এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দুর্নীতির একাধিক মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব, ভবনের নকশা অনুমোদন, উন্নয়ন প্রকল্পে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং শেষ পর্যন্ত বরখাস্ত ও দায়িত্বচ্যুতি।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) নির্বাহী প্রকৌশলী ও সাবেক অথরাইজড অফিসার-১ মোহাম্মদ হাসানকে ঘিরে এমন ঘটনাপ্রবাহ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে-একজন বিচারাধীন মামলার আসামি কীভাবে বছরের পর বছর সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে ছিলেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে সামনে এসেছে পুরোনো দুর্নীতি মামলা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ এবং সিডিএর অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক।
শুরু হয়েছিল ২০১০ সালে। কালুরঘাট সড়ক সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন প্রকল্পে প্রায় ১ কোটি ৭৫ লাখ ২৮ হাজার ৪৫২ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একাধিক মামলা দায়ের করে।
তদন্ত শেষে ২০১২ সালে আদালতে অভিযোগপত্র জমা পড়ে। এরপর কেটে গেছে এক যুগেরও বেশি সময়। মামলাগুলো এখনো বিচারাধীন।
কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে থেমে থাকেনি প্রশাসনিক যাত্রা। বরং অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও মোহাম্মদ হাসান সিডিএর একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
পরে দায়িত্ব পান অথরাইজড অফিসার-১ হিসেবে—যে পদ ভবনের নকশা অনুমোদন, তলা বৃদ্ধির আবেদন এবং নানা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সামনে আসে। যখন আদালতে দুর্নীতির মামলা চলমান, তখন একজন কর্মকর্তা কীভাবে এমন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল থাকেন? কোন প্রক্রিয়ায় তাঁর দায়িত্ব অব্যাহত ছিল?
প্রশাসনের ভেতরে কি পর্যাপ্ত নজরদারি ছিল? নাকি অভিযোগ থাকা আর প্রশাসনিক জবাবদিহির মধ্যে তৈরি হয়েছিল এক অদৃশ্য দূরত্ব?
সিডিএর একাধিক কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ভবনের নকশা অনুমোদন, সংশোধিত প্ল্যান, অতিরিক্ত তলা নির্মাণসহ বিভিন্ন বিষয়ে একটি প্রভাবশালী প্রশাসনিক বলয় সক্রিয় ছিল। সেই অভিযোগে মোহাম্মদ হাসানের নামও উঠে এসেছে।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি এবং আদালতও এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেননি।
এরপর আসে প্রশাসনিক মোড়। ২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর সিডিএ চাকরি প্রবিধানমালার ৪০(ঙ) ধারা অনুযায়ী তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
কয়েক মাস পর, ২০২৫ সালের এপ্রিলে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে অথরাইজড অফিসার-১ পদ থেকেও তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়। দায়িত্ব পান নির্বাহী প্রকৌশলী কাজী কাদের নেওয়াজ।
এদিকে বহদ্দারহাট কাঁচাবাজার এলাকার একটি মসজিদের বহুতল ভবনের অনুমোদনসংক্রান্ত জটিলতাও প্রশাসনিক অসন্তোষের কারণ হিসেবে বিভিন্ন সূত্রে আলোচিত হচ্ছে। যদিও এ বিষয়েও কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।
দুদকের মামলাগুলোতে শুধু মোহাম্মদ হাসান নন, সিডিএর বর্তমান ও সাবেক একাধিক প্রধান প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলী, সহকারী প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তার নাম রয়েছে।
ফলে প্রশ্নটি এখন একজন ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে পুরো প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি ব্যবস্থার দিকে চলে গেছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
তাঁদের মতে, অতীতে ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার করে অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগ যাঁদের বিরুদ্ধে উঠেছে, তাঁদের বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেনও গণমাধ্যমে বলেছেন, অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে অপরাধী বলা যায় না।
তবে আইন ও বিধি অনুযায়ী বিষয়টি পর্যালোচনা করা হবে এবং প্রশাসনিকভাবে করণীয়ও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
মোহাম্মদ হাসান বা তাঁর আইনজীবীর কোনো বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
এক দশকের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন মামলা, দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন, পরে বরখাস্ত এবং দায়িত্বচ্যুতি-এই ধারাবাহিকতা এখন শুধু একজন কর্মকর্তাকে ঘিরে নয় বরং সিডিএর জবাবদিহি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং জনআস্থার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে।
সেই প্রশ্নের উত্তর মিলবে তদন্ত, বিচার এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার মধ্য দিয়েই।




