমাদের অ্যাম্বাসেডর যাবেন।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট সরকারের সঙ্গে তারা যোগাযোগ রাখছেন। যেসব শিক্ষার্থী এখানে আটকা পড়েছে তারা যেন নিরাপদে ফেরত যেতে পারে সে বিষয়ে আমাদের পক্ষ থেকে সে দেশের সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে।’
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
বিদেশে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে যাওয়া এসব শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ এখন পুরোপুরি নির্ভর করছে কূটনৈতিক উদ্যোগের ওপর।
ভিসা জটিলতার সমাধান হবে কি না, নাকি বিপুল অর্থ ও সময় ব্যয়ের পরও স্বপ্ন ভেঙে যাবে—এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।
শিক্ষার্থীদের ভাষায়, তাদের লড়াই এখন শুধু ভিসার জন্য নয়, নিজেদের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার জন্যও।




