বিদেশে শনাক্ত হয়েছিল ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। সেটি দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য শুরু হয়েছিল সরকারি তৎপরতা।
কিন্তু আইনি জটিলতা, সময়সীমা এবং দুই দেশের সংস্থার মধ্যে দীর্ঘ যোগাযোগের ফাঁক গলে সেই অর্থ আর যুক্তরাজ্যে থাকেনি। বাংলাদেশে ফেরার আগেই তা স্থানান্তরিত হয় সংযুক্ত আরব আমিরাতে।
এই ঘটনার পর নতুন এক আইনি পথ বেছে নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
ইস্টার্ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান শওকত আলী চৌধুরীকে তার বিদেশে থাকা অপ্রদর্শিত সম্পদের সমপরিমাণ প্রায় ৩০৬ কোটি ৮৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ)।
চলতি বছরের ১৫ মার্চ দেওয়া এই আদেশে আয়কর আইনের ২১ ধারা প্রয়োগ করা হয়েছে, যেখানে কর রিটার্নে প্রদর্শিত নয়-এমন বিদেশি সম্পদের উৎস সন্তোষজনকভাবে ব্যাখ্যা করতে না পারলে ওই সম্পদের ন্যায্য বাজারমূল্যের সমপরিমাণ অর্থ জরিমানা করার বিধান রয়েছে।
অর্থাৎ, বিদেশে থাকা সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনা না গেলেও, সেই সম্পদের সমমূল্যের অর্থ দেশের আইন অনুযায়ী আদায়ের একটি আইনি ভিত্তি তৈরি হয়েছে। তবে এখানেই শেষ নয়।
এলটিইউ সূত্র জানিয়েছে, শওকত আলী চৌধুরী চলতি বছরের মে মাসে ওই অপ্রদর্শিত অর্থের বিপরীতে ১৩৬ কোটি টাকা কর পরিশোধ করেছেন।
কিন্তু ৩০৭ কোটি টাকার জরিমানা এখনো পরিশোধ করেননি। আইন অনুযায়ী জরিমানা আদায় না হলে কর কর্তৃপক্ষ তার সম্পদ বিক্রি বা বাজেয়াপ্ত করেও অর্থ আদায়ের ক্ষমতা রাখে। ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে বিদেশে অর্থ উদ্ধারের প্রচেষ্টায়।
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ) অর্থ ফেরতের আগে এমন প্রমাণ চেয়েছিল, যাতে বোঝা যায় অর্থটি শুধু বাংলাদেশের আইনেই নয়, যুক্তরাজ্যের আইনেও অবৈধভাবে অর্জিত।
এ নিয়ে দুই দেশের কর্তৃপক্ষের মধ্যে আট দফা ই-মেইল আদান-প্রদান হয়।
কিন্তু সেই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই চার সপ্তাহের আইনি সময়সীমা শেষ হয়ে যায়।
অভিযোগ অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যেই শওকত আলী চৌধুরী অর্থটি সংযুক্ত আরব আমিরাতে স্থানান্তর করেন। বর্তমানে সেখান থেকে অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা।
এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাজ্যের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বিএফআইইউকে চিঠি দিয়ে জানায়, শওকত আলী চৌধুরীর ২৫ মিলিয়ন ডলার চার সপ্তাহের জন্য অবরুদ্ধ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে শর্ত দেওয়া হয়েছিল, এই তথ্য বাংলাদেশের অন্য কোনো সংস্থার সঙ্গে কিংবা আদালতেও শেয়ার করা যাবে না।
এ অবস্থায় কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে।
চার সপ্তাহের সেই সময়ের মধ্যে অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ কীভাবে তৈরি হলো? দুই দেশের আইনি প্রক্রিয়ায় কোথায় বিলম্ব হলো? ভবিষ্যতে বিদেশে শনাক্ত হওয়া সম্পদ উদ্ধারে বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়াতে কী ধরনের প্রস্তুতি প্রয়োজন?
বিএফআইইউ জানিয়েছে, শওকত আলী চৌধুরীর বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান রয়েছে। তদন্ত শেষে অর্থপাচার-সংক্রান্ত অভিযোগে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব বলেছেন, সরকার অর্থ উদ্ধারে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
অন্যদিকে, এনবিআর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জরিমানার অর্থ পরিশোধ না করলে আইন অনুযায়ী সম্পদ বিক্রি বা বাজেয়াপ্ত করে অর্থ আদায়ের সুযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে একটি ইংরেজি গণমাধ্যম শওকত আলী চৌধুরীর কাছে লিখিতভাবে জানতে চেয়েছিল-তিনি জরিমানার বিরুদ্ধে আপিল করবেন কি না এবং ২৫ মিলিয়ন ডলার দেশে ফেরাতে রাজি কি না। তবে সর্বশেষ তথ্য পাওয়া পর্যন্ত তিনি কোনো জবাব দেননি।
ঘটনার তদন্ত এখনো চলমান। ফলে বিদেশে থাকা অর্থের উৎস, অর্থ স্থানান্তরের প্রক্রিয়া এবং সম্ভাব্য অর্থপাচারের অভিযোগ-এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট সংস্থার তদন্ত ও আদালতের পরবর্তী আইনি কার্যক্রমের ওপর।




