বাংলার লোকসংস্কৃতির ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা কেবল শিল্পী নন—তাঁরা একটি সময়ের ভাষ্যকার। লোককবি রমেশ শীল তেমনই একজন বিরল ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন না কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত পণ্ডিত, না কোনো ক্ষমতাবান রাজনৈতিক নেতা। তবুও তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলার নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর। তাঁর গান ছিল সমাজের আয়না, প্রতিবাদের ভাষা এবং মানবতার আহ্বান।
১৮৭৭ সালে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার পূর্ব গোমদণ্ডী গ্রামে জন্ম নেওয়া রমেশ শীল ছোটবেলা থেকেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন। মাত্র ১১ বছর বয়সে পিতৃহারা হয়ে তাঁকে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিতে হয়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেমে যায় তৃতীয় শ্রেণিতেই। কিন্তু জীবনই হয়ে ওঠে তাঁর সবচেয়ে বড় বিদ্যালয়।
গ্রামীণ বাংলার মেলা, কবিগানের আসর, মানুষের সুখ-দুঃখ—এসব থেকেই তিনি শিখেছিলেন সমাজকে দেখতে। আর সেই অভিজ্ঞতাই পরবর্তীতে তাঁর গানকে দিয়েছে এক অনন্য শক্তি। তিনি বুঝেছিলেন, শিল্প যদি মানুষের কথা না বলে, তবে সেই শিল্পের মূল্য সীমিত।
রমেশ শীলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনা। যখন বাংলার সমাজ ধর্মীয় বিভাজনে আক্রান্ত, তখন তিনি গেয়েছেন মানবতার গান।
তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে—“হিন্দু মুসলমানে মিলন ছিল প্রাণে প্রাণে…” এই কয়েকটি শব্দই তাঁর জীবনদর্শনের সারাংশ। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের পরিচয় ধর্মে নয়, মানবতায়। তাঁর গানে আমরা এমন এক সমাজের স্বপ্ন দেখি, যেখানে মানুষ মানুষকে সাহায্য করবে, বিভেদ নয়—সম্প্রীতিই হবে প্রধান শক্তি।
রমেশ শীল শুধু লোককবি ছিলেন না; তিনি ছিলেন সময়সচেতন শিল্পী। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, দুর্ভিক্ষ, দেশভাগ—সবকিছুই তাঁর গানে প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি কবিগানকে শুধুই বিনোদনের জায়গায় রাখেননি; বরং এটিকে রূপ দিয়েছেন গণসচেতনতার শক্তিশালী মাধ্যমে।
“পাঁচ গজ ধুতি সাত টাকা”—এই একটি পঙ্ক্তিই বলে দেয়, কী গভীরভাবে তিনি সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে অনুভব করেছিলেন। তাঁর গান ছিল কৃষকের কান্না, শ্রমিকের কষ্ট এবং শোষিত মানুষের প্রতিবাদের ভাষা।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, তিনি মাইজভাণ্ডারী দর্শনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আধ্যাত্মিকতাকেও মানবপ্রেমের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছিলেন। তাঁর কাছে ধর্ম মানে বিভাজন নয়; বরং মিলন, সহমর্মিতা এবং আত্মিক উন্নয়ন।
আজকের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে রমেশ শীলকে নতুন করে পড়া জরুরি। কারণ প্রযুক্তি ও ভোগবাদের এই সময়ে আমরা ক্রমেই মানবিকতা হারাচ্ছি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভাজনের ভাষা যত বাড়ছে, রমেশ শীলের গান তত বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।
তিনি আমাদের শিখিয়েছেন—
শিল্প মানে শুধু বিনোদন নয়,
সংস্কৃতি মানে শুধু আয়োজন নয়,
বরং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দায়ও সংস্কৃতির অংশ।
রমেশ শীল ছিলেন না কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তি। কিন্তু তিনি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন সততা, সাহস ও মানবিকতার মাধ্যমে। তাই তাঁর মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু তাঁর দর্শনের মৃত্যু হয়নি।
আজও বাংলার গ্রামীণ মঞ্চে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এবং গবেষণার আলোচনায় তাঁর নাম উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধার সঙ্গে। কারণ তিনি শুধু অতীতের একজন কবি নন; তিনি বর্তমানেরও শিক্ষক, ভবিষ্যতেরও দিশারী।
আগামী ৯ মে এই কিংবদন্তি কবির ১৪৯তম জন্মবার্ষিকী। দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন এবং কবিকে স্মরণ করার লক্ষ্যে দিনব্যাপী বিশেষ অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে “কবিয়াল রমেশ স্মৃতি ট্রাস্ট”। অনুষ্ঠানে দেশবরেণ্য ব্যক্তিত্ব, স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার গণ্যমান্য অতিথিবর্গ উপস্থিত থাকার সম্মতি জানিয়েছেন।
দিনব্যাপী এ আয়োজনে থাকবে আলোচনা সভা, স্মৃতিচারণ, কবিগান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। কবির সকল শুভানুধ্যায়ীদের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার জন্য আন্তরিক আমন্ত্রণ জানিয়েছে কবিয়াল রমেশ পরিবার।
লেখক : মানস চৌধুরী,সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও কবিয়াল রমেশ শীল স্মৃতি ট্রাস্টের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি




