কখনো গাড়ির তেল চুরি ঠেকাতে, কখনো হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়ে স্বচ্ছতা আনতে, আবার কখনো নাগরিক অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির প্রতিশ্রুতি দিয়ে একের পর এক ডিজিটাল উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)।
প্রতিটি প্রকল্প উদ্বোধনের সময় ছিল জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন, বড় বড় প্রতিশ্রুতি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে অধিকাংশ উদ্যোগই হারিয়ে গেছে।
কোনোটি কয়েক মাস, কোনোটি দুই বছর, আবার কোনোটি উদ্বোধনের পরই কার্যত অচল হয়ে পড়ে। এতে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও প্রত্যাশিত সুফল পায়নি নগরবাসী।
এবার সেই তালিকায় যুক্ত হচ্ছে ‘আমাদের চট্টগ্রাম’ নামে নতুন একটি অ্যাপ।
প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি হওয়া এই অ্যাপটির উদ্বোধন হয়েছে আজ।
শনিবার নগরীর চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে অ্যাপের উদ্বোধন করেন সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
তবে উদ্বোধনের আগেই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে-আগের প্রকল্পগুলোর মতো এটিও কি কিছুদিন পর অচল হয়ে যাবে?
কারণ, অ্যাপটি পরিচালনা ও তদারকির জন্য প্রয়োজনীয় জনবলই নেই সিটি করপোরেশনের।
অ্যাপটির ইন্টারফেস বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এতে রাস্তাঘাট, মশার উপদ্রব, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সড়কবাতি, নালা-নর্দমা, পাবলিক টয়লেট, অবৈধ স্থাপনা, জলাবদ্ধতাসহ মোট ১০টি বিষয়ে ছবি সংযুক্ত করে অভিযোগ জানানোর সুযোগ রাখা হয়েছে।
‘সমাধান কাউন্টারে’ অভিযোগের লাইভ পরিসংখ্যান দেখার সুবিধাও রয়েছে।
এছাড়া জরুরি সেবা ৯৯৯, নারী ও শিশু সহায়তা, স্কুল হেলথ কার্ড, বিভিন্ন প্রত্যয়নপত্রের আবেদন এবং মেয়র ও কাউন্সিলরদের যোগাযোগের তথ্যও যুক্ত করা হয়েছে।
অ্যাপটি তৈরি করেছে ভেনটো টেক। অর্থায়ন করেছে ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড (ইবিএল)।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়। এই ডিজিটাল কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে বছরে ৮৩ লাখ টাকা পরিশোধ করার কথা।
চুক্তি অনুযায়ী চার বছরে পরিশোধের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা।
অথচ নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ না করায় অনলাইনভিত্তিক এই কার্যক্রম ইতোমধ্যে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এর মধ্যেই হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়কে ডিজিটাল করার নামে নতুন নতুন চুক্তি করে চলেছে চসিক।
২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর হোল্ডিং ট্যাক্স সংগ্রহে ইস্টার্ন ব্যাংক-এর সঙ্গে চুক্তি করে সংস্থাটি।
পরে ২০২৬ সালের ২৮ জানুয়ারি বাণিজ্যিক হোল্ডিং ট্যাক্স আদায় ব্যবস্থাকে আধুনিক করার লক্ষ্যে বি-ট্র্যাক সলিউশনস লিমিটেড ও মাইলেজ নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আরেকটি চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, আজও চসিকের বাণিজ্যিক হোল্ডিংয়ের পূর্ণাঙ্গ তালিকাই প্রস্তুত হয়নি।
সরকারি ও বেসরকারি-দুই ধরনের হোল্ডিং থাকলেও সেগুলোর সুনির্দিষ্ট তথ্যভাণ্ডার নেই। ফলে ডিজিটাল ট্যাক্স ব্যবস্থাপনার ঘোষণাগুলো কাগজেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
এটি অবশ্য নতুন নয়। ২০১২ সালে সাবেক মেয়র মনজুর আলম হোল্ডিং ট্যাক্স ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু করেন। একটি স্বতন্ত্র ওয়েবসাইটও তৈরি করা হয়।
এস অ্যান্ড টি ট্রেডিং নির্মিত ওই প্রকল্পে ব্যয় হয়েছিল ১৮ লাখ টাকা। পরে সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন সেটি বাস্তবায়নের চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত সেটিও সফল হয়নি।
চসিকের ডিজিটাল ব্যর্থতার তালিকা আরও দীর্ঘ। ২০১৭ সালের ২৪ এপ্রিল নাগরিক অভিযোগ গ্রহণের জন্য চালু হয় কলসেন্টার ১৬১০৪।
তাৎক্ষণিক সেবার কারণে এটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু ২০২০ সালের শুরুতেই সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
একই বছরের ৩১ জুলাই সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন সেবা নিয়ে আরেকটি মোবাইল অ্যাপ চালু করা হয়েছিল।
কিন্তু ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানকে বিল পরিশোধ না করায় মাত্র দুই বছরের মাথায় সেটিও বন্ধ হয়ে যায়।
এরও আগে ২০১৫ সালে গাড়ির তেল চুরি রোধে পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয় ভেহিক্যাল ট্র্যাকিং সিস্টেম (ভিটিএস)।
এতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা। কিন্তু ছয় মাসের মধ্যেই প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যায়।
একইভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় গতি আনতে এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দায়িত্বে অবহেলা কমাতে প্রায় ছয়শ পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে সিম কার্ড দেওয়া হয়।
মোবাইল প্রযুক্তির মাধ্যমে তাঁদের অবস্থান পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও চালু হয়েছিল। এতে প্রাথমিকভাবে ইতিবাচক ফল মিললেও কয়েক মাস পর সেই উদ্যোগও থেমে যায়।
এক দশকের বেশি সময়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন একের পর এক ডিজিটাল প্রকল্প গ্রহণ করেছে।
প্রতিটি প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে সরকারি কিংবা করদাতার কোটি কোটি টাকা। কিন্তু অধিকাংশ উদ্যোগই টেকেনি।
কোথাও বিল পরিশোধ হয়নি, কোথাও প্রয়োজনীয় জনবল ছিল না, কোথাও বাস্তবায়নের সক্ষমতার অভাব স্পষ্ট হয়েছে।
এ অবস্থায় নতুন ‘আমাদের চট্টগ্রাম’ অ্যাপ নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলছেন নগরবাসী-আগের ব্যর্থতার কোনো জবাবদিহি না করেই আবার নতুন প্রকল্প কেন?
পুরোনো ব্যর্থ উদ্যোগগুলোর ব্যয়, দায় এবং দায়ীদের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? নাকি উদ্বোধনের পর এটিও যুক্ত হবে চসিকের অচল ডিজিটাল প্রকল্পের দীর্ঘ তালিকায়?




